Published : 27 May 2026, 11:50 PM
বৃহস্পতিবারেই ঈদুল আজহা। ভারতে এবার ঈদের নামাজকে ঘিরে মুসলিমদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। ঈদের আগের দিন বিভিন্ন মসজিদ কমিটি ও মুসলিমদের মূল চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোথায়, কীভাবে এবং কতটা নিরাপদে নামাজ আদায় করা যাবে সেটি।
ভারতজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে আনন্দের ঈদে এখন উদ্বেগের ছায়া। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মিরাট জেলার একটি ছোট মসজিদে একদল মুসলিম ঈদুল আজহার নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে যখন আলোচনায় বসেছেন, তখন সেখানে উৎসবের কোনও আমেজ ছিল না বললেই চলে।
ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরে মালিয়ানা গ্রামের ওই মসজিদের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের কথা শুনেন প্রায় ৫০ জন মুসলিম। তাদের আলোচনা কোরবানির পশু কিংবা দাতব্য কর্মসূচি নিয়ে নয়, বরং রাস্তা, ব্যারিকেড, পুলিশের অনুমতি এবং কোথায়, কীভাবে তারা ঈদের নামাজ আদায় করবেন তা নিয়েই আলোচনা হয়।
মসজিদ কমিটির এক সদস্য নির্দেশ দিয়ে বলছিলেন, “দয়া করে কেউ মসজিদের গেটের বাইরে ভিড় করবেন না। ভেতরে জায়গা না হলে পরের শিফটের নামাজের জন্য অপেক্ষা করুন। কোনও তর্কে জড়াবেন না। ভিডিও করবেন না, কোনও উস্কানিতেও সাড়া দেবেন না।”
উপস্থিত লোকজন নীরবে সেই নির্দেশ শুনছিলেন। তাদের অনেকের ফোনেই তখন স্থানীয় পুলিশের দেওয়া নির্দেশনা ঘুরছিল, যেখানে স্পষ্টভাবে মসজিদের বাইরে খোলা জায়গায় নামাজ না পড়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। সেই নির্দেশনা দেখে উদ্বেগ নিয়ে চোখ চাওয়াচাওয়ি করছিলেন অনেকে।
মিরাটের মালিয়ানার গ্রামের একটি ইতিহাস আছে। ১৯৮৭ সালের মে মাসে সেখানে সহিংসতায় উগ্রপন্থি হিন্দু দাঙ্গাকবাজ ও প্রাদেশিক সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (পিএসি) ৭২ জন মুসলিমকে হত্যা করে। ৩৬ বছর শুনানির পর ২০২৩ সালে স্থানীয় জেলা আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের খালাস দেয়।
তবে মালিয়ানার মসজিদ কমিটি ও মুসলিমদের ঈদের নামাজের পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করতে বসার পেছনে যে উদ্বেগ কাজ করেছে, তা আরও সাম্প্রতিক।
‘মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত’
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কট্টরপন্থি হিন্দু সংগঠনগুলো ট্রাফিক ও নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সড়ক, পার্ক বা ফাঁকা জায়গায় জুমা ও ঈদের নামাজ আদায় করতে দিতে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
এসব সংগঠন, এমনকী প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনীতিবিদরাও রাস্তা, পার্ক বা খোলা জায়গায় নামাজ আদায়ে বাধা সৃষ্টি করছেন। খোলা জায়গায় নামাজ আদায়ের ভাইরাল ভিডিওগুলো ক্ষোভ এবং অনলাইন প্রচার উস্কে দিয়েছে; যার ফলে কোনও কোনও ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে এসব জায়গায় নামাজ আদায়ের অনুমতি বাতিল করতে হয়েছে।
গত সপ্তাহে বিজেপি’র সঙ্গে জড়িত শীর্ষস্থানীয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ (ভিএইচপি) রাস্তায় নামাজ আদায়ের ওপর দেশজুড়ে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে। এভাবে নামাজ আদায়কে তারা মুসলিম সম্প্রদায়ের ‘শক্তি প্রদর্শন’ বলে অভিহিত করেছে।
তবে মুসলিমদের যুক্তি হল, জনবহুল শহরগুলোতে সব মুসলমানকে নামাজের জন্য জায়গা করে দেওয়ার মতো স্থানীয় মসজিদ বা ঈদগাহ নেই। ফলে বছরের বিশেষ কিছু দিনে মানুষের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় কারণে মসজিদের বাইরেও নামাজ আদায় করতে হয়।
এবার ঈদুল আজহার আগের দিন মুসলমানদের সামনে মূল প্রশ্ন হল- তারা কোনও তল্লাশি, সহিংসতা বা জনগণের বৈরি আচরণের মুখে না পড়ে শান্তিতে নামাজ আদায় করতে পারবেন কিনা। বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত জনবহুল উত্তর প্রদেশে। এই রাজ্যে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মুসলমানের বাস, সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি।
উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য পরিচিত কট্টরপন্থি হিন্দু সন্ন্যাসী যোগী আদিত্যনাথ। তার সরকার রাস্তা ও খোলা জায়গায় মুসলমানদের নামাজের ওপর আরও বেশি কড়াকড়ি করছে।
গত ১৮ মে আদিত্যনাথ বলেছিলেন, মুসলমানদের উচিত ঈদুল আজহার নামাজ ‘শিফটে’ আদায় করা। এক্সে এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “তারা শান্তিতে কথা মেনে নিলে ভাল, না মানলে অন্য পথ অবলম্বন করব।”
উত্তরপ্রদেশের মুসলিমদের কাছে এই ‘অন্য পথ’ অবলম্বনের মানেটা জানা।
মিরাটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, আগের বছরগুলোতে উন্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়ার কারণে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেকের ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন বাতিল করার খবরও পাওয়া গেছে। এসব দেখার পর মানুষ এবার স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত।
দিল্লি থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮০ মাইল) দূরে আলিগড় জেলার এক দোকানদার আরিফ বলেন, গত ঈদুল আজহায় তার এলাকার মুসলমানরা “একটি খোলা মাঠে মাত্র কয়েক মিনিট নামাজ পড়েছিলেন। তার মধ্যেই পুলিশ এসে তাদেরকে তাড়া করেছিল।”
সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, “তাই এই ঈদে প্রতিটি পরিবারই সবাইকে যে কোনও ধরনের জমায়েত এড়িয়ে চলতে বলছে।”

‘আগে ঈদের সকালটা মনে হত আনন্দের’:
উত্তর প্রদেশের মুসলমানরা বলছেন, ঈদের নামাজের ওপর বিধিনিষেধ এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে, যার কারণে সাধারণ ধর্মীয় সমাবেশকেও এখন উত্তোরত্তোর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উত্তর প্রদেশের বেশ কয়েকটি শহরে মসজিদ কমিটিগুলো নীরবে ঈদের প্রস্তুতি ঢেলে সাজাচ্ছে। কেউ জামাতের আকার ছোট করছেন। অন্যরা মুসলমানদেরকে ছোট ছোট দলে আসতে বলছেন অথবা নামাজ শেষে দ্রুত চলে যেতে বলছেন। মানুষ যাতে পাশের রাস্তায় চলে না যায়, তা খেয়াল রাখতে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
৪২ বছর বয়সী আরিফ বলেন, “মুসলমানদের অনেকের কাছে এখন কেবল ঈদের নামাজ কোথায় পড়া হবে তা নিয়ে উদ্বেগ আছে তাই নয়; বরং ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে জনসমক্ষে সমবেত হওয়াকে ক্রমেই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে কিনা, সেটি তাদের কাছে আরও বেশি চিন্তার বিষয়।” জায়নামাজ কোথায় পাতব, সেটিও এখন খুব সাবধানে চিন্তা করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অন্য একজন তরুণ আরশাদ (৩৩) আল-জাজিরাকে বলেন, “আমরা একটা ছোট ভুল করতেও ভয় পাচ্ছি। আগে ঈদের সকালটা আনন্দের অনুভূতি নিয়ে আসত। এখন আগের রাত থেকেই মনে চাপা উত্তেজনা, আতঙ্ক কাজ করে। সারাক্ষণ মনে হয় এই বুঝি পুলিশ চলে এল, কিংবা কেউ ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিল।”
এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও লক্ষ্যবস্তু বানানোর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক মুসলমানের জন্য কেবল নামাজ আদায়ের মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়।
ভারতের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুমান খান আল–জাজিরাকে বলেন, “এখানে অপদস্থ হওয়ার ভয় কাজ করছে। শারীরিকভাবে কিছু না ঘটলেও মানুষ ভিডিও রেকর্ডিংয়ের শিকার হওয়া, অনলাইনে টার্গেট হওয়া বা কোনও কিছুতে অভিযুক্ত হওয়ার আতঙ্কে ভোগেন। অভিভাবকরা তরুণদের মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে নিষেধ করেন। কারণ, তারা ঝামেলা চান না।”
এই ভয় উৎসবের দিনগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়ের আচরণ বদলে দিয়েছে। সহিংসতা এড়াতে বিভিন্ন মসজিদ কমিটি ঈদের আগে সরাসরি স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের প্রবেশপথ পর্যবেক্ষণ করা, ভিড় জমতে না দেওয়া এবং নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে দ্রুত সরিয়ে দিতে বলা হচ্ছে।
পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরের এক ইমাম এই প্রস্তুতিকে ‘ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার কথায়, ঈদ নিয়ে আলোচনার চেয়ে বিধিনিষেধ নিয়েই এখন বেশি সময় ব্যয় করা হচ্ছে। বিতর্ক এড়ানোই অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজ্যের রাজধানী লক্ষ্ণৌয়ের আরেক ইমাম বলেন, জায়গার অভাবে বড় জামাতগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই অল্প সময়ের জন্য পাশের রাস্তায় চলে যায়, এটি অবাধ্যতার কিছু তো নয়।
এই ইমাম আল–জাজিরাকে বলেন, “নামাজ মাত্র কয়েক মিনিট পড়া হয়। এরপরই রাস্তা খুলে দেওয়া হয়। আগে একে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হত না। এখন বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন মুসলমানরা খোলা জায়গা দখল করার চেষ্টা করছে।”
এই উদ্বেগ কেবল উত্তর প্রদেশ রাজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লিসহ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত অন্যান্য রাজ্যেও একই ধরনের নির্দেশ জারি হয়েছে।
কেউ সংঘাত চায় না:
দিল্লির মুসলিম এলাকাগুলোতে বাসিন্দারা ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপনের ক্ষেত্রে একধরনের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলছেন।
অনেক মুসলিম আল–জাজিরাকে বলছেন, তারা এখন নামাজ পড়ার জন্য কোথায় দাঁড়াবেন, মসজিদের বাইরে কতক্ষণ থাকবেন, এই জমায়েত কোনো অভিযোগ বা অনলাইন ক্ষোভের কারণ হতে পারে কি না, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত।
ভারতের মোগল আমলের ঐতিহাসিক জামে মসজিদের বাইরে ঈদের ব্যবসার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ব্যবসায়ীরা জানান, এলাকার চায়ের দোকানগুলোতেও নামাজ পড়ার বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৪ বছর বয়সী পোশাক বিক্রেতা দানিশ খান আল–জাজিরাকে বলেন, “কেউ সংঘাত চায় না। মানুষ কেবল নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরতে চায়। কিন্তু এখন প্রতিটা ঈদ এই অনিশ্চয়তা নিয়ে আসে যে, নতুন কী নিয়ম সামনে আসতে চলেছে।”
নিয়মের বৈষম্যমূলক প্রয়োগ:
সরকার ইসলাম ধর্মীয় উৎসবগুলোর ওপর বিধিনিষেধমূলক পদক্ষেপকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জনশৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজনী বলে দাবি করছে।
অথচ হিন্দু ধর্মীয় বড় বড় শোভাযাত্রা এবং উৎসবগুলো পালনের জন্য কেবল অনুমতিই দেওয়া হয় না, বরং ট্রাফিক ঘুরিয়ে দেওয়া, পুলিশি নিরাপত্তা এবং সরকারি অবকাঠামোগত সহায়তা দিয়ে সেগুলোর উদযাপন সহজ করা হয়।
সমালোচকরা বলছেন, নামাজের ওপর কড়াকড়ির সঙ্গে এই বৈপরীত্য মুসলমানদের মনে নিয়মের বৈষম্যমূলক প্রয়োগের ধারণা আরও বদ্ধমূল করছে।
নয়াদিল্লির এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল–জাজিরাকে বলেন, মানুষ কেবল বিধিনিষেধই দেখছে না, বরং নিয়মের অসম প্রয়োগও দেখছে। তিনি আরও বলেন, “সংবিধান আইন-শৃঙ্খলা বজায় থাকার সাপেক্ষে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়। কিন্তু একটি সম্প্রদায় যদি বারবার কঠোর নজরদারিতে পড়ে এবং অন্যরা সুবিধা পায়, তবে তা আইনের চোখে সমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
মুসলমানদের নামাজের জন্য খোলা জায়গায় বিধিনিষেধের বিষয়টি বিশেষ করে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কারণ, এ কড়াকাড়ির সঙ্গে ক্রমশ শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও যোগ করা হচ্ছে।
গত এক দশকে বিজেপি শাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্যে অনুমতি ছাড়া খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার অভিযোগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা জনসমক্ষে নামাজ আয়োজনে জড়িতদের বাড়িঘর বা সম্পত্তি উচ্ছেদ অভিযানও চালিয়েছেন।
সমালোচকরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বাড়াবাড়ি এবং বৈষম্যমূলক। এমন পদক্ষেপ সাধারণ একটি ইবাদতকে অপরাধমূলক আইন প্রয়োগের বিষয়ে পরিণত করেছে।