Published : 15 Mar 2026, 03:20 PM
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনাধর্মী প্রতিবেদনের ফলে সম্প্রচার নিবন্ধন বাতিল হতে পারে বলে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
গণমাধ্যম যুদ্ধ নিয়ে ‘বিকৃত তথ্য’ ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে তারা।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের চেয়ারম্যান বেন্ডান কার বলেছেন, সম্প্রচারকারীদের অবশ্যই ‘জনস্বার্থে কাজ করতে হবে’, নাহলে লাইসেন্স হারাতে হবে।
“সম্প্রচারকারী যে প্রতিষ্ঠানগুলো ভুয়া ও বিকৃত খবর প্রচার করছে, যা ফেইক নিউজ নামেও সুপরিচিত, তারা লাইসেন্স পুনর্নবায়নের আগেই সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে,” পোস্টে কার এভাবেই ‘প্রচ্ছন্ন হুমকি’ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
ট্রাম্পের এই ফেডারেল কমিউনিকেশনস চেয়ারম্যান আগেও একাধিকবার প্রেসিডেন্টের নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে খবর ও অনুষ্ঠান প্রচারে গণমাধ্যমকে চাপ দিয়েছেন।
গত বছর কৌতুকাভিনেতা জিমি কিমেল তার লেট নাইট শো-তে প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করার পর কার সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি ও এর পরিবেশকদের একহাত নিয়েছিলেন। এবিসি পরে জিমি কিমেলের অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে।
কিন্তু কারের এবারের মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গন এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা অনেকের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। ইরান যুদ্ধের খবর নিয়ে কারের এবারের অবস্থানকে ‘সেন্সরশিপও’ বলছেন অনেকে।
“এটা সুস্পষ্ট নির্দেশনা, যেখানে বলা হচ্ছে যুদ্ধ নিয়ে ইতিবাচক খবর করো, নাহলে তোমার লাইসেন্স পুনরায় নবায়ন হবে না। এটা কৌতুকাভিনেতার ঘটনার চেয়েও বাজে, অনেক বাজে। এর গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি শেষ রাতের অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলছেন না, বলছেন যুদ্ধ কীভাবে কভার করতে হবে তা নিয়ে,” বলেছেন হাওয়াইয়ের সেনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ।
ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিভিজ্যুয়াল রাইটস অ্যান্ড এক্সপ্রেশনের (ফায়ার) পাবলিক অ্যাডভোকেসির পরিচালক অ্যারন টেরও যুদ্ধ নিয়ে নেতিবাচক খবরকে চেপে রাখতে চাওয়া কারের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন।
“যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সরকারকে তার চালানো যুদ্ধের তথ্য সেন্সর করার অনুমতি দেয় না,” বলেছেন টের।
যুদ্ধ নিয়ে খবরে ক্ষিপ্ত ট্রাম্পও
কারের সর্বশেষ এ মন্তব্যটি এসেছে ট্রাম্পের এক সোশাল মিডিয়া পোস্টের প্রতিক্রিয়ায়, যেখানে প্রেসিডেন্ট সৌদি আরবে ইরানের হামলায় মার্কিন রিফুয়েলিং বিমানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ‘ফেইক নিউজ মিডিয়ার’ করা খবরের সমালোচনা করেছেন।
“ঘাঁটিটি কয়েকদিন আগে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তবে বিমানগুলো ‘আঘাতের শিকার’ বা ‘ধ্বংস’ হয়নি। ৫টির মধ্যে ৪টির কার্যত কোনো ক্ষতিই হয়নি এবং সেগুলো ফের কাজে ফিরেছে,” ট্রুথ সোশালে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন ট্রাম্প।
এ সংক্রান্ত খবরে ইচ্ছাকৃতভাবেই বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে অভিযোগ করে মার্কিন এ প্রেসিডেন্ট বলেন, “অধম ‘খবরের কাগজ’ ও গণমাধ্যম চায় যেন আমরা যুদ্ধে হেরে যাই।”
ভিন্নমত ও সমালোচনাধর্মী খবর প্রচারে বাধা দিতে প্রেসিডেন্ট ও তার মিত্ররা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন বলে যে অভিযোগ রয়েছে তা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে তা যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ব্যাপক অজনপ্রিয় তা জনমত জরিপগুলোতেই দেখা যাচ্ছে।
সর্বশেষ কুইনিপিয়েকের জরিপ বলছে, ৫৩ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে। এ অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের ৮৯ শতাংশ এবং দলনিরপেক্ষ ৬০ শতাংশের।
আইন বিশেষজ্ঞরাও যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনও বলছেন; আন্তর্জাতিক আইনে বিনা উসকানিতে হামলা নিষেধ করা হয়েছে।
যুদ্ধ কেন শুরু করতে হল, কেন ইরান মার্কিন নিরাপত্তার জন্য ‘আসন্ন হুমকি’ হয়ে উঠল—তা নিয়েও ট্রাম্প একেকবার একেক যুক্তি দিচ্ছেন।
তিনি এও বলছেন, যুদ্ধ সফলভাবে এগিয়ে চলছে; যদিও ইরান এখনও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন বাহিনীর ওপর লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।
“আমরা জিতেছি। আমি আপনাদের বলছি, আমরা জিতেছি। প্রথম ঘণ্টাতেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে,” কেন্টাকিতে এক সমাবেশে কয়েকদিন আগেই এ কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
অন্যদিকে তার প্রশাসন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে জনমত যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ আনছে।
“গণমাধ্যমের কিছু কিছু লোকজন এখনও থামতে পারছে না,” শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে এমনটাই বলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
ফক্স নিউজের সাবেক হোস্ট হেগসেথ ‘দেশপ্রেমিক’ প্রতিবেদকদের আরও ইতিবাচক শিরোনাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি টিভি ব্যানারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিরও সমালোচনা করেন। উদাহরণ হিসেবে টানেন ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ তীব্র হচ্ছে’ ব্যানারকে।
“এর বদলে ব্যানারে কী থাকা উচিত? ‘ইরান ক্রমশ ব্যাকুল হয়ে উঠছে’ এটা হলে কেমন হয়? কারণ তারা সেটাই হচ্ছে। তারা জানে, আপনারাও জাননে, স্বীকার করলেই হয়,” বলেন হেগসেথ।
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনাকে ট্রাম্প প্রশাসন খাটো করে দেখেছিল—এ ধরনের এক প্রতিবেদন করায় সংবাদমাধ্যম সিএনএনেরও সমালোচনা করেন মার্কিন এ যুদ্ধমন্ত্রী।
সিএনএন শিগগিরই ডেভিড এলিসনের নিয়ন্ত্রণে গেলে ভালো হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ডেভিড ট্রাম্পের মিত্র ও প্রযুক্তি কোম্পানির নির্বাহী ল্যারি এলিসনের ছেলে।
“যত দ্রুত ডেভিড এলিসন নেটওয়ার্কটির (সিএনএন) নিয়ন্ত্রণ নেবে, ততই ভালো,” বলেছেন তিনি।