নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধী জোটকে সমর্থনের প্রস্তাব দিলেন আরব নেতা জাবারিন
ইসরায়েলের আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’ প্রধান ইউসুফ জাবারিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে সরাতে বিরোধী জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সরাসরি কোয়ালিশন সরকারে যোগ না দিয়ে বিরোধী জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন দেশটির অন্যতম শীর্ষ আরব নেতা ইউসুফ জাবারিন।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের নীতি বহাল থাকায় বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও ইসরায়েলি সরকারের অংশ হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ইসরায়েলের আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’ প্রধান জাবারিন বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ ও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের বিষয় বিবেচনা করে কোনও ইসরায়েলি কোয়ালিশন সরকারের অংশ হওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।”
তিনি আরও বলেন, “তবে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে জোটের বাইরে থেকে একটি বিকল্প সরকারকে সমর্থন দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব।”
অর্থাৎ, নেতানিয়াহু ও তার কট্টর ডানপন্থি অংশীদারদের (যেমন বেন-গভির ও স্মোট্রিচ) ক্ষমতা থেকে সরাতে যে কোনও বিকল্প সরকারকে (যেমন: প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘চেঞ্জ ব্লক’ বা পরিবর্তনকামী জোটের সংখ্যালঘু সরকার) সমর্থন দিতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন জাবারিন।
৮৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ১২০ আসনের নেসেটে কোনও পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। তবে দুটি প্রধান আরব দল ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রা’আম’ যৌথভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে, যা নতুন সরকার গঠনে অত্যন্ত নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নেতানিয়াহু সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতি ও গাজায় সামরিক অভিযানের কারণে আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং বিরোধী জোটের প্রধান সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট, উভয়েই পরবর্তী সরকার গঠনের কড়া বার্তা দিয়েছেন।
তবে জাবারিন স্পষ্ট করে বলেন, নেতানিয়াহুর ‘রক্তে রাঙানো’ শাসনের বিপরীতে একটি প্রকৃত ও কার্যকর বিকল্প দাঁড় করাতে চাইলে বিরোধী পক্ষকে অবশ্যই আরব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।
তিনি বলেন, “এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, হয় বর্ণবাদ, বর্জন ও শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারা বজায় থাকবে, নয়ত ইহুদি ও আরবদের মধ্যে এক বাস্তব অংশীদারত্ব গড়ে উঠবে।”
ওদিকে, নির্বাচনের ভোট গণনার মধ্যেই নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি প্রকাশ্যে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন ‘চুরি’ করার অভিযোগ এনেছে।
এমনকি মঙ্গলবার ভোটের দিনও নেতানিয়াহু একই অভিযোগ এনে তার সমর্থকদের বিপুল সংখ্যায় কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।
লিকুদ পার্টি এক বিবৃতিতে দাবি করে, যেসব আরব দল সন্ত্রাসবাদ ও ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংসকে সমর্থন করে, তারা ঘুষ, হুমকি, জালিয়াতি ও নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করে জনরায় ছিনতাই করেছে। নগদ অর্থ ভর্তি খাম ও অন্যান্য জালিয়াতির প্রমাণ পুলির কাছে জমা দেওয়ার কথা জানায় তারা।
ভোটের দিন রাতেই পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে নগদ ২৪ হাজার শেকেল (প্রায় ৭,৯০০ ডলার) ও ‘রাম’ দলের ব্যালট উদ্ধার করে।
তবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক দিন লিভনে ঘটনাটিকে ‘ব্যতিক্রমী ও বিচ্ছিন্ন’ উল্লেখ করে জানান, পুলিশ সন্দেহভাজনদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই তাদের বাড়ির পাশ থেকে আটক করেছে এবং ঘটনার তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে, রাম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস নেতানিয়াহুর অভিযোগকে মিথ্যা ও উসকানিমূলক আখ্যা দেন।
বিরোধী নেতা আইজেনকোটের দলও বলেছে, নেতানিয়াহু মূলত পরাজয় নিশ্চিত বুঝে নির্বাচনের ফলকে আগে থেকেই বিতর্কিত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু ক্রমাগত বিরোধীদের আক্রমণ করে “হয় ডানপন্থি, নয় ফিলিস্তিন” স্লোগানে প্রচারণা চালান এবং দাবি করেন বিরোধীরা জিতলে আরবদের ক্ষমতায় বসাবে।
গাদি আইজেনকোট নিজে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটে যাওয়ার ব্যাপারে অনিচ্ছুক ছিলেন। তবে তার জোটের শরিক ও ইসরায়েলের প্রধান বামপন্থী দলের প্রধান ইয়াইর গোলান হেঁটেছেন ভিন্ন পথে।
বিরোধী শিবিরের প্রথম নেতা হিসেবে প্রকাশ্যে আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গড়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
গোলান বলেন, “নেতানিয়াহু হেরে গেছেন। আমি ১২০ পর্যন্ত গুনতে জানি। ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর তৈরি করা বর্ণবাদী বিভাজন আর মেনে নেওয়া যায় না।”
তবে আইজেনকোটের জোটে থাকা কট্টর ডানপন্থি প্রতিনিধিরা এখনও আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিচ্ছেন।
