বন্ধুর পথ পেরিয়ে যুক্তরাজ্যের নতুন ‘কুইন কনসর্ট’ ক্যামিলা

একজন সাধারণ নারী থেকে ‘কুইন কনসর্ট’ হতে ক্যামিলাকে পাড়ি দিতে হয়েছে বন্ধুর পথ। ক্যামিলা প্রকাশ্যে যতটা নিন্দিত হয়েছেন, তেমনটি খুব কম নারীরই হয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Sept 2022, 06:32 PM
Updated : 10 Sept 2022, 06:32 PM

তিনি চার্লসের জীবনের ভালোবাসা, প্রিয়জন; সেই তরুণ বয়স থেকেই দুজনের সখ্য। ১৭ বছর হল তিনি চার্লসের স্ত্রী। আর এখন চার্লস যুক্তরাজ্যের রাজা হওয়ার পর তিনি হয়েছেন ‘কুইন কনসর্ট’।

চার্লসের পাশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ক্যামিলাকে স্ত্রী হিসাবে দেখতে দেখতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু মানুষের এই মেনে নেওয়াটা মোটেই সহজ ছিল না, সেকথা নিজেই স্বীকার করেছেন ক্যামিলা।

একজন সাধারণ নারী থেকে ‘কুইন কনসর্ট’ হতে ক্যামিলাকে পাড়ি দিতে হয়েছে বন্ধুর পথ। ক্যামিলা প্রকাশ্যে যতটা নিন্দিত হয়েছেন, তেমনটি খুব কম নারীর ক্ষেত্রেই ঘটেছে।

বছরের পর বছর ধরে ক্যামিলা নিন্দিত হয়েছেন চার্লস-ডায়ানার রাজকীয় বিয়ে ভেঙে দেওয়ার জন্য, যে বিয়ের রূপকথায় বুঁদ হয়েছিল বিশ্ব। আর ডায়ানা হয়ে উঠেছিলেন ‘জনগণের হৃদয়ের রানি’।

ডায়ানার সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের ছটায় যেন অনেকটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন চার্লসও। কয়েক বছর পরেই মানুষ জানতে পারে এই রূপকথার বিয়ে সুখের নয়। ১৯৯৬ সালে ভেঙে যায় চার্লস-ডায়ানার বিয়ে।

ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় বলা হচ্ছিল, পরকীয়ার কারণেই বিচ্ছেদ। এক সাক্ষাৎকারে ডায়ানাও বলেছিলেন, ‘‘এই বিয়েতে তিন জন মানুষ ছিল।“ সেই তৃতীয় মানুষটিই হলেন, রাজা তৃতীয় চার্লসের বর্তমান স্ত্রী, ‘কুইন কনসর্ট’ ক্যামিলা।

প্রচণ্ড জনপ্রিয় প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে চার্লসের বিচ্ছেদের পর ক্যামিলা হিমশিম খেয়েছেন চার্লসের স্ত্রী হিসেবে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে। ক্যামিলাকে অনবরতই ডায়ানার সঙ্গে তার নিজের তুলনার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।

১৯৯৭ সালের ৩১ অগাস্ট প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় ডায়ানার মৃত্যুর ২৫ বছর পর আজও ক্যামিলা ব্রিটেনে এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। চার্লসের সঙ্গে ২০০৫ সালে বিয়ে হওয়ার পর তার পাশে থেকে ক্যামিলা দাতব্য অনেক কাজই করেছেন। নারী ও শিশুদের সহায়তা করেছেন।

কিন্তু অনেক মানুষই এখনও চালর্স-ক্যামিলার সেই দীর্ঘ প্রেম আর তার জেরে ডায়ানা যে কষ্ট ভোগ করেছিলেন তা ভুলে যেতে পারেনি, তাদেরকে ক্ষমাও করতে পারেনি।

চার্লসকে পাশে পাওয়ার জন্য ক্যামিলা তার নিজের বিবাহিত জীবনেও বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে সংবাদমাধ্যমগুলো অনবরত তার চরিত্র ও চেহারা নিয়ে আক্রমণ করেছে। কিন্তু ক্যামিলা সে ঝড় সামলে নিয়েছেন এবং রাজপরিবারের বর্ষীয়ান একজন নারী সদস্য হিসাবে ধীরে ধীরে তার অবস্থান পোক্ত করেছেন।

এ বাস্তবিক অর্থেই এক নারীর দীর্ঘ পথ পরিক্রমা; বলা হয়ে থাকে, যার সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্রই চার্লস প্রেমে পড়েছিলেন সেই ২০ এর দশকে। রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে বিয়ে করবেন এমন চিন্তা-ভাবনা অবশ্য ক্যামিলার ছিল না।

ক্যামিলা রোজমেরি শান্ড জন্মেছিলেন ব্রিটেনের এক অভিজাত পরিবারে ১৯৪৭ সালের ১৭ জুলাই। উচ্চবিত্ত, ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম হলেও সেখানে স্বাভাবিকভাবেই রাজকীয় বলতে কিছু ছিল না। তার বাবা ব্রুস শান্ড ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। সেই পরিবারে ক্যামিলার বেড়ে ওঠা ছিল চার্লসের থেকে আলাদা।

১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে অ্যান্ড্রু পার্কার বোলস নামের এক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে ক্যামিলার এক ধরনের ভাঙা-গড়ার সম্পর্ক চলছিল। এর মধ্যেই ১৯৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে উইন্ডসরে একটি পোলো ম্যাচে তরুণী ক্যামিলার সঙ্গে তাৎকালীন প্রিন্স চার্লসের প্রথম দেখা হয়। তখনই দুইজনের বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

কিন্তু সময়টা ঠিক ছিল না। ১৯৭১ সালে চার্লস রয়্যাল নেভিতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তাকে সে সময় বিদেশে অবস্থান করতে হয়েছিল। আর ওই সময়টাতেই ক্যামিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু পার্কার বোলস। ক্যামিলাও তা গ্রহণ করেন।

তিনি চার্লসকে জিজ্ঞাসা করার জন্য অপেক্ষা করলেন না কেন? এ প্রশ্নের জবাবে ক্যামিলার বন্ধু-বান্ধবদের ধারণা, নিজেকে রানির আসনে দেখার মতো হয়ত তিনি কখনওই কিছু ভাবেননি।

ওদিকে, চার্লস প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, এমন বোধ হয়ত করেও থাকতে পারেন। কিন্তু তারপরও একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে ছিলেন। একই সামাজিক আবহে তারা একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। ক্যামিলার স্বামী অ্যান্ড্রুর সঙ্গেও চার্লসের সদ্ভাব ছিল।

এই মেলামেশার মধ্যেই ১৯৮১ সালে চার্লস বিয়ে করেন ডায়ানাকে। কিন্তু বিয়ের পরও ক্যামিলাকে ভুলতে পারেননি চার্লস। গোপনে ক্যামিলা ও চার্লসের প্রেম নিয়ে সে সময় অনেক কানাঘুষাও হয়। পরে ডায়ানা প্রকাশ্যেই যেমন এই প্রেম নিয়ে কথা বলেছিলেন, তেমনি ১৯৯৪ সালে চার্লসও স্বীকার করেছিলেন ক্যামিলার সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা।

এ ঘটনা নিয়ে চার্লস এবং ক্যামিলা দুইজনেরই বিবাহিত জীবনের অবনতি হতে থাকে। ১৯৯৫ সালে অ্যান্ড্রু পার্কার বোলসের সঙ্গে ক্যামিলার বিচ্ছেদ হয়। এর মাত্র এক বছর পরই ডায়ানার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় চার্লসের।

১৯৯৭ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় ডায়ানার মৃত্যুর পর সমালোচনার ঝড় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার মধ্যেও চালর্স এবং ক্যামিলার একে অপরের প্রতি টান থেকেই গিয়েছিল। ধীরে ধীরে জনসমক্ষে একসঙ্গে উপস্থিত হতে শুরু করেন তারা।

১৯৯৯ সালে প্রথম রিজ হোটেল থেকে দুইজনকে একসঙ্গে চলে যেতে দেখা যায়।সেটাই প্রকাশ্যে আসার শুরু। এর ছয় বছর পর ছোট্ট একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা বিয়ে করেন।

বিবিসি লিখেছে, ক্যামিলাকে মেনে নিতে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অনেক সময় লেগেছিল। কিন্তু রানি তার শেষ সময়গুলোতে দ্ব্যর্থহীনভাবেই ক্যামিলার সমর্থনে কথা বলতেন। তবে ক্যামিলাকে ‘রানি’ উপাধি দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক ছিল।

স্বামী চার্লস রাজা হলে ক্যামিলার আপনা থেকেই রানি হওয়ার কথা। কিন্তু ক্ল্যারেন্স হাউজ থেকে ২০০৫ সালের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ক্যামিলা রানি নয় বরং ‘প্রিন্সেস কনসর্ট’ হিসাবে পরিচিত হবেন। কারণ, সে সময় রাজপরিবারের কেউ কেউ মনে করতেন, জনগণ হয়ত ক্যামিলার রানি উপাধি এখনও মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়, যে উপাধি আদতে পাওয়ার কথা ছিল ডায়ানার।

কিন্তু বছরের পর বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্যামিলার প্রতি রাজপরিবার-সহ আমজনতার মনোভাব নরম হয়েছে। ২০১৫ সালে সিএনএন পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি চার জনে একজন ব্রিটিশ ক্যামিলাকে আগের চেয়ে বেশি পছন্দ করছেন এবং তার রানি উপাধি পাওয়া নিয়ে বিরোধিতা করা মানুষের সংখ্যাও কমেছে।

তবে ক্যামিলাকে ‘রানি’ উপাধি দেওয়া নিয়ে বিতর্কটি পরে সমাধা করেছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এ বছরের শুরুর দিকে রানি বলেছিলেন, তিনি চান ছেলে চার্লস রাজা হলে ‘কুইন কনসর্ট’ হিসেবেই পরিচিত হোন ডাচেস অব কর্নওয়াল ক্যামিলা।

রানির ওই এক কথাতেই পরে বিষয়টি নিয়ে সব বিতর্কের অবসান হয়। গত বৃহস্পতিবার রানির মৃত্যুতে তার বড় ছেলে চার্লস রাজা হওয়ার পর ক্যামিলা এখন সে উপাধিই পেয়েছেন। যদিও প্রয়াত রানির মতো সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী তিনি হবেন না।

ক্যামিলা-চার্লসের বিয়ে ১৭ বছরে গড়িয়েছে। মানুষের সঙ্গে তাদের সংশ্রবও বেড়েছে। চার্লসের পাশে আস্থা ও সমর্থনের স্তম্ভ হয়ে আছেন ক্যামিলা।

২০১৫ সালে নিজেদের দশম বিবাহবার্ষিকীতে ক্যামিলা সম্পর্কে চার্লস বলেছিলেন, “এমন কাউকে পাওয়া সবসময়ই চমৎকার, যাকে পেয়ে আপনার মনে হবে সে আপনাকে বুঝতে পারছে এবং উৎসাহ দিতে চাইছে।”

ক্যামিলা ‍দৃঢ়ভাবে পাশে আছেন, এ বিশ্বাস নিয়েই রাজ দায়িত্ব শুরু করতে যাচ্ছেন চার্লস।

রাজার ভূমিকা পালন করতে হয় এককভাবে। আর ক্যামিলাকে ছাড়ার ইচ্ছা চার্লসের নেই। এর কারণ সম্ভবত এটাই যে, চার্লস জানেন এই ক্যামিলাই একমাত্র মানুষ যিনি তাকে সেই সঙ্গ দিতে পারবেন, যা রাজার ভূমিকা পালনে তার জন্য দরকার পড়বে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক