কপ-২৭: ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ কী, টাকা পাবে কারা?
‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ চুক্তির আওতায় ধনী দেশগুলোর কে কী পরিমাণ তহবিল কীভাবে দেবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে কারা কী পরিমাণ অর্থ পাবে সেই সিদ্ধান্ত হয়নি এখনও।
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত গরিব দেশগুলোকে তহবিল সহায়তা দিতে ধনী দেশগুলোর দীর্ঘদিনের গড়িমসির মধ্যে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল গঠনের চুক্তি হয়েছে এবারের কপ-২৭ সম্মেলনে।
মিশরের শার্ম-আল-শেখে নানা দেন-দরবারের পর বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ এতে সম্মত হলেও কিছু বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নে আরও সময় লাগতে পারে।
‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল বছরের পর বছর ধরেই বিতর্কিত বিষয় হয়ে ছিল। গরিব দেশগুলো ৩০ বছর ধরে বিশ্ব ঊষ্ণায়নের কারণে তাদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ধনী দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তাগাদা দিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশগুলোর এতে গড়িমসি করার কারণ, তাদের আশঙ্কা- ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল দিতে রাজি হলে তারা আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে যাবে এবং এতে করে ভবিষ্যতে মামলায় জড়িয়ে পড়ার পট প্রস্তুত হতে পারে।
কিন্তু গত এক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে, পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতিসহ চীন, আফ্রিকা ও অন্যান্য স্থানে খরায় যে ক্ষতি হয়েছে তা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের আশু প্রয়োজনীয়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এমন ভয়াবহ পরিণতির মধ্যে এবারের কপ-২৭ সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ‘লস এন্ড ড্যামেজ’ তহবিলের দাবিও অনেক জোরদার হয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু কর্মীরা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু বিষয়ক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ম্যাককার্থি সিএনএন-কে বলেছেন, সময় শেষ হয়ে আসছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিপর্যয়কর বন্যার কথা উল্লেখ করেছেন তারা।
ম্যাককার্থি বলেছেন, “উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করা কিংবা এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত নয়। তাদেরকে টিকে থাকার চেষ্টায় সাহায্য করা উন্নত দেশগুলোর দায়িত্ব।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষয়ক্ষতির ইস্যুটি এবারের মিশরের সম্মেলনে প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে কূটনীতিকদের লাগাতার আলোচনার পর ঐতিহাসিক সমঝোতার ঘোষণা এসেছে সম্মেলনে।
সিএনএন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে হওয়া চুক্তিটি এক বিরাট সাফল্য। তবে এটি নানা বিতর্কের সমঝোতা প্রক্রিয়া। সম্মেলনের প্রতিনিধিরা চুক্তির বিতর্কিত অংশগুলো সমাধানে এখনও কাজ করছেন। শক্তি উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার ছাড়াও সকল জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধের মতো বিষয়ও রয়েছে সেখানে।
বিবিসি জানিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো সন্তুষ্ট, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদের যে ক্ষতি হচ্ছে তার স্বীকৃতি পাচ্ছে এই তহবিলের মাধ্যমে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধের যে কথা বলা হচ্ছে সেটি নিয়ে অনেক ধনী দেশ হতাশ।
অন্যদিকে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ চুক্তি আসলে কী, চুক্তির আওতায় ধনী দেশগুলোর কে কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে কারা কী পরিমাণ পাবে এবং কীভাবে পাবে সেই সিদ্ধান্ত আসেনি এখনও। এসব বিতর্ক শেষে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থ পেতে লেগে যেতে পারে আরও কয়েক বছর।
‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’
রয়টার্স জানিয়েছে, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বলতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ায় সমুদ্রেপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলোতে ইতোমধ্যে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সেটি বোঝায়।
জলবায়ু তহবিল এখন পর্যন্ত বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধের প্রয়াসে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমানোর উপর বেশি জোর দিয়েছে। আর এসব তহবিলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভবিষ্যত ক্ষতি মোকাবিলার প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হয়েছে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল ভিন্ন কিছু হতে পারে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো যেসব ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে যেতে পারবে না বা পুষিয়ে নিতে পারবে না সেগুলোর খরচ চালানোর জন্য তহবিল দেওয়া হতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হওয়া কোন ক্ষতিগুলো ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ধরা হবে সেটি নির্ধারিত হয়নি এখনও।
রয়টার্স লিখেছে, গত জুনে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ৫৫টি দেশের যৌথ হিসাব বলছে, গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের মোট ৫২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা দেশগুলোর সামষ্টিক জিডিপির ২০ শতাংশ। কিছু গবেষণা বলছে, এই ক্ষতি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছরে ৫৮ হাজার কোটি ডলার হতে পারে।
কারা অর্থ দেবে, কারা পাবে?
জলবায়ু সম্মেলনের এই চুক্তির আওতায় ‘লস এন্ড ড্যামেজ’ তহবিলের অর্থ কারা দেবে আর কারা সেই অর্থ পাবে তা বিতর্কিত। গরিব দেশগুলো এবং জলবায়ু ক্যাম্পেইন পরিচালনাকারীরা যুক্তি দিয়ে আসছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমণ করে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী ধনী দেশগুলোর এই অর্থ দেওয়া উচিত।
কিন্তু এই দায় নিজেদের ঘাড়ে চাপার দায়ে ইউরোপী ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র ওই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে।
কপ-২৭ সম্মেলনে ইইউ তার অবস্থান পরিবর্তন করে বলেছে, চীনের অর্থায়নসহ কিছু শর্তের অধীনে তারা একটি তহবিলকে সমর্থন জানাবে। জাতিসংঘ চীনকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে রাখলেও সেটি দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন।
কোনো ফান্ড বা তহবিল গঠনের চুক্তির জন্য দেশগুলোকে খোলাখুলি বিস্তারিত তথ্য জানাতে হবে। অর্থ কোত্থেকে আসবে এবং কোন কোন দেশ বা দুর্যোগ ক্ষতি কাটিয়ে উঠার তহবিল দেওয়ার জন্য বিবেচ্য হবে তা নির্ধারণ করতে হবে।
ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, জার্মানি, স্কটল্যান্ড এবং ইইউ প্রতীকী অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাতিসংঘ ও কিছু উন্নয়ন ব্যাংক জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সাহায্য করলেও সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজের’ উদ্দেশে নয়।
সময় লাগবে আরও
রয়টার্স জানিয়েছে, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর চাপে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ এর বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে রাখা হয়েছিল। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল গঠনে সম্মত হয় দেশগুলো।
ইইউ বলেছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তার লক্ষ্য হলে তারা তহবিল গঠনে সমর্থন দেবে। আর এজন্য মালদ্বীপ আর জ্যামাইকার মতো দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় যুক্ত হতে পারে; যদিও ঝুকিপূর্ণ হিসাবে কাদের ধরা হবে- তা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি এখনও।
কপ-২৭ সম্মেলনে যে তহবিল গঠনের চুক্তি হয়েছে, সেখানে সব ঝামেলা চুকিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গরিব দেশগুলোর জন্য অর্থ ছাড়তেও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড গঠনের চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।" তবে কেবল এই ফান্ডই যথেষ্ট হবে না বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
আরও খবর
