Published : 12 May 2026, 07:33 PM
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি বাহিনী আবারও আক্রমণ করলে নিজেদের ইউরেনিয়াম মজুত ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। এই মাত্রাটি মূলত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী মান বা ‘ওয়েপন-গ্রেড’ হিসেবে বিবেচিত।
তেহরানের সঙ্গে আলোচনা স্থবির হয়ে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসার পরপরই এই হুঁশিয়ারি দিল ইরান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি সংক্রান্ত সংসদীয় কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি বলেন, “আরেকবার হামলা হলে ইরানের হাতে থাকা বিকল্পগুলোর একটি হতে পারে ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ। আমরা বিষয়টি পার্লামেন্টে পর্যালোচনা করব।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ বা পারমাণবিক ধূলিকণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধূলার সঙ্গে মিশে আছে বলে ধারণা ট্রাম্প প্রশাসনের।
তেহরানের বিরুদ্ধে গত ৭০ দিন ধরে চলা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ট্রাম্প এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের স্পষ্ট কথা, তেহরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ যুক্তরাষ্ট্র ‘নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছে। কেউ ওই মজুদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলে ওয়াশিংটন তা জেনে যাবে আর তাদের ‘উড়িয়ে দেবে’।
সোমবার ট্রাম্প আবারও সতর্ক করে বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিটি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ পাল্টা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর এ মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব দিতে তাদের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সেই প্রস্তাবে মজুদ থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একাংশ লঘু করা এবং বাকি অংশ সাময়িকভাবে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ছয় বিশ্ব শক্তির সঙ্গে তেহরানের ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনকে সরিয়ে নেওয়ার পর গত আট বছরে ইরান প্রায় ১১ হাজার কিলোগ্রাম (২২,০০০ পাউন্ড) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জমা করেছে।
২০০৬ সালে ইরান শিল্প পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে আর বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ-এর তথ্য বলছে, এই মজুদ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।
২০১০ সালে ইরান ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণের ঘোষণা দেয়, যা মূলত বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক বিভাজন রেখা।
আইএইএ মনে করে, ইরানের মজুদে থাকা ৪৪০ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। কারিগরিভাবে এটি অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের খুব কাছাকাছি একটি ধাপ।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ২০ শতাংশ থেকে ৬০ বা ৯০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া শূন্য থেকে ২০ শতাংশে নেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি সহজ।
২০২১ সালের জুনে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিও স্বীকার করেছিলেন যে, ইরান চাইলেই অনায়াসে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করতে সক্ষম। তবে তিনি তখন ২০১৫ সালের চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
কোথায় আছে এই ইউরেনিয়াম?
ইরানের এই বিশাল মজুদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। আইএইএ-র ধারণা, মজুদের বড় অংশটি এখনও ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে রয়েছে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র এই কেন্দ্রে বড় ধরনের বিমান হামলা চালানো হয়েছিল আর এ বছরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে প্রবল আক্রমণ চালিয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রসি চলতি সপ্তাহের শুরুতে বলেন, পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাটি বিশ্বাস করে যে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ ‘২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় সেখানেই (ইস্পাহান কমপ্লেক্স) মজুদ ছিল এবং তখন থেকে সেগুলো সেখানেই আছে।”
তবে তিনি বলেন, “সেখানে ওই সব তেজস্ক্রিয় পদার্থ আদৌ আছে কি না, কিংবা আইএইএ-র সিলগুলো এখনও সেখানে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে কি না, সেটি আমরা সরাসরি পরিদর্শন করতে পারিনি, আবার নাকচও করতে পারছি না। আমি আশা করি আমরা শিগগিরই তা যাচাই করতে পারব। আপাতত আমি আপনাদের যা বলছি, সেটি আমাদের সেরা অনুমান মাত্র।”
আরও পড়ুন: