০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কার দখলে যাচ্ছে? যে ৩ দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে সব

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এখন অপেক্ষা চূড়ান্ত ফলের। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাবে, নাকি রিপাবলিকানরা ধরে রাখবে আধিপত্য? ক্ষমতার এই চূড়ান্ত লড়াই রূপ নিতে পারে ৩টি ভিন্ন চিত্রে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কার দখলে যাচ্ছে? যে ৩ দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে সব

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Nov 2026, 11:46 PM

Updated : 03 Nov 2026, 11:46 PM

কয়েক মাসের নির্বাচনী প্রচার ও শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের পর অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।

সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার ইঙ্গিত মিললেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জরিপ সবসময় পুরোপুরি নির্ভুল প্রমাণিত হয়নি।

মার্কিন ভোটারদের রায়ের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনের ফল মূলত তিনটি সম্ভাব্য রূপ নিতে পারে।

১. ডেমোক্র্যাটদের বড় ‘ঢেউ’

ঐতিহাসিকভাবেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দল বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থনে ঐতিহাসিক ভাটা, ইরান যুদ্ধের জেরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয় বৃদ্ধি এবং আগ্রাসী অভিবাসন নীতি ও ডাটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে অবস্থানের মতো কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ।

সব সমীকরণ মিলে গেলে দৃশ্যপটে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে একটি বড় ‘নির্বাচনী জোয়ার’ তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের সীমা অনায়াসেই ছাড়িয়ে যাবে ডেমোক্র্যাটরা। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলো ছাড়াও তারা রক্ষণশীল রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও চমক দেখাতে পারে।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটরা যে কেবল সমানে-সমান বা অনিশ্চিত (ফলাফল অনুমান করা কঠিন) ডজনখানেক আসনে জয়ী হতে পারে তা-ই নয়, বরং রক্ষণশীলদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু আসনেও প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নিতে পারে।

সেনেটের ক্ষেত্রে, এই দৃশ্যপটটি বাস্তবায়িত হতে হলে সমানে-সমান লড়াই হওয়া আসনগুলোর সবকটিতে বা প্রায় অধিকাংশতেই ডেমোক্র্যাটদের জয়ী হতে হবে, যার মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান ঘেঁষা রাজ্যগুলোর কিছু আসনও রয়েছে।

সেক্ষেত্রে এমন একটি জায়গায় অন্তত একটি চোখ কপালে তোলার মতো বিজয়ের প্রয়োজন হবে, যেখানে এক প্রজন্মে কোনও ডেমোক্র্যাট জেতেননি—যেমন টেক্সাস, অথবা কানসাস, যেখানে প্রায় এক শতাব্দী ধরে তারা জয় পায়নি।

যদি সত্যিই এমন ঘটে, তবে ডেমোক্র্যাটরা যে কেবল সেনেটের নিয়ন্ত্রণই নিজেদের হাতে নেবে তা-ই নয়, বরং তারা অতিরিক্ত এক বা দুটি আসনের ব্যবধানে থেকে তা করবে। এটি আলাস্কায় রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি হতে চলা যে কোনও নাটকীয় পরিস্থিতি এড়াতে সহায়ক হতে পারে, যেখানে ব্যালট পেপারে একই নামের দুইজন 'ড্যান সালিভান' থাকার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি মামলা বিচারক খারিজ করে দিয়েছিলেন।

তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে ২০২৪ সালে ট্রাম্প যে সমর্থন তৈরি করেছিলেন, তা উল্টে দেওয়ার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা এটি অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকান ভোটার হয়ত ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেবেন অথবা ভোট না দিয়ে ঘরে বসে থাকবেন।

এই ধরনের ফল ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার দলের জন্য বড় ধাক্কা বয়ে আনবে এবং পরবর্তী দুই বছর আইনসভার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের তীব্র সংঘাতের পথ তৈরি করবে।

ভোটের ফল আসার শুরুর দিকের লক্ষণ:

ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের আসন ধরে রাখতে পারলে এবং নর্থ ক্যারোলাইনা, মিশিগান, নিউ ইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও কেন্টাকিতে রিপাবলিকানদের কিছু আসন ছিনিয়ে নিলে, সেই সঙ্গে সাউথ ক্যারোলাইনায় সেনেট আসন ডেমোক্র্যাটরা পেলে ধরে নেওয়া যায় রাতটি তাদের বড় জয়ের হতে চলেছে।

২. ডেমোক্র্যাটদের নামমাত্র জয়

এই দৃশ্যপটে জনমত জরিপ একেবারে ভুল প্রমাণিত হবে না, আবার পুরোপুরি সঠিকও হবে না। প্রতিনিধি পরিষদে সহজ কিছু আসনে জিতে ডেমোক্র্যাটরা হয়ত কোনোমতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে, তবে আসন ব্যবধান হবে খুবই কম।

ফলে নিম্নকক্ষে যে কোনও আইন পাসের ক্ষেত্রে দলের ভেতরের মধ্যপন্থি ও কট্টর বামপন্থি অংশের সঙ্গে নিয়মিত দরকষাকষি করতে হবে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বকে।

অন্যদিকে, সেনেটে হয়ত ডেমোক্র্যাটরা মাত্র এক বা দুটি আসন ছিনিয়ে নিতে পারবে (যেমন নর্থ ক্যারোলাইনা)। কিন্তু রক্ষণশীল অঞ্চলের আসনগুলো তাদের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে।

মেইনে হয়ত রিপাবলিকান সেনেটর সুসান কলিন্সকে হারানো সম্ভব হবে না, কিংবা মিশিগানে বামপন্থি প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদ ডেমোক্র্যাটদের আসন ধরে রাখতে ব্যর্থ হতে পারেন। এছাড়া আলাস্কায় ‘ড্যান সুলিভান’ বিতর্কে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলতোলা হেরে যেতে পারেন।

আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের যে বিশাল উপস্থিতি দেখা গেছে, নির্বাচনের মূল দিনে যদি রিপাবলিকান ভোটাররাও সমানে সমানে কেন্দ্রে যান, তবেই ডেমোক্র্যাটদের নামমাত্র জয়ের এমন দৃশ্যপট তৈরি হতে পারে।

এর পরিণতি হবে বিভক্ত এক কংগ্রেস, যার অর্থ দেশজুড়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা।

ভোটের ফল আসার শুরুর দিকের লক্ষণ:

ডেমোক্র্যাটরা কিছু জায়গায় জিতলেও, রিপাবলিকানরা তাদের নিজেদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে আসন ধরে রাখতে সফল হলে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে একতরফা নির্বাচনী সুনামি আসবে না।

যেমন: ফ্লোরিডা যদি সব দিক থেকেই স্বস্তিদায়কভাবে রিপাবলিকানদের দখলেই থেকে যায়; এবং ডেমোক্র্যাটরা যদি ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভেইনিয়ার মতো জায়গাগুলোতে প্রতিনিধি সভার কিছু আসন ছিনিয়ে নিতে পারে, কিন্তু গোটা দেশে তুলনামূলক নিরাপদ রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা বর্তমান রিপাবলিকান সংসদ সদস্যরা কোনও নির্বাচনী জোয়ারে ভেসে যাওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন।

৩. রিপাবলিকানদের বড় জয়ের রাত

এই দৃশ্যপটে দেখা যেতে পারে- রিপাবলিকানরা সব প্রতিকূলতা সামলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণই নিজেদের হাতে রেখে দেবে।

এটি ঘটতে হলে ট্রাম্পের জনমত জরিপগুলো (যেগুলোতে অতীতেও ট্রাম্পের জনসমর্থনকে খাটো করে দেখা হয়েছিল) ভুল প্রমাণিত হতে হবে এবং সমানে-সমান লড়াই হওয়া (টস-আপ) আসনগুলোর বেশিরভাগই রিপাবলিকানদের পক্ষে যেতে হবে।

রিপাবলিকান সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতির পাশাপাশি যেসব স্বতন্ত্র ও হিস্পানিক ভোটার ট্রাম্পের নীতিতে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাদেরও শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট দিতে হবে।

এই দৃশ্যপটে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের জন্য কোনও নিশ্চিত বিষয় হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তা শেষ পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য এবং সেখানে ডাকযোগে আসা ভোট (মেইল-ইন ব্যালট) গণনার দিনব্যাপী দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় গিয়ে ঠেকতে পারে।

অর্থাৎ, লড়াই এত কঠিন হবে যে শেষ পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার ধীরগতির ভোট গণনার ওপর প্রতিনিধি পরিষদের ভাগ্য ঝুলে থাকবে।

শেষ পর্যন্ত, টেক্সাস, ফ্লোরিডা এবং নর্থ ক্যারোলাইনার মতো জায়গাগুলোতে নিজেদের সুবিধাজনক উপায়ে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের চেষ্টার কারণে রিপাবলিকানরা কোনোমতে একটি সামান্য ব্যবধানের সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।

পাশাপাশি রক্ষণশীল রাজ্যগুলোর সব সেনেট আসনে জয়ের পাশাপাশি মিশিগানের মতো ডেমোক্র্যাট আসনও ছিনিয়ে নিতে পারে রিপাবলিকানরা।

এমনকি রিপাবলিকানরা যদি নর্থ ক্যারোলাইনা ধরে রাখতে না পারে কিংবা ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত মিনেসোটা ও নিউ হ্যাম্পশায়ারেও জয় না পায়, তার পরও তারা অন্তত ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ঘাম ছুটিয়ে ছাড়বে।

এমনটি ঘটলে বুধবার সকালেই প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভোটারদের পক্ষ থেকে নতুন ম্যান্ডেট পাওয়ার দাবি করবেন এবং নিজ দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের সহায়তায় তার অভ্যন্তরীন ও পররাষ্ট্রনীতি আরও আগ্রাসীভাবে এগিয়ে নেবেন।

ভোটের ফল আসার শুরুর দিকের লক্ষণ:

রিপাবলিকানরা যদি তাদের হেভিওয়েট প্রার্থীদের সহজে জিতিয়ে আনার পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের দুর্গগুলোতে হানা দিয়ে আসন ছিনিয়ে নিতে পারে, তবেই পুরো কংগ্রেসে তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় থাকবে।

যদি ফ্লোরিডায় সিনেটর অ্যাশলে মুডি এবং ওহাইওতে জন হাস্টেড অনায়াসে পুনর্নির্বাচিত হন; এবং রিপাবলিকানরা যদি পেনসিলভেইনিয়া ও ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোতে নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে ধরে রাখতে পারে, একইসঙ্গে তারা যদি নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও ও ফ্লোরিডায় বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা আসনগুলো নিজেদের পক্ষে ছিনিয়ে নিতে পারে।