Published : 22 May 2026, 01:06 AM
খনিজ সম্পদের ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার আওতায় নাইজারের সামরিক সরকার দেশটির উত্তরাঞ্চলের আর্লিত অঞ্চলে ফ্রান্সের মালিকানাধীন ৫৮ বছরের পুরনো একটি ইউরেনিয়াম খনির ইজারা বা ছাড়পত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে।
ফরাসি আনবিক শক্তি কমিশন ১৯৬৮ সালে আর্লিতে ইউরেনিয়াম আবিষ্কার করে। দীর্ঘদিন ধরেই এটি ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানির প্রধান উৎস। ফ্রান্সের আণবিক শক্তি কমিশন ওই সময়ই এই খনির স্বত্ব পেয়েছিল, যা পরবর্তীতে ফরাসি পারমাণবিক জ্বালানি কোম্পানি ‘ওরানো’ পরিচালনা করে এসেছে।
খনিটিতে রয়্যালটি বা নির্দিষ্ট কর বকেয়া থাকা এবং নিয়ম না মানার অভিযোগে নাইজারের সামরিক সরকার মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এক ডিক্রির মাধ্যমে ওই ঐতিহাসিক চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে।
গত ১৮ মে নাইজারের সামরিক নেতা আবদুরহমানে চিয়ানির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় আর্লিত চুক্তির আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।
নাইজার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফরাসি কোম্পানি ওরানোকে একাধিক সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও খনির সারফেস রয়্যালটি বা কর পরিশোধে তারা ব্যর্থ হয়েছে এবং নিয়মকানুন বারবার অমান্য করেছে।
এর আগে ২০২৪ সালে নাইজার সরকার ফরাসি কোম্পানি ওরানোর আওতাধীন বিশাল ইমুরারেন ইউরেনিয়াম খনির পরিচালনা বা উত্তোলনের লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। এবার তারা আর্লিত শহরের কাছের সোমাইর ইউরেনিয়াম খনি রাষ্ট্রীয়করণ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিল।
নাইজারের এমন সিদ্ধান্তে প্যারিসসহ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। নাইজারের এই পদক্ষেপ ফ্রান্সের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করতে পারে এবং সাহেল অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিজেদের খনিজ সম্পদ সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে নাইজার এখন নিজস্ব ইউরেনিয়াম কোম্পানি গঠন করছে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশটি রাশিয়ার মতো নতুন কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে জড়াতে পারে।
নিজেদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে নাইজারের ইউরেনিয়ামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।
সমালোচকদের মতে, কয়েক প্রজন্ম ধরে প্যারিস নাইজারের এই খনিগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আহরণ করলেও নাইজার বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবেই রয়ে গেছে। বর্তমান জান্তা সরকার এখন সেই সমীকরণ বদলে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই নাইজার ফরাসি সেনা বহিষ্কার এবং সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যমে নিজেদের সার্বভৌমত্ব জোরদারের চেষ্টা করছে।
তাদের সর্বশেষ এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশটির খনিজ সম্পদে ফ্রান্সের যে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ছিল তা ভেঙে পড়েছে। এর মাধ্যমে আফ্রিকার এই অঞ্চলে ফরাসি একাধিপত্যের একটি যুগের অবসান ঘটল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।