Published : 18 Jun 2026, 11:20 PM
রুপার্ট লোর প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানি তরুণদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণ চক্রের ভয়াবহ অপরাধের চিত্র উঠে আসার পর মেয়ে শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে।
ওই প্রতিবেদন বলছে, পাক গ্রুমিং গ্যাং নামের ওই চক্রের হাতে গত এক দশকে আড়াই লাখের বেশি ব্রিটিশ তরুণী ও শিশু ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
রাশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আরটি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ব্রিটিশ এমপি রুপার্ট লো প্রকাশিত ২১৮ পৃষ্ঠার ‘রেপ গ্যাং রিপোর্ট’ অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের ১৪৯টি জেলা ও পৌর এলাকায় কয়েক দশক ধরে মূলত শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ তরুণী ও শিশু পাকিস্তানি তরুণদের তৈরি ‘গ্রুমিং গ্যাং’ এর ‘পদ্ধতিগত নির্যাতনের’ শিকার হয়েছে। তাদের নির্যাতনের শিকার যারা হয়েছে, তাদের মধ্যে অল্প সংখ্যায় শিখ তরুণী ও শিশুও রয়েছে।
অবশ্য ইয়াহু নিউজের এক স্বাধীন ফ্যাক্টচেকে বলা হয়েছে, গ্রুমিং গ্যাংয়ের ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সংখ্যা আড়াই লাখ বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। সংখ্যাটি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ‘শিরোনাম আকর্ষণকারী’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত ২০২২ সালের একটি স্বাধীন তদন্তে বলা হয়েছিল, কোনো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শিশু যৌন নিপীড়নের মাত্রা জানা একেবারেই সম্ভব নয়।

তবে রুপার্ট লোর প্রতিবেদনে ওই চক্রের নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগীরা অত্যন্ত নৃশংস যৌন সহিংসতার বিবরণ তুলে ধরেছেন।
তারা বলেছেন, চক্রটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের শত শতবার ধর্ষণ করেছে, হত্যার হুমকি দিয়েছে এবং অমানবিক নির্যাতন করেছে। কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই সব ঘটেছে, কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
রুপার্ট লো এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় ৬ লাখ পাউন্ড খরচ করে এই রিপোর্ট তৈরি করেন। সেখানে শত শত ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আবেদনের ভিত্তিতে পাওয়া হাজার হাজার তথ্য থাকলেও যুক্তরাজ্যের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি ততটা প্রচার পায়নি।
আরটি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলে তথাকথিত ‘গ্রুমিং গ্যাং’ এর যৌন সহিংসতার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার এর আগেও বেশ কয়েকবার তদন্ত করেছে।
এর মধ্যে ‘জে ইনকোয়ারি’ এবং ‘টেলফোর্ড ইনকোয়ারি’ অন্যতম। তবে সেই তদন্তগুলো কেবল নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের ওপর হওয়ায় সেগুলোকে দেশব্যাপী বিশেষ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেনি তারা।
অন্যদিকে রুপার্ট লোর রিপোর্ট সরকারি অর্থায়নে নয়, বরং ক্রাউডফান্ডিং বা যৌথ অর্থায়নের মাধ্যমে হয়েছে। রিপোর্টে গোটা যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
আগের গবেষণা, আদালতের রেকর্ড এবং বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রধানত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের এই ধর্ষণ চক্র ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ১৪৯টি স্থানীয় কাউন্সিল এলাকায় সক্রিয় ছিল; যা গোটা যুক্তরাজ্যের মোট ৩১৭টি পৌরসভার প্রায় অর্ধেক।
রুপার্ট লোর রিপোর্টে এসব অপরাধের পেছনে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক মনোভাবের কথাও উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, “এটি মূলত পাকিস্তানি মুসলিম পুরুষদের একাংশ দ্বারা দুর্বল ও অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্বেতাঙ্গ তরুণীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি অপরাধ।”
আরটি ইন্টারন্যাশনালের খবরে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত আগের কিছু আংশিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হত, ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় আড়াই লাখ নারী ও শিশু এই ধর্ষণ চক্রের শিকার হয়েছে। তবে রুপার্ট লোর তৈরি প্রতিবেদনে এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। কারণ লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে অনেকেই যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রকাশ বা অভিযোগ করেন না।
রুপার্টের তৈরি প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য। সেখানে দেখা যায়, সাধারণত সুবিধাবঞ্চিত বা পারিবারিক সমস্যায় থাকা তরুণীদের প্রথমে অর্থ, উপহার বা মাদক দিয়ে প্রলুব্ধ করা হত। পরে বিশ্বাস অর্জন করে তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের এক শহর থেকে অন্য শহরে অপরাধী চক্রের কাছে হাতবদল করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
এদিকে সংঘবদ্ধ এই পাকিস্তানি চক্রকে দমনের বিষয়ে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে। ২০২২ সালের ‘জে ইনকোয়ারি রিপোর্টে’-ও স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘বর্ণবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সমালোচনা করা হয়।
রুপার্ট লোর রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মেয়েরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো অবহেলা করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাবলিক প্রসিকিউশনের পরিচালক থাকা অবস্থায় এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।
যদিও লেবার পার্টি চলতি বছরের শুরুর দিকে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তবে লোর রিপোর্টে সেটিকে ‘লোক দেখানো বা নিয়ম রক্ষার তদন্ত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে অপরাধের পেছনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
আরটি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, চলতি মাসের শুরুতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক অধিবেশনে রুপার্ট লো তার কাছে থাকা নির্যাতনের শিকার কয়েকজনের সাক্ষ্য পড়ে শোনান। সেখানে বলা হয়, ওই গ্যাংয়ের ৪০ ও ৫০ বছর বয়সী পুরুষরা ১১ বছর বয়সি মেয়েদেরও নিশানা করত। কেউ কেউ দলবদ্ধ ধর্ষণে যোগ দেওয়ার জন্য তাদের স্বজনদেরও ডেকে আনত। ধর্ষকদের বেশিরভাগই ছিল পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত না হলে ইরাকি মুসলিম বা কুর্দি।
এদিকে পাকিস্তানিদের তৈরি এই ধর্ষক চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। নিজ মালিকাধীন সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে চক্রটির অপরাধ মোকাবেলায় ‘চরম অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার পর তিনি ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের’ বিরুদ্ধে আইনি মামলায় অর্থায়ন করতে প্রস্তুত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
পুরনো খবর-
'পাক গ্রুমিং গ্যাংয়ের' যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরলেন ব্রিটিশ এমপি