১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘সে ছিল আমাদের পৃথিবী’, ছেলের মৃত্যুশোকে বাবা-মায়ের আত্মাহুতি

ভারতের ছত্তিশগড়ে ঘটেছে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। একমাত্র ছেলেকে দুর্ঘটনায় হারানোর পর গত একবছরে এই দম্পতি নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন। লোকজনের সঙ্গে মিশতেন না, হাসতেনও না খুব একটা।

‘সে ছিল আমাদের পৃথিবী’, ছেলের মৃত্যুশোকে বাবা-মায়ের আত্মাহুতি
এই দম্পতির একমাত্র ছেলে ২০২৪ সালে দুর্ঘটনায় মারা যান। ছবি: এনডিটিভি

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Feb 2026, 05:30 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:58 PM

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের একটি গ্রাম এক শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেছে, যা কোনোদিন ভুলতে পারবে না সেখানকার বাসিন্দারা। 

সোমবার রাজ্যের জানজগির-চম্পা জেলার ধরদেই গ্রামে নিজের বাড়ির উঠোনে একটি নিম গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে কৃষ্ণ প্যাটেল ও তার স্ত্রী রমা বাইয়ের নিথর দেহ।

দুর্ঘটনায় একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে যে পাথরসমান শোক তারা বয়ে বেড়াচ্ছিলেন, তার সমাপ্তি ঘটেছে একই শাড়ির আঁচলে বাঁধা দুই প্রাণের আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে। 

মৃত্যুর আগে চার পৃষ্ঠার একটি সুইসাইড নোট এবং একটি ভিডিও বার্তা রেখে গেছেন এই দম্পতি, যা কাঁদিয়েছে পুরো গ্রামকে।

কৃষ্ণ প্যাটেল (৪৮) পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন এবং রামা বাই (৪৭) ছিলেন গৃহিণী। ২০২৪ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের একমাত্র সন্তান ২১ বছর বয়সী আদিত্য প্যাটেল মারা যান।

সুইসাইড নোটে কৃষ্ণ লিখেছেন, আদিত্য ছিল তাদের ‘অস্তিত্বের ভিত্তি, তাদের পুরো পৃথিবী’। তিনি তাকে ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ’ হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছেন, আদিত্য শুধু একজন বাধ্য ছেলেই ছিল না, ছিল বন্ধুর মতো।

আদিত্যর মৃত্যুর দিনটির কথা স্মরণ করে নোটে কৃষ্ণ লিখেছেন, সেদিন স্থানীয় মন্দিরে পুজোর জন্য পুরোহিতের একজন সহকারীর প্রয়োজন ছিল। তিনি স্ত্রী রমাকে জানিয়েছিলেন সেই কথা। ইশ্বরের কাজ। রমা দ্বিধা করেননি। 

আদিত্যর যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। তিনিই ছেলেকে একরকম জোর করে পাঠান। পথে একটি ট্রাক পিষে দেয় আদিত্যকে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। 

সুইসাইড নোটে ছেলেকে পাঠানোর সেই সিদ্ধান্তকে ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন কৃষ্ণ। তিনি লিখেছেন, “আদিত্য আমাকে চিরতরে ছেড়ে চলে গেছে। আমরা বেঁচে ছিলাম ঠিকই, কিন্তু জীবন ছিল না।”

আত্মহত্যার আগে এই দম্পতি একটি ভিডিও রেকর্ড করেন। সেখানে তারা তাদের আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত শান্তভাবে বলেন, আদিত্যর দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ বাবদ যে অর্থ পাওয়া গেছে, তা যেন তাদের বড় ভাইদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

রাহুদ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সত্যম চৌহান জানান, গত রোববার গভীর রাতে তারা এই চরম পথ বেছে নেন। সুইসাইড নোটে তারা স্পষ্ট লিখেছেন যে, একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোক সইতে না পেরেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, গত একবছর ধরে এই দম্পতি নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন। লোকজনের সঙ্গে মিশতেন না। হাসতেন না, কথাও বলতেন না খুব একটা। যেটুকু বলতেন, তার সবটা জুড়ে থাকত শুধু ছেলে।

আত্মহত্যার আগে ধারণ করা ভিডিওতে তারা বলেছেন, ‘দীর্ঘ কষ্টের পরে এখন আমাদের মন শান্ত। এ বার ইশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পালা।’

সুইসাইড নোটে কৃষ্ণ ও রমা বাই লিখেছেন, তারা সজ্ঞানে এবং স্বেচ্ছায় নিজেদের ‘ভগবান শিবের চরণে অর্পণ’ করছেন। এর জন্য কেউ দায়ী নয়। 

গ্রামবাসীর উদ্দেশে তারা লিখেছেন, “আমাদের জন্য শোক করবেন না। আমাদের হাসি মুখে বিদায় দিন। আমরা পূর্ণ শান্তিতে এবং হাসিখুশি মনে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি।”

সোমবার সকালে প্রতিবেশীরা পুলিশকে খবর দিলে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। পুলিশ এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে।