Published : 22 May 2026, 09:28 PM
২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে ডেমোক্রেটিক পার্টির বহু প্রতীক্ষিত ‘অটোপ্সি রিপোর্ট’ বা অভ্যন্তরীন পর্যালোচনা প্রতিবেদন অবশেষে প্রকাশ করা হয়েছে।
দলীয় কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির (ডিএনসি) চেয়ারম্যান কেন মার্টিন প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন। তবে বৃহস্পতিবার জনসমক্ষে আসা এই প্রতিবেদনকে ‘অসম্পূর্ণ ও অমীমাংসিত’ এবং তথ্যগত ভুলে ভরা বলেই অভিহিত করা হচ্ছে।
ডিএনসি চেয়ারম্যান নিজেও এই প্রতিবেদনের ত্রুটিবিচ্যুতি স্বীকার করে এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমি এই কাজটি নিয়ে গর্বিত নই; এটি আমার বা আপনাদের মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। আমি এই প্রতিবেদনে যা আছে বা যা বাদ পড়েছে, তার কোনোটিই অনুমোদন করি না। আমি সদ্বিশ্বাস নিয়ে এতে ডিএনসি-র অনুমোদনের সিলমোহর দিতে পারতাম না।”
কিন্তু স্বচ্ছতা সর্বাগ্রে। তাই স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিবেদনটি যেভাবে আছে সেভাবেই কোনও রকম সম্পাদনা ছাড়া প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রতিবেদনটি এখন প্রকাশ না করলে আরও বড় ক্ষোভ তৈরি হত বলেও মন্তব্য করেন মার্টিন।
প্রতিবেদনের প্রধান ৫টি দিক তুলে ধরেছে আল-জাজিরা:
গাজা পরিস্থিতির উল্লেখ নেই:
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট দল ও কমলা হ্যারিসের জন্য সবচেয়ে বিতর্কিত ও বিভাজনমূলক ইস্যু ছিল গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা দিয়েছিলেন; যা ফিলিস্তিনি অঞ্চলটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং তীব্র দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির একাধিক প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল।
এই আপোসহীন ইসরায়েলপন্থি নীতির কারণে ডেমোক্র্যাটদের নিজস্ব ভোটারদের একটি বড় অংশ হ্যারিসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
তৎকালীন ভাইস-প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর জোর দিলেও ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
তার প্রচারশিবির ২০২৪ সালের অগাস্টে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে এক ফিলিস্তিনি আমেরিকান প্রতিনিধির জন্য স্পিকিং স্লট বরাদ্দ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কিছু জরিপে দেখা গেছে নির্বাচনে হ্যারিসের হারের প্রধান কারণগুলোর একটি ছিল গাজা নীতি।
২০২৫ সালে আইএমইইউ পলিসি প্রজেক্ট জরিপে দেখা গেছে, ২০২০ সালে বাইডেনকে ভোট দেওয়া, কিন্তু ২০২৪ সালে হ্যারিসকে ভোট না দেওয়া ভোটারদের জন্য গাজা ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়।
তারপরও, ১৯২ পৃষ্ঠার ‘অটোপ্সি রিপোর্টে ‘গাজা’ বা ‘ইসরায়েল’ শব্দটি একবারের জন্যও কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।
অবশ্য হ্যারিসের প্রচার শিবিরের ডেপুটি ম্যানেজার রব ফ্লাহার্টি সম্প্রতি লিখেছেন, “অনেকের জন্য গাজার নির্মম দৃশ্যগুলো নৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যার কোনও ভালো উত্তর আমাদের কাছে ছিল না। এটি ভোটারদের উৎসাহ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছিল। প্রচারণার একজন আমাকে বলেছিলেন, ‘আমরা পুরো নির্বাচনটি গলায় একটি বিশাল পচা মাছ ঝুলিয়ে পার করেছি’।”
বাদ পড়া অনুচ্ছেদ, ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ তথ্য:
ডিএনসি প্রতিবেদনটি যেভাবে পেয়েছে ঠিক সেভাবেই প্রকাশ করেছে এবং এর ভেতরের চিত্রটি মোটেও সন্তোষজনক নয়। নানা ত্রুটিবিচ্যুতিসহ এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত থেকে গেছে।
প্রতিবেদনের ‘এক্সিকিউটিভ সামারি’ (সারসংক্ষেপ) এবং ‘উপসংহার’ অংশটি পুরোপুরি বাদ রয়ে গেছে। সেখানে কেবল "পেন্ডিং" বা বাকি আছে কথাটি লেখা রয়েছে এবং এর ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে, লেখক এটি দেননি।
তাছাড়া নথিতে এমন অনেক প্রশ্নবিদ্ধ ও ভুল দাবি করা হয়েছে, যার কারণে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় “দাবিটি জনসাধারণের কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক” বা “উপাত্তটি নির্ভুল নয়” এমন নোট জুড়ে দিতে হয়েছে। এমনকি দলটির মৌলিক কিছু তথ্যও ভুল ছিল; যেমন ২০২৪ সালে ডেমোক্র্যাটরা তিনটি গভর্নর পদে জিতলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দুটি।
আবার মিশিগান, পেনসিলভেইনিয়া ও উইসকনসিন রাজ্যকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য ‘সবসময় নির্ভরযোগ্য’ বলা হয়েছে, অথচ ২০১৬ সালে এই তিনটি রাজ্যেই ট্রাম্প জিতেছিলেন।
প্রতিবেদনটি মাসের পর মাস প্রকাশিত না হওয়ার বিষয়ে ডিএনসি চেয়ারম্যান মার্টিন বলেন, এটি মেরামত করার মতো অবস্থায় ছিল না।
তিনি জানান, প্রতিবেদনটি গত বছরের শেষ দিকে যখন তার হাতে আসে, তখনই এটি প্রকাশের অযোগ্য ছিল এবং কোনো উৎস বা সোর্স মেটেরিয়াল না থাকায় এটি সংশোধন করার অর্থ ছিল একদম শুরু থেকে কাজ শুরু করা।
মার্টিন বলেন, “আমি যা চেয়েছিলাম তা হল ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ। আমি আমাদের সংস্থান, প্রযুক্তি, ডেটা, সংগঠন, মিডিয়া কৌশল এবং আরও অনেক কিছুর বরাদ্দ উন্নত করতে বাস্তব, নিবিড়, নির্দিষ্ট সুপারিশ চেয়েছিলাম। আমি এমন একজনকে বেছে নিয়েছিলাম যাকে আমি ভেবেছিলাম এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে।”
কমলা হ্যারিসকে পর্যাপ্ত সমর্থন দেননি বাইডেন:
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তৎকালীন ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন কীভাবে তার স্বামীকে সমর্থন করতে পারেন তা নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) জরিপ চালালেও, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের জন্য এমন কোনো গবেষণা করা হয়নি।
একই সঙ্গে হোয়াইট হাউজ হ্যারিসকে অভিবাসনের মতো একটি বিতর্কিত বিষয়ের দায়িত্ব দিলেও তাকে রাজনৈতিকভাবে সেটি মোকাবেলার কোনও প্রশিক্ষণ দেয়নি।
হ্যারিস অভিবাসনের নিয়মবিধি নিয়ে নয় মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অভিবাসনের মূল কারণগুলো তুলে ধরা নিয়ে কাজ করছিলেন, তারপরও রিপাবলিকানরা সহজেই তাকে ‘বর্ডার জার’ বা ‘সীমান্ত সম্রাট’ তকমা দিয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রশাসনের বার্তাবাহকদের প্রতি ভোটাররা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি বোঝার জন্য কোনও গবেষণা না করেই হ্যারিসকে একটি বিতর্কিত বিষয়ের মুখোমুখি করে হোয়াইট হাউজ বিশাল এক সুযোগ হাতছাড়া করেছে।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যদি প্রথম থেকেই হ্যারিসকে প্রস্তুত করতেন এবং প্রশাসনে পরিস্থিতি তার অনুকূলে রাখার উপায়গুলো মূল্যায়ন করতেন, তবে তাদের দুইজনের জন্যই উপকার হত বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
কেবল ট্রাম্পের বিরোধিতা করার কৌশল ব্যর্থ হয়েছে:
হ্যারিসের প্রচাোভিযানের একটি বড় সমালোচনা এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেটি হলো, কমলা হ্যারিস নিজের কোনও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা দূরদৃষ্টি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং পুরো প্রচারণায় কেবল ‘ট্রাম্পকে পরাজিত করা’ এবং ‘কৌসুলি বনাম অপরাধী’ ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন।
কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের অধীনে দেশজুড়ে চলা তীব্র অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের মধ্যে ভোটারদের জন্য ‘কেবল ট্রাম্পের বিরোধিতা করাই’ যথেষ্ট অনুপ্রেরণাদায়ী ছিল না।
তাছাড়া, হ্যারিসের প্রচার শিবির ট্রাম্পের পূর্ববর্তী মেয়াদের অযোগ্যতা, ত্রুটি ও নেতিবাচক দিকগুলো ভোটারদেরকে ঠিকভাবে মনে করিয়ে দিতেও ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রান্সজেন্ডার বিজ্ঞাপন হ্যারিসকে ‘কোণঠাসা’ করেছে:
নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম আলোচিত একটি বিজ্ঞাপন ছিল হ্যারিসের পুরোনো একটি বক্তব্য, যেখানে তিনি কারাবন্দি ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তকামী কয়েদিদের লিঙ্গ পরিবর্তন অস্ত্রোপচারের অধিকারকে সমর্থনের কথা বলেছিলেন।
ট্রাম্পের প্রচারশিবির হ্যারিসের ওই বক্তব্যকে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন বানায় যার শেষ বাক্য ছিল: “কমলা হলেন তাদের জন্য; প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হলেন আপনার জন্য।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপকারীরা সবাই স্বীকার করেছেন যে, এই আক্রমণ অত্যন্ত কার্যকর ছিল এবং হ্যারিসের প্রচারশিবির এতে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।
হ্যারিসের অতীত ওই বক্তব্যকে কাজে লাগিয়ে মূলত রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি নিয়ে ভোটারদের মাঝে ক্ষোভ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।
যেহেতু হ্যারিস তার আগের অবস্থান পরিবর্তন করতে চাননি, তাই ট্রাম্পশিবিরের ওই বিজ্ঞাপনের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কার্যকর কোনও কৌশল ডেমোক্র্যাটদের কাছে ছিল না।