Published : 03 Nov 2025, 01:12 AM
দ্রুত ওজন কমানোর একটি পিল। নাম মলিকিউল। এবছরের শুরুর দিকে ভাইরাল হয় রাশিয়ার টিকটকে।
তরুণ-তরুণীদের ফিড ভরে যেতে শুরু করে এমন সব ক্যাপশনে: 'মলিকিউল খাও আর খাবারের কথা ভুলে যাও। 'ক্লাসের পেছনে বড় আকারের কাপড় পরে বসে থাকতে চাও?'
নিউজফিডের ক্লিপগুলোতে দেখা গেছে, ফ্রিজ ভর্তি নীল বাক্স, যাতে ছিল হলোগ্রাম আর 'মলিকিউল প্লাস' এর লেবেল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা তাদের ওজন কমানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করার পর মলিকিউলের বিক্রি বেড়ে যায়। আর তাতেই ফাঁদে পড়ে যায় তরুণ বয়সীরা।
২২ বছর বয়সী মারিয়া জনপ্রিয় এক অনলাইন খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে ওষুধটি কিনেছিলেন। দিনে দু’টি করে পিল খেতেন। দুই সপ্তাহ পর দেখেন, তার মুখ শুকিয়ে গেছে এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে ক্ষুধা হারিয়ে ফেলেছেন।
তিনি বলেন, “আমার খাওয়ার ইচ্ছা একেবারেই আর ছিল না। এমনকি পানীয়ও না। আমি নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। সারাক্ষণ ঠোঁট কামড়াতাম আর গাল চিবোতাম।”
মারিয়া মারাত্মক উদ্বেগে ভুগতে শুরু করেন এবং নেতিবাচক চিন্তায হতে থাকে তার। মারিয়ার কথায় “এই বড়িগুলো আমার মানসিক অবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলছিল।”
সেন্ট পিটার্সবার্গে বাস করা মারিয়া বলেন, তিনি এমন গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
অন্য টিকটক ব্যবহারকারীরাও চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়া, কাঁপুনি ও অনিদ্রার মতো উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। কমপক্ষে তিনজন স্কুল শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
গত এপ্রিলে সাইবেরিয়ার চিতা শহরের এক স্কুলছাত্রী অতিমাত্রায় মলিকিউল সেবন করায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ওই ছাত্রী গ্রীষ্মের আগেই দ্রুত ওজন কমাতে চেয়েছিলেন।
আরেক স্কুলছাত্রীর মা গণমাধ্যমকে জানান, তার মেয়ে একসঙ্গে কয়েকটি বড়ি খাওয়ার পর হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করতে হয়েছিল।
গত মে মাসে সেন্ট পিটার্সবার্গের ১৩ বছর বয়সী এক ছেলেকেও প্যানিক অ্যাটাক এবং বিভ্রমের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। স্কুলে ওজন নিয়ে ঠাট্টার শিকার হওয়ায় ছেলেটি তার এক বন্ধুকে অনলাইন থেকে এ বড়ি কিনে দিতে বলেছিল।
মলিকিউলের বাক্সে ‘প্রাকৃতিক উপাদান’ হিসেবে লেখা থাকে সিংহদন্ত মূল (ড্যান্ডেলিয়ন রুট) ও মৌরিদানার (ফেনেল সিড) নির্যাস।
তবে চলতি বছর শুরুর দিকে রুশ পত্রিকা ইজভেস্তিয়ার সাংবাদিকরা অনলাইনে কেনা বড়িগুলো পরীক্ষার জন্য পাঠালে তাতে স্থূলতার ওষুধ সিবুট্রামিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
সিবুট্রামিন ১৯৮০’র দশকে বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহার হত। পরে ক্ষুধা নিবারক ওষুধ হিসেবে এটি বাজারে আসে। গবেষণায় দেখা যায়, এই ওষুধ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। আর ওজন কিছুটা কমায়।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সিবুট্রামিন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীনসহ অনেক দেশেই এটি অবৈধ।
রাশিয়ায় এখনও স্থূলতার চিকিৎসায় এ ওষুধ ব্যবহার হয়। তবে কেবল চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে প্রাপ্তবয়স্করা সিবুট্রামিন পেতে পারেন। অন্যথায় সেখানে সিবুট্রামিন কেনাবেচা অপরাধ হিসাবেই গণ্য।
তারপরও অসংখ্য মানুষ ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে কোনও প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ব্যাপকভাবে এ ওষুধ কেনাবেচা করছে।
২০ দিন সেবনের জন্য মলিকিউল কিনতে চাইলে দাম পড়ে ছয়-সাত পাউন্ড (আট-নয় ডলার)। এটি রাশিয়ার বাজারে ওজন কমানোর স্বীকৃত ইনজেকশন ওজেম্পিকের তুলনায় অনেক সস্তা। এক মাসের ওজেম্পিক ইনজেকশনের দাম ৪০ থেকে ১৬০ পাউন্ড (৫০ থেকে ২১০ ডলার)।
সেন্ট পিটার্সবার্গের হরমোন বিশেষজ্ঞ জেনিয়া সলোভিয়েভা বলেন, “চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া নিজে নিজে এই ওষুধ সেবন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, এভাবে ওষুধ সেবনে এর ডোজ বেশি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।”
রাশিয়ানরা প্রতিনিয়িতই মলিকিউল কেনা কিংবা বেচার কারণে জেলের সাজা ভোগ করে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের জন্য এই ওষুধের অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত এপ্রিলে সরকার-সমর্থিত ‘সেফ ইন্টারনেট লিগ’ তরুণদের মধ্যে মলিকিউল গ্রহণের প্রবণতা বাড়তে থাকা নিয়ে সতর্কবার্তা দিলে কয়েকটি বড় অনলাইন মার্কেটপ্লেস বড়িটি সরিয়ে ফেলে।
কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই আবার নতুন নামে এই বড়ি বাজারে আনা হয়। নাম দেওয়া হয় অ্যাটম। এই বড়ির বাক্সও দেখতে অনেকটা মলিকিউলের মতোই।
সম্প্রতি একটি আইন পাস হয়েছে যার বদৌলতে কর্তৃপক্ষ অনিবন্ধিত ‘ডায়েটারি সপ্লিমেন্ট’ ওয়েবসাইটে বিক্রি বন্ধ করতে পারে। কিন্তু এই আইন এড়াতে বিক্রেতারা ‘ক্রীড়া পুষ্টির’ নামে একই জিনিস বিক্রি করছে।