Published : 11 Nov 2025, 12:49 AM
ধীর গতিতে সিগন্যালে এসে থামে একটি হুন্ডাই আই২০ হ্যাচব্যাক গাড়ি। তার পরই বিস্ফোরণ। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে লাল কেল্লার সামনে এভাবেই ভয়াবহ গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে সোমবার সন্ধ্যায়।
লালকেল্লা মেট্রো স্টেশনের ১ নম্বর গেটের কাছে এই বিস্ফোরণে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, লালবাতিতে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ভিতরেই ঘটে বিস্ফোরণ। মুহূর্তে আগুনে জ্বলে ওঠে গাড়িটিতে।
বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, আশপাশের অন্তত ২২টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনাটি আত্মঘাতী হামলা বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে এখনও এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
তবে দিল্লি পুলিশ কমিশনার সতীশ গোলচার বক্তব্যে বিস্ফোরণের ঘটনাটি আত্মঘাতী হামলা হতে পারে- এমন ইঙ্গিত রয়েছে।
তিনি বলেন, “আজ (সোমবার) সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটে একটি ধীর গতির গাড়ি রেড সিগন্যালে লাল কেল্লার কাছে এসে থামে। সেই গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের কারণে কাছের আরও কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সমস্ত সংস্থা এখানে রয়েছে। এই ঘটনায় কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং অনেকে আহতও হয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
ঘটনাটি আসলেই আত্মঘাতী হামলা কিনা তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ভারতীয় পত্রিকা এনডিটিভি জানায়, বিস্ফোরণ ঘটা আই২০ গাড়িটির নম্বরপ্লেট হরিয়ানার। মহম্মদ সালমান গাড়ির প্রকৃত মালিক। পরে তিনি গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
হরিয়ানার গুরুগ্রামে সালমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের জেরায় সালমান জানিয়েছেন, গাড়িটি তিনি তারেক নামে পুলওয়ামার এক বাসিন্দার কাছে বিক্রি করেছিলেন। তবে কাগজপত্রে এখনও নাম বদল হয়নি। দিল্লি পুলিশ এ ব্যাপারে হরিয়ানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, “সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যা উঠে আসবে, সব প্রকাশ করা হবে জনসমক্ষে।”
বিস্ফোরণের ১০ মিনিটের মধ্যেই দিল্লি ক্রাইম ব্রাঞ্চ ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের টিম ঘটনাস্থলে পৌছে যায় জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এনএসজি, এনআইএ এবং ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির দল পূর্ণ তদন্ত শুরু করেছে।
আশপাশের সব সিসিটিভি ক্যামেরা পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও সম্ভাবনাই বাদ দেওয়া হচ্ছে না।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন।
দিল্লির লাল কেল্লার সামনে প্রতিদিনই সন্ধ্যায় ভিড় জমান দেশি-বিদেশি পর্যটকরাসহ স্থানীয় বাসিন্দারাও। সোমবারও লালকেল্লার সামনে ভিড় করেছিলেন তারা। আচমকাই গাড়ি বিস্ফোরণ হয়। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। মুহূর্তেই হইচই পড়ে যায়। আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করে সবাই।
হুন্ডাই আই-২০ নাকি মারুতি সুইফট ডিজায়ার?
দিল্লি পুলিশ এনডিটিভি-কে জানায়, বিস্ফোরণটি সম্ভবত হুন্ডাই আই২০ হ্যাচব্যাক গাড়িতেই হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গাড়িটি ছিল একটি মারুতি সুইফট ডিজায়ার।
এ মুহূর্তে কোনও তথ্যই স্পষ্ট নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, গাড়িতে কয়েকজন ছিলেন এবং বিস্ফোরণ গাড়ির পিছনের অংশে ঘটেছে, সম্ভবত লাগেজ রাখার জায়গায় (বুট)। বিস্ফোরণটি শক্তিশালী হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে কোনও গর্ত তৈরি হয়নি।
ভারতের প্রধান সন্ত্রাস-বিরোধী সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি-সহ ফরেনসিক বিশ্লেষকরা ঘটনাস্থলে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করছেন এবং গাড়ির প্রস্তুতকারক, মডেল এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর শনাক্ত করার জন্য কাজ করছেন, যা অপরাধীদের খুঁজে বের করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে বিস্ফোরণটি কী ধরনের ছিল তা পরিষ্কার নয়। তবে ভারতের সব রাজ্য নিরাপত্তা সংস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। প্রধান সব শহরেও উচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। ইন্দো-নেপাল সীমান্তেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নেপালের সঙ্গে খোলা সীমান্ত পার হওয়া সব দর্শনার্থীর ওপর নজর রাখছেন।
ফরিদাবাদে বিস্ফোরক উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা পরই বিস্ফোরণ:
বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগেই ঘটনাস্থলের কাছেই ফরিদাবাদে বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল ৩৫০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। সাধারণত সার হিসাবে ব্যবহার হলেও এই উপাদানকে মারাত্মক বোমায় রূপান্তরিত করা যেতে পারে।
জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ধরা পড়া চিকিৎসক আদিল রাদার-এর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই বিস্ফোরক জব্দ করা হয়। শ্রীনগরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জইশ-ই-মহম্মদ-এর সমর্থনে পোস্টার লাগানোর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়ার পর রাদারকে রোববার উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তদন্তে জম্মু ও কাশ্মীর-এর আরও একজন স্বাস্থ্যকর্মী, মুজাম্মিল শাকিল-এর নাম উঠে আসে। তিনি ফরিদাবাদের আল-ফালাহ হাসপাতালে কাজ করতেন। হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, শাকিল ক্যাম্পাসে থাকতেন।
তবে, পুলিশ তার সঙ্গে জড়িত অন্তত দুটি অফ-ক্যাম্পাস বাড়ি খুঁজে পায়। সেগুলোতে তল্লাশি চালানো হলে পুলিশ ১২টি স্যুটকেসে ভর্তি বিস্ফোরক উপাদান দেখে বিস্মিত হয়।
ডিটোনেটর এবং টাইমারের মতো বিস্ফোরক ডিভাইস সম্পর্কিত জিনিসপত্রও পাওয়া গেছে তল্লাশিতে। আরেকজন নারী সহকর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তার মারুতি সুজুকি সুইফট ডিজায়ার সাব-কমপ্যাক্ট সেডান গাড়িতে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল এবং কিছু গোলাবারুদ রাখা ছিল।
আরেকটি রাইফেল ও আরও গোলাবারুদ অনন্তনাগের জিএমসি-এর স্টাফ লকারে পাওয়া যায়, যেখানে রাদার গত বছর পর্যন্ত কাজ করতেন।