Published : 23 Jan 2026, 12:18 PM
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেইন যুদ্ধের অবসান নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
বিবিসি জানিয়েছে, দাভোসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর এ কথা বলেন তিনি।
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ারও ইঙ্গিত মিলেছে। ট্রাম্প বলেছেন, জেলেনস্কির সঙ্গে তার বৈঠক ভালো হয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার জন্য মস্কোর উদ্দেশে রওনা হন।
ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে মস্কো যাচ্ছিলেন উইটকফ। তার ভাষ্য, একটি চুক্তি নিয়ে তিনি আশাবাদী।
সুইজারল্যান্ডের রিসোর্ট ছাড়ার আগে তিনি বলেন, “আমাদের আলোচনা এখন একটিমাত্র বিষয়ে এসে ঠেকেছে এবং আমরা সেই বিষয়ের বিভিন্ন রূপ নিয়ে আলোচনা করেছি। এর মানে হল, এটি সমাধানযোগ্য।”
তবে সমাধান না হওয়া সমস্যাটি কী, সে বিষয়ে ট্রাম্পের দূত বিস্তারিত বলেননি। পরে জেলেনস্কি স্পষ্ট করেন, পূর্ব ইউক্রেনের ভবিষ্যৎই এখনো অমীমাংসিত বিষয়।
তিনি জানান, আমিরাতে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেইন—তিন পক্ষই অংশ নেবে।
“শুধু ইউক্রেইন নয়, রাশিয়াকেও সমঝোতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে,” বলেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে জেলেনস্কি সাংবাদিকদের বলেন, “সবকিছুই ভূমি নিয়ে। এটাই সেই বিষয়, যা এখনো সমাধান হয়নি।”
তিনি বলেন, ত্রিপক্ষীয় আলোচনা উভয় পক্ষের সামনে সম্ভাব্য বিভিন্ন বিকল্প হাজির করতে পারে।
দনবাস অঞ্চলে ইউক্রেইনের শিল্পকেন্দ্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব হল—কিইভের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে একটি নিরস্ত্রীকৃত ও মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন।
উইটকফ বলেন, “যদি উভয় পক্ষই সমাধান চায়, তাহলে আমরা এর সুরাহা করব।”
মস্কোর পর তিনি আবুধাবিতে যাবেন, যেখানে সামরিক বিষয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করবে বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপ।
জেলেনস্কি জানান, চুক্তি হলে ভবিষ্যতে ইউক্রেইনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়ে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন।
তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি, তবে জানিয়েছেন, চুক্তি সইয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও ইউক্রেইনের পার্লামেন্টে অনুমোদনের দরকার পড়বে।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে গঠিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ চুক্তি পর্যবেক্ষণের জন্য মাঠে সেনা মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও জেলেনস্কি জানিয়েছেন।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এক্ষেত্রে ট্রাম্পের সমর্থন অপরিহার্য।
তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তাই কার্যকর হয় না।”
এর আগে দাভোসে দেওয়া বক্তৃতায় জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব’কে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও অস্পষ্টতার কারণে ঐক্য ও কার্যকর সমাধান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এক্ষেত্রে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জেলেনস্কি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে ভালোবাসেন, এবং তিনি বলেন যে তিনি ইউরোপকে ভালোবাসেন, কিন্তু এই ধরনের ইউরোপের কথা তিনি শুনবেন না।”
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট সারা রাত ভ্রমণ করে দাভোসে পৌঁছান। এর আগে কিইভের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর রুশ হামলার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি সফর বাতিল করেছিলেন।
এসব হামলায় রাজধানীর বড় অংশে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়; রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর প্রায় চার বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি শীত পড়েছে। হাজার হাজার অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক গরম করার ব্যবস্থা এখন নেই।
জেলেনস্কি গত মাসে বলেছিলেন, যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা পরিকল্পনার ৯০ শতাংশ প্রস্তুত এবং পূর্ব ইউক্রেইনের দনবাস নিয়ে ইউক্রেইনের অবস্থান রাশিয়ার থেকে ভিন্ন।
এ ২০ দফা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দনবাসে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের জন্য ইউক্রেইন এখনও যে ২৫ শতাংশ দোনেৎস্ক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, সেখান থেকে সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছেন জেলেনস্কি। তবে শর্ত হচ্ছে, রাশিয়াকেও একই কাজ করতে হবে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বৃহস্পতিবার বলেন, “ইউক্রেন ইস্যু এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে মার্কিন দূতদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।”
তবে চুক্তি নিয়ে উইটকফের আশাবাদের সঙ্গে তিনি একমত কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান পেসকভ।
বিবিসি লিখেছে, পুতিন পুরো অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী এবং গত এক বছরে রুশ বাহিনী পূর্বাঞ্চলে ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে।
জেলেনস্কি গত মাসে আরেকটি বড় অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে ইউক্রেইনের বিশাল জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। এ স্থাপনাটি ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া দখল করে নেয়।
জেলেনস্কি মজা করে বলেন, তিনি আশা করেন, আমিরাত কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিত বৈঠকের কথা জানে। তবে আলোচনার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি ইউক্রেইনীয় দলের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম বলেন।
দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান রুস্তেম উমেরভ ইতিমধ্যে দাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার সঙ্গে ছিলেন জেলেনস্কির দপ্তরের প্রধান কিরিলো বুদানোভ এবং মধ্যস্থতাকারী ডেভিড আরাখামিয়া। তাদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেবেন সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ আন্দ্রি উনাউভ।