ফের আকস্মিক বন্যা নেপালে, নিখোঁজ ৫
সরকারি বার্তা পৌঁছানোর প্রায় দুই ঘণ্টা আগেই স্থানীয়দের ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সতর্ক করায় রক্ষা পেয়েছে শত শত প্রাণ।
নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় গোর্খা জেলায় আকস্মিক বন্যায় অন্তত দুটি গ্রাম ও একাধিক সেতু পুরোপুরি ভেসে গেছে।
দেশটির সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ ধর্মীয় উৎসব 'দসাই' শুরুর দিনে নেমে আসা এই দুর্যোগে অন্তত পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে ৯ জন বিদেশি নাগরিকসহ অন্তত ৯৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে সেনাবাহিনী চারটি হেলিকপ্টার এবং ৭০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে।
বন্যাদুর্গত চুমুনুব্রি পল্লী পৌরসভার চেয়ারম্যান নিমা লামা জানান, নিখোঁজ পাঁচজনই রাখাল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পাশাপাশি প্রায় ১০০টি গরুও নিখোঁজ রয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় ২০৪টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাড়ে ছয় শতাধিক মানুষ সরাসরি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।
সেতু ও প্রধান সড়কগুলো ধসে পড়ায় পুরো এলাকাটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সেখানে ত্রাণ ও চলাচলের একমাত্র মাধ্যম কেবল আকাশপথ।
হঠাৎ এই প্রলয়ঙ্করী বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
তবে নেপাল সেনাবাহিনী আকাশপথে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে বলেছে, বুড়ি গণ্ডকী নদীর উজানে তুমচে এলাকায় ভূমিধসের কারণে পানির প্রবাহ আটকে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছিল, যা পরে ভেঙে গিয়ে নিম্নাঞ্চলে এই বিপর্যয় ঘটায়।
অনেকে হিমবাহ ধসের কথা বললেও ঘন মেঘের কারণে স্যাটেলাইট চিত্রে তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিবিসি লিখেছে, আকস্মিক এই বন্যায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত সতর্কতার কারণে।
রোববার ভোর পৌনে ৫টার দিকে নদীতীরবর্তী জগৎবগর গ্রামের শুন গুরুং উজান থেকে ফোন পেয়ে সবাইকে ঘুম থেকে তুলে উঁচু পাহাড়ি বনে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন বলে জানিয়েছে নেপালি পত্রিকা দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট।
ভোর ৪টা ৫২ মিনিটে নিজের বাড়ি ভেসে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা বিশাল ঘালে ফেইসবুকে লাইভ সম্প্রচার করে নিম্নাঞ্চলের আরুঘাটের বাসিন্দাদের সতর্ক করেন।
অথচ দুর্যোগ সংস্থার সরকারি সতর্কতামূলক গণ-এসএমএস উচ্চাঞ্চলে পৌঁছায় সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে এবং নিম্নাঞ্চলে যেতে সকাল ৯টা বেজে যায়। ততক্ষণে স্থানীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন।
বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের মুখপাত্র রাজন ভট্টরাই এই বিলম্বের কথা স্বীকার করে বলেন, নিকটতম সেন্সরটি ছিল দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে আরুঘাট বাজারে। ফলে তারা দ্রুত সময়ে তথ্য পাননি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি বার্তার ভরসায় থাকলে শত শত মানুষকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই ঢলে ভেসে যেতে হত।
নেপালের সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়, যা দেশটির পর্যটনশিল্পের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
তবে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের আবহাওয়া অনেকটাই অনিশ্চিত থাকে। সেখানে ভূমিধস ও তুষারধসের কারণে নিম্নাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রায়ই আকস্মিক ঢল ও বন্যার সৃষ্টি হয়।
এছাড়া নেপাল অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। ভূকম্পনের প্রভাবে পাহাড়ের বরফ ও তুষারস্তর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
২০১৫ সালে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটিতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা মাউন্ট এভারেস্টে প্রাণঘাতী তুষারধস ডেকে এনেছিল।
সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে শত শত মানুষের মৃত্যু ও হাজারো মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পেছনে হিমালয়ের 'লাংতাং লিরুং' শৃঙ্গের কাছের শিলা ও বরফধসকেই দায়ী করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
