Published : 12 Jun 2026, 07:24 PM
ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এবং শরদ পাওয়ারের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি-এসপি) কি আবার কংগ্রেসে ফিরে যাবে?
তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীন সংকটের মধ্যে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে যে, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে গঠিত হওয়া দলগুলো আবার পুরোনো ঘরে ফেরার পরিকল্পনা করছে।
রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসে মিলেমিশে যাবে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)- এই জল্পনা চলে আসছে কয়েকদিন ধরে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল অবশ্য বৃহস্পতিবার তৃণমূল ও কংগ্রেসের এক হওয়ার এই আলোচনা ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে কথায় আছে- যা রটে, তার কিছু তো ঘটে। রাজনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে, কেবল তৃণমূল কংগ্রেসই নয়, শরদ পওয়ারের ‘ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি -শরদচন্দ্র পাওয়ার’ (এনসিপি-এসপি)-ও ফিরতে পারে কংগ্রেসে।
মহারাষ্ট্রের বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা নানা পাটোলে স্পষ্টই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি চলছে।
তিনি বলেন, “সমমনা দলগুলো কংগ্রেসের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শরদ পওয়ার ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসে যোগ দিতে মনস্থির করছেন”।
তবে পাটোলে জোর দিয়ে বলেছেন যে, “এটি কোনও জোট হবে না, বরং দলগুলো এক হয়ে যাবে।”
‘অখণ্ড কংগ্রেস’:
কংগ্রেস নেতা পাটোলে দাবি করেছেন যে, এনসিপি-এসপি’র কংগ্রেসের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব ইতিমধ্যেই দিয়েছেন শরদ পওয়ার।
এ নিয়ে আলোচনাও চলছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এনসিপি থেকে প্রস্তাব এসেছে। পওয়ার সাহেব এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন আগেই। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা বিলম্বিত হয়।
“তবে আমার মনে হচ্ছে, বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে যা হচ্ছে… বড় মাপে ভোট বিভাজন রুখতে সব ধর্ম নিরপেক্ষ, সম-মনা দলগুলোর একজোট হওয়া উচিত।
“জাতীয় স্তরে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস হোক বা পওয়ার সাহেব, সবাই কংগ্রেসের সঙ্গে এক হওয়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন।”
একই সুর শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউতের কণ্ঠেও:
কয়েকদিন আগে শিবসেনা(ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউতের কণ্ঠেও শোনা গেছে একই সুর। তিনিও তখন বলেছিলেন যে, কংগ্রেস ভেঙে যে দলগুলো তৈরি হয়েছে, তাদের আবার দেশের এই পুরোনো দলটির সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া উচিত। শরদ পওয়ারের এই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
রাউত বলেন, “কংগ্রেসকে শক্তিশালী হতে হবে। ছোট দলগুলোর নেতাদের, যারা কংগ্রেস থেকেই উঠে এসেছেন, তাদের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হবে।”
এই প্রস্তাবকে একটি ‘ভালো প্রস্তাব’ আখ্যা দিয়ে শরদ পাওয়ারের মেয়ে ও এনসিপি-এসপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলেন, কেবল সময়ই বলে দেবে সামনে কি ঘটবে।
প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ না করে এক ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যে তিনি বলেন, “আগে বৃষ্টি আসুক, তারপর দেখা যাবে ছাতা নেব নাকি রেইনকোট।”
গুঞ্জন আরও উসকে দিয়েছেন গেহলট:
অখণ্ড কংগ্রেস গড়ার রাজনৈতিক গুঞ্জনকে আরও উস্কে দিয়েছেন রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলট। তিনি ছোট দলগুলোকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া এবং রাহুল গান্ধীকে নেতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
শিবসেনা নেতার মন্তব্যকে সমর্থন করে গেহলট বলেছেন, “সঞ্জয় রাউত যা বলেছেন, তার দাম আছে। সময় এসে গেছে, কংগ্রেস ভেঙে যে সব দল আঞ্চলিক পার্টিতে পরিণত হয়েছে, তাদের উচিত কংগ্রেসে ফের যোগ দেওয়া এবং রাহুল গান্ধীকে নিজেদের নেতা হিসাবে গ্রহণ করা।”
তিনি আরও বলেন, “দেশে এই বার্তা পৌঁছনো উচিত যে, ইন্ডিয়া জোটের নেতা রাহুল গান্ধী। মানুষের কাছে এই বার্তা স্পষ্ট থাকা উচিত, তবেই তারা আমাদের সফল করবে।
তারা দেখছেন যে, “একদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রয়েছেন, আরেকদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী রয়েছেন। সব রাজনৈতিক দলের রাহুল গান্ধীকে নিজেদের নেতা হিসাবে গ্রহণ করলেই দেশের ভোটের ধরন বদলে যাবে।”
অতীত ও ভবিষ্যৎ:
শরদ পওয়ার ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়- দুইজনই কংগ্রেস থেকে উঠে এসেছিলেন এবং নিজেদের দল তৈরি করেছেন।
১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন। শরদ পওয়ার ১৯৯৯ সালে ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি তৈরি করেন।
২০২৩ সালে তার ভাতিজা অজিত পওয়ার দলের ভেতরে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে যান এবং বিজেপি-শিবসেনার জোটে যোগ দেন।
এনসিপি-র নাম ও প্রতীকও পেয়ে যান অজিত পওয়ার সংখ্য়াগরিষ্ঠতার কারণে। বর্তমানে ঠিক একই পথে এগোচ্ছে তৃণমূলও।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় একদিকে তৃণমূলের বিদ্রোহী ঋতব্রত নেতৃত্বাধীন শিবির দাবি করছে, তাদের সঙ্গে ৬৪ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে।
অন্য়দিকে, ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় তৃণমূলের কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ১৯ জন সাংসদ আলাদা ফ্রন্ট গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব, প্রকাশ চিক বরাইক ও কোয়েল মল্লিক। তাহলে কি এবার দলের ভাঙন রুখতে তৃণমূল ও এনসিপি এক হয়ে অখণ্ড কংগ্রেস তৈরি করবে? তা বলবে সময়ই।
তৃণমূলকে নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান:
মমতার দল তৃণমূলকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চায় না কংগ্রেস। তারা চায়, একীভূতকরণের প্রস্তাব আগে তৃণমূলের কাছ থেকে আসতে হবে।
তারপর বিষয়টি ভেবে দেখা হবে। কিন্তু এ নিয়ে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনওরকম উদ্যোগ নেওয়া হবে না।
গত বুধবার রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে মমতার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, তৃণমূল একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট চায় এবং রাহুলের নেতৃত্বও মেনে নিতে প্রস্তুত।
তবে কংগ্রেস স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, একীভূতকরণের প্রস্তাব তৃণমূলের পক্ষ থেকেই আসতে হবে। কংগ্রেস কোনও চাপিয়ে দেওয়া একীভূতকরণে আগ্রহী নয়।
সূত্র: এনডিটিভি।