Published : 14 Mar 2026, 08:30 PM
পারস্য উপসাগরজুড়ে বাণিজ্যিক, বন্দর ও অফশোর জাহাজগুলিতে প্রায় ২৩ হাজারের মতো ভারতীয় কর্মরত, তাদের মধ্যে অনেকেই ইরানের বন্দর ও উপকূলে বিভিন্ন জাহাজে দুই সপ্তাহ ধরে আটকা পড়ে আছেন। তারা সবাই যে কোনোভাবে বাড়ি ফিরতে চান।
এদেরই একজন ইরানের বন্দর আব্বাসে জাহাজে আটকা পড়া ২৬ বছর বয়সী নাবিক অম্বুজ। বন্দরটির অদূরেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিভিন্ন জাহাজে আগুন জ্বলছে। অম্বুজ জানান, তিনি ছয় মাস ধরে বাড়ির বাইরে আছেন আর পরিবারের সদস্যদের মিলিত হওয়ার জন্য তিনি অধীর হয়ে আছেন।
শত শত ট্যাংকার ও মালবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। এখানে ইরানি হামলায় তিন ভারতীয় ক্রু সদস্য নিহত হয়েছে ও অপর একজন নিখোঁজ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির মধ্যে ও আশপাশে আটকা পড়া ভারতীয় নাবিকদের দুর্দশা এখন দেশটির জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়া দিল্লি বলছে, আটকা পড়া নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারা ইরানসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছে।
অম্বুজ তার জাহাজ থেকে ফোনে রয়টার্সকে বলেন, “অনুমতি ছাড়া বা নৌবাহিনীর পাহারা ছাড়া যাত্রা শুরু করা কতোটা বিপজ্জনক হতে পারে তা আমরা জানি।”
তিনি তার জাহাজে আরও ১৫ ক্রু সদস্যের সঙ্গে আটকা পড়ে আছেন। তাদের আশপাশে এ রকম আরও ৫০টির বেশি জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
অম্বুজ বলেন, “আমি যে কোম্পানিতে কাজ করি তারা আমাদের দায়িত্ব থেকে দায়িত্ব থেকে ছেড়ে দিয়েছে। এখন আমরা নিরাপদ রাস্তার অপেক্ষায় আছি। কারণ তেহরান থেকে ফ্লাইট চলাচল করছে না।
“আমরা যদি মধ্যপ্রাচ্য বা কাছাকাছি কোথাও যাওয়ার অনুমতি পাই, আমরা সেখানেই নোঙর করবো আর সবচেয়ে আগে যে ফ্লাইট পাবো সেটিতে করে বাড়ি ফিরবো।”
অম্বুজ জানান, মার্চের প্রথমদিকে তাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কাছ থেকে একটি সতর্ক বার্তা পান। তাতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করলে পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। এতে তাদের জাহাজের ক্রুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
প্রথমদিকে ক্রুরা এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাওয়ার জন্য অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু তা আর আসেনি। এখন তাদের আশঙ্কা, তাদের আরও অনেক দিন বা আরও কয়েক সপ্তাহ আটকা পড়ে থাকতে হতে পারে।
ভারতগামী একটি জাহাজে থাকা নাবিক এম. কান্ত জানান, ক্রুরা তাদের জাহাজের উপর দিয়ে যাওয়া ড্রোন ও যুদ্ধবিমান চিহ্নিত করে আর তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। বিশেষভাবে মার্চের প্রথমদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ যখন তাদের স্টারলিঙ্ক ইন্টারনেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দেয় তারপর তারা বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।
কান্ত বলেন, “সাইরেন বেজে উঠছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, কিছুটা দূরে আরেকটা জাহাজ আগুনে জ্বলছে আর ওয়্যারলেসে আমরা সতর্ক বার্তা পাচ্ছি।
“মার্চের ৬ তারিখের পর আমরা স্টারলিঙ্ক আবার চালু করার অনুমতি পাই। আমরা আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই আর যাচাই করা খবর পেতে থাকি। যখনই আমরা কোনো ড্রোন বা যুদ্ধবিমান দেখতাম বা শব্দ শুনতে পেতাম আমাদের বুক হিম হয়ে যেতো।”
কান্ত জানান, তাদের কোম্পানি, ভারত ও ইরানের কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের জাহাজের বিস্তারিত তথ্য বা অবস্থান শেয়ার করতে না করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন ক্রু সদস্য জানিয়েছেন, বিটুমিনবাহী তাদের জাহাজ হরমুজ প্রণালি থেকে কয়েক নটিক্যাল মাইল দূরে থাকা অবস্থায় তিনি দেখতে পান আরেকটি জাহাজে ড্রোন আঘাত হানছে।
তিনি বলেন, “ইদানিং আমাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, জাহাজ থেকে দেখা বিমান, যুদ্ধবিমান ও ড্রোন শনাক্ত করা। ঘুমানো কঠিন। প্রচুর উদ্বেগ কাজ করছে।”
বিশ্বব্যাপী নাবিক সরবরাহের তালিকায় ভারতের অবস্থান তৃতীয়। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন জাহাজ বহরে ভারতের তিন লাখেরও বেশি নাবিক কাজ করছে।
শুক্রবার ইরান ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি তরল পেট্রলিয়াম গ্যাসবহনকারী ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেয়। ভারতে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতালি ভারতীয় জাহাজকে নিরাপদে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
আরও পড়ুন:
ইরানের পাল্টা আক্রমণ চলছেই, দুবাইয়ে বিস্ফোরণ, বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে হামলা
ইরানের খার্ক দ্বীপে বোমা ফেলল যুক্তরাষ্ট্র, তেল স্থাপনায় হামলার হুমকি