Published : 07 May 2026, 07:49 PM
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে বুধবার একদিকে যেমন বাল্ক ক্যারিয়ার থেকে কনভেয়ার বেল্টের সাহায্যে নামানো হচ্ছিল খাদ্যশস্য, আরেকদিকে পাইপের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল যাচ্ছিল জেটি ঘেঁষে থাকা ট্যাংকারগুলোতে।
ডজনের পর ডজন পণ্যবাহী ট্রাক সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বন্দরটির কাছে, বাইরে অপেক্ষায় আছে আরও। কাছেই সমুদ্রে নোঙর করা ছিল কসকো, গার্ডেনিয়াসহ বিভিন্ন কোম্পানির বড় বড় জাহাজ, তাদের মাঝখানে ছোট ছোট সার্ভিস নৌকা ছোটাছুটি করছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর এই ফুজাইরা আর পূর্বাঞ্চলীয় আরেক বন্দর খোর ফাক্কান-ই হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক লাইফলাইন। এই দুই বন্দর দিয়েই সরাসরি ভারত মহাসাগরে যাওয়া যায়।
বন্দর দুটি এখন আমিরাতের সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সিংহভাগ সামলাচ্ছে, কারণ উপসাগরের ভেতর পশ্চিম উপকূলে তাদের বড় বড় টার্মিনালগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে, সেখানে অনেক জাহাজও আটকা পড়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফুজাইরা দিয়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ৩৮% বেড়েছে, যা যোগানদাতা পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
আর খোর ফাক্কানের টার্মিনাল পরিচালক গালফটেইনার জানিয়েছে, তারা আগে যে পরিমাণ কনটেইনার সামলাতেন এখন তা প্রায় ২৫ গুণ বেড়ে গেছে।
এর মধ্যেই ইরানি ড্রোন সোমবার ফুজাইরার তেল শিল্পাঞ্চলে আঘাত হেনে মনে করিয়ে দিয়েছে বন্দরগুলো কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে। ওই ড্রোন হামলায় আরব আমিরাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল একটি জ্বালানি স্থাপনায় আগুন ধরে যায় ও তিন কর্মী আহত হয়।
তার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের একটি মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে ওই দুই বন্দরসহ আমিরাতের পুরো পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলই পড়ে।
নৌচলাচল সংক্রান্ত একাধিক সূত্র মঙ্গলবার জানায়, এখন পর্যন্ত আমিরাতের এই দুই বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও মানচিত্র প্রকাশ করে তেহরান স্পষ্ট বার্তাই দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য চাইলে তারা তাদের কেন্দ্রীয় ও ফুজাইরা কর্তৃপক্ষ, আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডনক) ও রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ডব্লিউএএমে দেওয়া সরকারি বিবৃতিগুলো দেখিয়ে দিয়েছে।
দেশটির কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার এবং তারা তাদের ওপর হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার রাখেন।
“আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবাহবে বিঘ্নিত বা সরবারহ রুটকে হুমকিতে ফেলার অধিকার কোনো দেশেরই নেই,” গত মাসেই সেন্ট পিটার্সবার্গে এক লজিস্টিকস ফোরামে এমনটাই বলেছিলেন আমিরাতের জ্বালানি মন্ত্রী সুহাইল আল মাজরুই।
ফুজাইরা’র অবস্থান আবু ধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের একেবারে শেষপ্রান্তে, সীমান্তের ভেতর থাকা তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে যে পাইপলাইন প্রতিদিন ১৫ লাখ থেকে ১৮ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে ওমান উপসাগরে নিয়ে যেতে পারে এবং আরব আমিরাতের এডনক’কে দেয় বৈশ্বিক বাজারে তার রপ্তানি চালু রাখার সুযোগ।
ফেব্রুয়ারিতেও ফুজাইরা বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে ১১ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো, মার্চের শেষের দিকে তা বেড়ে ১৬ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়ায় বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রথমবার ফুজাইরায় নিয়মিতভাবে কনটেইনারভর্তি নৌযানও যেতে শুরু করে, বলছে কেপলার।
খোর ফাক্কানের রূপান্তর তো আরও নাটকীয়।
এর আগে প্রতি সপ্তাহে বন্দরটি দুই হাজারের মতো আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার সামলাতো, এখন তা লাফ মেরে ৫০ হাজারে পৌঁছেছে বলে জানাচ্ছে গালফটেইনার।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বন্দরে ভিড়তে অনুমতি চাওয়া কনটেইনার নৌযানের সংখ্যা বেড়ে প্রায় চারগুণে পৌঁছেছে বলে জানাচ্ছে কেপলারের তথ্যও।
“এটা এখন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রবেশদ্বারের দায়িত্ব পালন করছে,” মঙ্গলবার এমনটাই বলেছেন গালফটেইনারের প্রধান নির্বাহী ফরিদ বেলবাব।
ঐতিহাসিকভাবে এ বন্দরটি নির্মিত হয়েছিল ট্রান্সশিপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, কিন্তু এখন পরিণত হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির প্রধান হাবে, বলছিলেন তিনি।
খোর ফাক্কানে এখন যে পরিমাণ ট্রাকের আনাগোনা, তাও একই বার্তা দিচ্ছে।
“যুদ্ধের আগে প্রতিদিন বড়জোর ১০০ ট্রাক আসা যাওয়া করতো, এখন সেটা ৭ হাজারের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে,” যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে শারজাভিত্তিক কোম্পানিটিকে ৯০০ লোক নিয়োগ দিতে হয়েছে জানিয়ে বলেন বেলবাব।
নৌযান চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী রেবেকা গের্ডস মঙ্গলবার বলেছেন, দুই বন্দরের ওপর চাপ এখন এতটাই বেশি যে সোমবারের হামলার পরও বন্দরগুলোর ভিড় কমেনি।
খোর ফাক্কানে ছয়টি কনটেইনার জাহাজ ভিড়েছে, অপেক্ষায় আছে আরও ১০টি। এদিকে তুলনামূলক কম ধারণক্ষমতার ফুজাইরাতে আছে দুটি, অপেক্ষায় একটি।
বিভিন্ন লজিস্টিকস কোম্পানি বলছে, এখন পর্যন্ত তাদের কার্যক্রমে ছেদ পড়েনি।
ফ্রান্সভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি জিওডিসের এশিয়া-প্যাসিফিক ও পশ্চিম এশিয়ার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক মার্টিন-নিউভিল মঙ্গলবার বলেন, ভিড় ছাড়া কোনো বন্দরেই কোনো ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়ছেন না তারা।
“সৌদি আরব ও ওমান হয়ে দীর্ঘ সড়কপথের ট্রানজিট ও সীমান্ত ক্রসিং এড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী মালামাল পাঠাতে আমিরাতের এ বন্দরগুলোই এখন একমাত্র বিকল্প,” বলেছেন তিনি।
হরমুজ বন্ধ থাকায় কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতই তড়িঘড়ি বিকল্প পথ প্রস্তুত করেছে—এমন নয়। সৌদি আরবেরও এমন সুবিধা রয়েছে, পাশাপাশি তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও যুদ্ধের মধ্যেই প্রতিদিন গড়ে ৭০ লাখ ব্যারেল রপ্তান প্রবাহ সচল রেখেছিল। হরমুজকে এড়িয়ে তারা লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে কাজ চালাতে পারছে।
কিন্তু বসন্তের শুরুতে ইরান ওই পাইপলাইন এবং বন্দর উভয়ের ওপরই হামলা চালিয়েছিল, যা মনে করিয়ে দিচ্ছে—সৌদি আরবও ইরানের হাত থেকে সুরক্ষিত নয়।
কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন ভৌগোলিকভাবে এতটা সৌভাগ্যবান নয়, তাদের সামুদ্রিক লিংকগুলো সবই হরমুজের কারণে আটকা। যে কারণে তারা সমুদ্রপথে আমদানির জন্য খোর ফাক্কানের ওপর নির্ভরশীল, না হয় সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে মালামাল আনতে খরচ যেমন অনেক বাড়বে তেমনি সময়ও লাগবে অনেক বেশি।
এসব কারণেই আরব আমিরাতের দুই পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরের গুরুত্ব এখন দেশের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
গালফটেইনারের বেলবাব এরই মধ্যে খোর ফাক্কানকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছেন; শিগগিরই বন্দর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে আল দায়েদে ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে একটি নতুন লজিস্টিকস হাবের ঘোষণাও আসতে যাচ্ছে বলে তার ধারণা।
খোর ফাক্কানের সঙ্গে সড়ক ও রেলের মাধ্যমে সংযুক্ত ওই স্থাপনাটি কন্টেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট সামলাবে এবং সাধারণ কার্গোর গুদাম হবে। শারজা-র সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে হতে যাওয়া এ বিনিয়োগের প্রথম পর্যায়েই খরচ হবে ১০ কোটি ডলারের বেশি।
তবে সোমবারের হামলা এও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, উপসাগরের নতুন বাণিজ্য পরিকাঠামো ঠিক কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে গত ১৪ মার্চ ফুজাইরা’র জ্বালানি অবকাঠামোতে এক ড্রোন হামলায় আগুন ধরে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে সেখানে তেল লোডের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
বেলবাব-ও এই অনিশ্চয়তার বিষয়টি স্বীকার করে নিচ্ছেন।
“কখন হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলবে, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কেমন হবে এসব বিষয়ে আমার কাছে পরিষ্কার কোনো চিত্র নেই,” বলেছেন তিনি।
সৌদি আরব ও ওমান হয়ে মালবাহী যান চলাচলের সুযোগ সৃষ্টিতে সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ এসবের বিকল্প হতে পারে বলেও মত তার।