Published : 29 Jun 2026, 02:24 PM
আর্জেন্টিনায় ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি তাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ। দিয়েগো মারাদোনা এবং লিওনেল মেসির দেশটিতে ফুটবল আক্ষরিক অর্থেই আবেগ ও ভক্তির প্রতীক। কিন্তু এই ফুটবল-পাগল দেশেরই ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস ফুটবল ‘পছন্দ করতেন না’।
শুধু ‘পছন্দ করতেন না’ বললে ভুল হবে, তিনি স্রেফ মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন, “ফুটবল খেলাটা এতো জনপ্রিয়, কারণ পৃথিবীতে বোকামি জিনিসটাও দারুণ জনপ্রিয়!”
হোর্হে লুইস বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী আর্জেন্টাইন কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও কবি। বুয়েনস আইরেসে জন্ম নিলেও শৈশবের বড় সময় কেটেছে জেনেভায়। ছোটগল্পে পরাবাস্তবতা ও গোলকধাঁধার মতো ধারণার চমৎকার ব্যবহারে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তার বিখ্যাত সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ‘ফিসিওনেস’ ও ‘এল আলেফ’। জীবনের মাঝপথে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও মায়ের সহায়তায় লেখালেখি চালিয়ে যান তিনি।
এমন একজন লেখক কেন নিজের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটিকে এতটা ‘অপছন্দ’ করতে পারেন, তা ভাবলে অবাক লাগতেই পারে। কিন্তু বোর্হেসের এই আপত্তির পেছনে কিছু কারণ ছিল। তিনি কেবল বিনোদনের জন্য ফুটবল খেলা দেখাকে অপছন্দ করতেন না, তার ভয় ছিল ফুটবলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ‘অন্ধ রাজনীতি’ আর মানুষের ভেতরের ‘অন্ধ উন্মাদনা’ নিয়ে।
বোর্হেসের আপত্তির মূল জায়গাটা মাঠের ভেতরের খেলার চেয়ে বেশি ছিল মাঠের বাইরের দর্শক সংস্কৃতি নিয়ে। গ্যালারিতে যখন হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে, কোনো যুক্তি ছাড়া একটা দলের সমর্থনে মেতে ওঠে, বোর্হেস তার মধ্যে স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি দেখতেন।
তিনি নিজের চোখে আর্জেন্টিনায় স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ও পতন দেখেছিলেন। তিনি খেয়াল করেছিলেন, একজন স্বৈরাচারী শাসক যখন ভাষণ দেয়, তখন যেভাবে জনতা অন্ধের মতো স্লোগান তোলে, ফুটবলের মাঠেও ঠিক একই রকম উন্মাদনা তৈরি হয়। বোর্হেসের ভাষায়, “জাতীয়তাবাদ শুধু অন্ধ সমর্থনই চেনে। আর যে মতবাদ মানুষের মন থেকে সন্দেহ বা প্রশ্ন করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, সেটাই আসলে এক ধরনের ধর্মান্ধতা আর বোকামি।”
শাসকগোষ্ঠী কীভাবে ফুটবলকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের চোখ বেঁধে রাখে, তার একটা উদাহরণ ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ। সেসময় দেশটিতে চলছিল সামরিক সরকারের নৃশংস শাসন, গোপনে গুম হচ্ছিলেন হাজারো মানুষ। অথচ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঢাল বানিয়ে সেই স্বৈরাচারী সরকার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ‘অপরাধ আড়াল’ করার চেষ্টা করছিল। এই নোংরা রাজনীতি বোর্হেসকে ব্যথিত করেছিল।
ফুটবলের প্রতি নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করতে বোর্হেস একবার এক অভিনব কাণ্ড ঘটান। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের ঠিক সেই নির্দিষ্ট সময়েই তিনি বুয়েনস আইরেসে একটি বক্তৃতার আয়োজন করেন। যখন পুরো দেশ টেলিভিশনের পর্দায় বুঁদ হয়ে ফুটবলারদের পেছনে ছুটছে, বোর্হেস তখন হলের গুটিকয়েক শ্রোতার সামনে কথা বলছিলেন ‘অমরত্ব’ এবং ‘মানুষের অস্তিত্ব’ নিয়ে।
আসলে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, “২২ জন মানুষের একটা বলের পেছনে ছোটার চেয়ে মানুষের জীবনের দর্শন এবং জীবনের মূল্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
বন্ধু আদোলফো বিওই কাসারেসের সঙ্গে মিলে বোর্হেস একটি গল্প লিখেছিলেন। শিরোনাম ‘এসে এস্ত পেরচিপি’, যার ল্যাটিন অর্থ ‘যা দৃশ্যমান, তা-ই সত্য’। গল্পে দেখা যায়, আর্জেন্টিনায় আসলে ফুটবল খেলা বহু বছর আগেই (১৯৩৭ সালে) বন্ধ হয়ে গেছে! মাঠগুলো সব ভেঙেচুরে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ ভাবছে খেলা এখনো চলছে। আসলে একটা বদ্ধ স্টুডিওর ভেতরে ধারাভাষ্যকার আর কিছু অভিনেতা জার্সি পরে ক্যামেরার সামনে খেলার নাটক করছে, আর সেই ভুয়া সম্প্রচার দেখেই কোটি কোটি দর্শক টিভির সামনে বসে কাঁদছে-হাসছে, উন্মাদনায় ভাসছে।
এই গল্পের মাধ্যমে বোর্হেস ক্ষমতা ও আনুগত্যশীল গণমাধ্যমের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে চেয়েছিলেন। কীভাবে একটা অবাস্তব বিষয়কে পুঁজি করে পুরো সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ফুটবল যেন তারই এক মোক্ষম হাতিয়ার।
বোর্হেস মনে করতেন, “মানুষ সবসময় নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব ভুলে বড় কোনো কিছুর অংশ হতে চায়। কেউ ধর্মে আশ্রয় খোঁজে, কেউ রাজনীতিতে, আর কেউ ফুটবলে। কিন্তু এই ‘বড় কিছুর’ অংশ হতে গিয়ে মানুষ নিজের স্বাধীন চিন্তাভাবনা হারিয়ে ফেলে। গ্যালারির ভিড়ে মিশে গিয়ে মানুষ যখন স্লোগান দেয়, তখন সে আর নিজে ব্যক্তি থাকে না, সে হয়ে যায় এক বিশাল ও অন্ধ পালের অংশ।” এই নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলাটাকেই ভয় পেতেন এই লেখক।
অনেকেই বোর্হেসের এই মনোভাবকে ‘পণ্ডিতদের অহংকার’ বলে মনে করতে পারেন। কারণ, দিনশেষে ফুটবল শুধু রাজনীতি নয়; এটি সাধারণ মানুষের বিনোদন, মাঠের সেই নিখুঁত পাস বা অবিশ্বাস্য ড্রিবলিংয়ে এক আনন্দ আছে।
তবে খেলাটির বাণিজ্যিকীকরণ, উগ্রতা আর একে ঘিরে ভূ-রাজনীতি দেখলে আজকেও মনে হতে পারে, বোর্হেস পুরোপুরি ভুল ছিলেন না। মাঠের ফুটবলকে ভালোবাসলেও, গ্যালারির উন্মাদনা নিয়ে বোর্হেসের এই সাবধানবাণী আজও আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
সূত্র: দ্য নিউ রিপাবলিক