Published : 26 Dec 2025, 04:00 PM
মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির দ্বিতীয় আরেক মামলায় কারবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।
শুক্রবার কুয়ালালামপুর হাইকোর্টের বিচারক কলিন লরেন্স সেকুয়েরাহ এই রায় ঘোষণা করেন। ৭২ বছর বয়সী নাজিব রাজাক বর্তমানে ওয়ানএমডিবি-র একটি শাখা (এসআরসি ইন্টারন্যাশনাল) থেকে অর্থ আত্মসাতের দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
নতুন এই রায়ে তিনি ওয়ানএমডিবি তহবিল থেকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (৫৩৯ মিলিয়ন ডলার) স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহারের চারটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের আরও ২১ টি অভিযোগ আছে। সব অভিযোগের পূর্ণ রায় এবং সাজা ঘোষণা হওয়া এখনও বাকি। প্রতিটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হলে নাজিব রাজাকের আরও ১৫ থেকে ২০ বছরের জেল হতে পারে।
আদালতে কৌসুলিরা যুক্তি দিয়ে বলেছেন, এক দশকেরও বেশি সময় আগে নাজিব একজন প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং বিনিয়োগ তহবিল ওয়ানএমডিবির উপদেষ্টা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরিয়েছেন।
এই কেলেঙ্কারি প্রথম সামনে এসেছিল ২০১৫ সালে। ২০২০ সালে ওয়ানএমডিবি তহবিল থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অপব্যবহারের অভিযোগের প্রথম মামলায় নাজিবের ১২ বছরের কারাদণ্ড হয়। পরে তা ৬ বছরে নামিয়ে আনা হয় এবং এখন তিনি এ সাজা ভোগ করছেন।
গত বছর ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি ভুলপথে পরিচালনার জন্য নাজিব ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মামলার বিচারের সময় তিনি দাবি করেছিলেন, পলাতক মালয়েশিয়ান অর্থলগ্নিকারী ও ব্যবসায়ী ঝো লো তাকে বিপথগামী করেছিলেন।
ঝো লো-কে গ্রেপ্তারে ২০১৬ সালে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করে। শুক্রবার আদালতে রায় পড়ার সময় বিচারক সেকুয়েরাহ বলেন,প্রমাণে দেখা গেছে, নাজিবের সঙ্গে ঝো লো’র ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল’। ঝো লো প্রধানমন্ত্রীর ‘প্রক্সি ও মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে কাজ করেছিলেন।
বিচারক আরও বলেন, “এটি বিবেচনায় নিতে হবে যে ওয়ানএমডিবি-র প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের হোতা ছিলেন নাজিব। তার অধীনস্থ কর্মকর্তারা ঝো লো-র সঙ্গে মিলে আসীন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবেন, এমন বিশ্বাস পোষণ করা আসলে ‘নিখাদ কল্পনাপ্রসূত’ গল্পের সমতুল্য।”
আদালত আরও জানায়, নাজিবের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া অর্থ সৌদি রাজপরিবারের ‘দান’ ছিল বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য। তখনকার প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে নাজিবের কাছে এই অর্থের উৎস যাচাই করার সব পথ খোলা ছিল।
সরকারের স্থিতিশীলতায় টানাপোড়েন:
নতুন এই রায় মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে। নাজিবের দল ইউএমএনও বর্তমানে আনোয়ারের সরকারের অন্যতম বড় অংশীদার।
চলতি সপ্তাহেই নাজিবের গৃহবন্দি থাকার আবেদন আদালত নাকচ করে দেওয়ায় ইউএমএনও-র অভ্যন্তরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। দলটির যুবনেতা আকমল সালেহ এমনকি জোট ভেঙে ‘সম্মানজনক বিরোধী দল’ হওয়ারও ডাক দিয়েছিলেন।
আজকের এই রায়ে নাজিবের কারাদণ্ডের মেয়াদ আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সেই রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
কী এই ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি?
২০০৯ সালে নাজিব রাজাক ক্ষমতায় আসার পর দেশের উন্নয়নের জন্য ওয়ানএমডিবি তহবিল গঠন করেন। কিন্তু তদন্তকারীদের মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ওই তহবিল থেকে অন্তত ৪৫০ কোটি ডলার আত্মসাৎ করা হয়।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়, যার বড় একটি অংশ নাজিবের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল।
২০২২ সালের অগাস্ট থেকে নাজিব রাজাক কারাগারে রয়েছেন। নতুন এই অভিযোগগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে ১৫ থেকে ২০ বছরের জেলসহ বিপুল অর্থদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।