Published : 14 Jul 2026, 08:36 PM
একাধিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে বেশ কয়েক দফা দাবিতে ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্নায় বসেছে ককরোচ জনতা পার্টির সদস্যরা। সেখানেই অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসেছেন ভারতের শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। টানা অনশনের ফলে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে তার।
অনশন কর্মসূচির ১৬তম দিনে ওয়াংচুকের ওজন ৮ দশমিক ২ কেজি কমেছে। ফলে তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও অনশন ভাঙার কোনো ইঙ্গিত দেননি সোনম।
সোমবার বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বাইরে থেকে আমি দুর্বল, কিন্তু ভেতর থেকে আমি শক্ত।”
সোমবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত সর্বশেষ স্বাস্থ্য তথ্যানুযায়ী, তার রক্তচাপ নেমে এসেছে ১০৭/৭০-এ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দাঁড়িয়েছে ৬৭-তে। এসব তথ্য প্রকাশের পর তার সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। হাজারো মানুষ তাকে অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে সোনম ওয়াংচুক অনড় অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, “যে কাজ শুরু করেছি, সেটি শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।”
কেন অনশন?
ভারতের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট)-কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ২০ জুন থেকে দিল্লির যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
প্রথম থেকেই তাদের এই আন্দোলনে পাশে থাকার বার্তা দেন ওয়াংচুক। পরে ঘোষণা করেন, কেন্দ্রীয় সরকার যদি ২৭ জুনের মধ্যে কোনও জবাব না-দেয় তবে অনশনে বসবেন তিনি। কেন্দ্রের কাছে প্রত্যাশিত কোনও উত্তর না-মেলায় ২৮ জুন থেকে অনশন শুরু করেছিলেন লাদাখের এই সমাজকর্মী।
অনশন শুরুর পর থেকে নিয়মিত ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হচ্ছে। কেমন আছেন তিনি, তার তথ্যও দেওয়া হচ্ছে। সোমবার তার স্বাস্থ্যের অবনতির চিত্র সামনে এসেছে। মঙ্গলবার তার অনশন ১৭ দিনে পড়েছে। দুর্বল শরীর রীতিমতো ধুঁকছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া মেলেনি।
পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশিষ্টজনরা, অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ:
ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ‘থ্রি ইডিয়েটস’-খ্যাত চতুরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা ওমি বৈদ্য । ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও শেয়ার করে তিনি বলেন, ‘আমি চাই না দিনের পর দিন অনশনের কারণে ওয়াংচুক মারা যাক।’
উল্লেখ্য, বলিউডের ‘থ্রি ইডিয়েটস’ সিনেমার ফুনসুখ ওয়াংড়ু চরিত্রটি বাস্তবের সোনম ওয়াংচুকের জীবন থেকে নেওয়া অনুপ্রেরণা। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ওয়াংচুকের জীবন সম্পর্কেও সবাই আরও বেশি জানার অনুরোধ করেছেন ওমি।
ভারতের বিনোদন জগৎ ও নাগরিক সমাজের আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ওয়াংচুকের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন। তবে ভবিষ্যতের দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বার্থে তাকে অনশন প্রত্যাহারেরও অনুরোধ করেছেন তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "ছাত্র ও যুবসমাজের জন্য আপনি যেভাবে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আমরা আপনার সেই সংকল্প ও সাহসিকতাকে সেলাম জানাই। তবে ভবিষ্যতের দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য আপনাকে আমাদের প্রয়োজন। তাই অবিলম্বে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ করছি।
গান্ধীর পথ অনুসরণ:
নিজেকে মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন ওয়াংচুক। তার কথায়, অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের বিবেককে নাড়া দিতেই তিনি অনশন করাকে বেছে নিয়েছেন।
ভারতের লাদাখ অঞ্চলের বাসিন্দা ওয়াংচুক দেশজুড়ে ‘সোনম স্যার’ নামে পরিচিত। তিনি শুধু একজন প্রকৌশলী নন, একজন শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু কর্মী হিসেবেও সম্মান অর্জন করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় লাদাখে তার উদ্ভাবনী উদ্যোগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
সোনম ওয়াংচুক লাদাখে পানির সংকট দূর করতে এবং গাছ লাগাতে কৃত্রিম হিমবাহ ‘আইস স্তুপা’ উদ্ভাবন করেছেন, যা শীতকালের পানি সংরক্ষণ করে এবং পরে বসন্তের সময় তা কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সেচের জন্য ছাড়া হয়।
এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তিনি র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার লাভ করেন, যা এশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত।
সূত্র: বিবিসি