৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

নির্বাচনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: ইসরায়েলের সামনে কী

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো পক্ষই।

নির্বাচনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: ইসরায়েলের সামনে কী

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Oct 2026, 11:45 AM

Updated : 30 Oct 2026, 11:45 AM

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাসের এক গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে ইসরায়েল।

দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো পক্ষ।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি লিকুদ পার্টি কিংবা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থি ‘ইয়াশার’ দলের বিরোধী জোট–উভয় শিবিরই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে রয়েছে।

গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনের কারণে যে কোনো স্বাভাবিক কোয়ালিশন গঠন করা প্রায় অসম্ভব। তারপরও যদি কোনোক্রমে একটি নড়বড়ে জোট সরকার করা যায়, তা বছরখানেকও টিকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে বিশ্লেষকদের।

দলগুলোর হাতে থাকা ১২ সপ্তাহের সময়সীমার মধ্যে কোনো সমাধান না এলে ইসরায়েলিদের আবারও ভোটকেন্দ্রে যেতে হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে কী কী ঘটতে পারে, তার চারটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে সিএনএন এর প্রতিবেদনে।

দৃশ্যপট ১: বিরোধী জোটের সরকার

কাগজে-কলমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হল ইহুদি ও আরব দলগুলোর যৌথ সহযোগিতা। কিন্তু এটিই এখন বিরোধী শিবিরের সবচেয়ে বড় বাধা।

বিরোধী জোটের দুই ডানপন্থি নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবিগদোর লিবারম্যান, সরকার পরিচালনায় পার্লামেন্টের দুই আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রামের ওপর নির্ভর করার তীব্র বিরোধী।

আরবদের সরকারে নেওয়া কিংবা বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করা, উভয় পথেই ঘোর আপত্তি তাদের। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পর এই দুই নেতা আরও কঠোর অবস্থানে গেছেন।

ইসরায়েলের ইতিহাসে মাত্র একবার একটি আরব দলের পূর্ণ অংশগ্রহণে সরকার গঠিত হয়েছিল। ২০২১ সালে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গঠিত আট দলের জোটে ‘রাম’ পার্টি অংশ নিলেও সেই সরকার টিকেছিল মাত্র এক বছর।

সরকার গঠন করতে না পারলেও বিরোধী দলগুলো তাদের সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে নেসেটের স্পিকারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজেদের দখলে নিতে পারে।

এর মাধ্যমে ক্ষমতায় বহাল থাকা নেতানিয়াহুর অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা বড় ধরনের চাপে ফেলতে সক্ষম হবে। তবে নেতানিয়াহুকে হটিয়ে নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা এখনও অত্যন্ত জটিল।

দৃশ্যপট ২: জাতীয় ঐক্যের সরকার

আরেকটি বিকল্প হতে পারে দুই প্রধান শিবিরের বিভাজন ভেঙে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা।

এই সমীকরণে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তার বর্তমান মিত্রদের সঙ্গে বিরোধী জোটের অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ দলকে যুক্ত হতে হবে।

রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, এমন সরকার গঠনের স্বার্থে নেতানিয়াহু তার কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতমার বেন-গভিরকে বাদ দিতে রাজি হতে পারেন। তবে কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এবং আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোকে তিনি ছাড়তে নারাজ।

অন্যদিকে আইজেনকোট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো সরকারে বসবেন না। নেতানিয়াহু বা ‘বিবি’র বিদায় দেখতে উন্মুখ ইসরায়েলি নাগরিকদের কাছে আইজেনকোটের অবস্থান পরিবর্তন এক ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে গণ্য হবে।

দৃশ্যপট ৩: দলত্যাগী আইনপ্রণেতাদের নিয়ে নেতানিয়াহু

তৃতীয় বিকল্প হিসেবে নেতানিয়াহু বিরোধী দলগুলোতে ভাঙন ধরিয়ে বা ব্যক্তিগতভাবে সংসদ সদস্যদের দলত্যাগে উৎসাহিত করে সরকার গড়ার চেষ্টা করতে পারেন।

তবে বিরোধী শিবিরের চার প্রধান নেতা, আইজেনকোট, বেনেট, লিবারম্যান ও ইয়াইর গোলান ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তারা নেতানিয়াহুর সঙ্গে বসবেন না।

তাছাড়া নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পুরো আটটি আসন দূরে রয়েছে। তাই বিরোধী শিবির থেকে আটজন সংসদ সদস্যকে ভাগিয়ে আনা হবে বিরাট কঠিন কাজ।

দৃশ্যপট ৪: ফের নির্বাচন ও দীর্ঘ টানাপড়েন

পর্দার আড়ালে এসব আলোচনা চলার মধ্যেই ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ পার্লামেন্টে জায়গা পাওয়া দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য আলোচনা শুরু করবেন।

সবার মতামত নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট যে কোনো একজন নেতাকে প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। আরব দলগুলো আইজেনকোটকে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবায় ইয়াশার প্রধানই প্রথম এই সুযোগ পেতে পারেন।

দায়িত্ব পাওয়া নেতা সরকার গঠনের জন্য প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।

প্রথম নেতা ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় কোনো নেতাকে দায়িত্ব দেবেন, যিনি কেবল ২৮ দিন সময় পাবেন।

সেটিও যদি ব্যর্থ হয়, তবে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে মনোনীত করার অনুরোধ করতে পারেন, যার হাতে জোট গড়ার জন্য সময় থাকবে মাত্র ১৪ দিন।

এই সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে দেশকে আবারও নির্বাচনের দিকে যেতে হবে।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন খোদ নেতানিয়াহু।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অপেক্ষার সুযোগ রয়েছে। আইজেনকোট প্রথম সুযোগে ব্যর্থ হলে ম্যান্ডেট ঘুরে নেতানিয়াহুর কাছেই আসবে।

আর তিনিও যদি ব্যর্থ হন, তবে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস ধরে তিনিই অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় বহাল থাকবেন।

নতুন করে ভোট হলে ইসরায়েল আবারও গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখে পড়বে।

আর তেমনটি ঘটলে আগামী বসন্তের আগে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই, যা হবে গত আট বছরে ইসরায়েলের সপ্তম সাধারণ নির্বাচন।