Published : 09 Dec 2025, 06:58 PM
থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্তসংলগ্ন উত্তেজনা আবারও ছড়িয়ে পড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া ঠুনকো যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দিয়েছে।
সোমবার থেকে অন্তত তিনজন থাই সেনা এবং সাতজন কাম্বোডীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। সহিংসতা শুরুর জন্য দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে।
থাইল্যান্ড সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। গত জুলাইয়ে দুইদেশ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার পর থেকে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক সংঘাত।
জুলাইয়ে দুই দেশের সামরিক বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করার পর পাঁচ দিন ধরে সংঘর্ষ চলেছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেন এবং মালয়েশিয়ার সহযোগিতায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেন।
চুক্তির আওতায় ভারি অস্ত্র সীমান্ত অঞ্চল থেকে সরানো ও পর্যবেক্ষক দল স্থাপন করা হয়েছিল। তবে নভেম্বর মাসে থাইল্যান্ড তাদের একজন সেনা স্থলমাইনে আহত হওয়ার অভিযোগ তুলে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্থগিত করে।
এরপর যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ হওয়ার অভিযোগ তুলেই ডিসেম্বরে দুই দেশ আবার সীমান্তে সংঘর্ষে জড়াল।
এই বিরোধ নতুন নয়। উভয় দেশের মধ্যে এই সীমান্ত বিরোধের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো, যা শুরু হয়েছিল কম্বোডিয়ায় ফরাসি দখলদারিত্বের পর সীমান্ত নির্ধারণের সময়।
বিরোধ তীব্র হয় ২০০৮ সালে, যখন কম্বোডিয়া বিতর্কিত এলাকায় অবস্থিত ১১ শতকের এক মন্দিরকে ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করলে থাইল্যান্ড ক্ষুব্ধ হয়।
এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সামরিক সংঘর্ষে উভয় পক্ষের সেনা ও বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
সর্বশেষ গত মে মাসে এক কম্বোডীয় সেনা নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা বেড়ে যায়, যা দুই দেশের সম্পর্ককে দশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
জুলাইয়ে প্রথম সংঘর্ষের আগে, দুই দেশই সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। কম্বোডিয়া থাইল্যান্ড থেকে ফল-সবজিসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল, ইন্টারনেট সেবা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছিল।
সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহে দুই দেশই সীমান্ত এলাকায় সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করেছিল।
কেন আবার উত্তেজনা বেড়েছে?
সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপট নিয়ে উভয় পক্ষের ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে।
৮ ডিসেম্বর থাই সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের সেনারা উবন রাতচাথানি প্রদেশে কম্বোডিয়ার হামলায় এক থাই সেনা নিহতের ঘটনার পাল্টা জবাব দিয়েছে। সোমবার থাই বাহিনী কম্বোডিয়ায় বিমান হামলা শুরু করার কথা জানায়।
অন্যদিকে, কাম্বোডিয়া বলছে, তাদের ওপর থাই সেনারাই প্রথম হামলা চালিয়েছে। প্রেহ ভিহিয়ার প্রদেশে থাই বাহিনী এ হামলা চালায়। কম্বোডিয়া এই হামলার কোনও জবাব দেয়নি বলেও দাবি করেছে।
এরপর থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী অভিযোগ করে বলেছে, কম্বোডিয়া থাই সেনাদের ওপর রকেট ছুড়ছে, বোমা ফেলা ড্রোন এবং কামিকাজি ড্রোন ব্যবহার করেছে। এগুলোর কিছু বেসামরিক এলাকায় আঘাত হেনেছে।
পরে থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী আরও বিমান হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করে জানায়। ওদিকে, কম্বোডিয়াও অভিযোগ করে যে, থাইল্যান্ড বেপরোয়াভাবে পুরসাত প্রদেশে বেসামরিক এলাকাগুলোতে গুলি চালিয়েছে।
জুলাইয়ের সংঘর্ষে কী হয়েছিল?
সে সময়ও দুই পক্ষ গুলি চালিয়েছিল এবং সংঘাতের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করেছিল। সংঘর্ষ দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছিল।
থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে রকেট ছোড়ার অভিযোগ করে। আর কম্বোডিয়ার সামরিক লক্ষবস্তুতে থাইল্যান্ড বিমান হামলা চালায়। ৫ দিনের এ সংঘর্ষে নিহত হয় অন্তত ৪৮ জন এবং বাস্তুচ্যুত হয় হাজারো মানুষ।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেন এবং মালয়েশিয়ার সহযোগিতায় থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেন। দুই পক্ষই এর আওতায় বিতর্কিত এলাকা থেকে ভারি অস্ত্র সরিয়ে নিতে রাজি হয়।
তাছাড়া, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি অন্তর্বর্তী পর্যবেক্ষণ টিম প্রতিষ্ঠায় রাজি হয়। এর পরের ধাপে সম্ভবত থাইল্যান্ডে আটক ১৮ কম্বোডীয় সেনাকে মুক্তি দেওয়ার পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ট্রাম্পের 'শান্তি চুক্তি'র কী হল?
থাইল্যান্ড নভেম্বরেই শান্তি চুক্তি স্থগিত করে। থাই প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল বলেছিলেন, "নিরাপত্তা হুমকি আসলে কমেনি। তখন কম্বোডিয়া জানিয়েছিল, তারা চুক্তির শর্তে অটল রয়েছে।
ডিসেম্বরে আবার সংঘর্ষ শুরু হলে থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও বিবিসি-কে বলেন, যুদ্ধবিরতি ‘কাজ করছে না। এখন বল কম্বোডিয়ার কোর্টে।’
তবে কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেন বলেন, তাদের বাহিনী সোমবার রাতে কেবল পাল্টা গুলি চালিয়েছে। তারা ‘যুদ্ধবিরতিকে সম্মান জানিয়েছে।’
ট্রাম্প উভয় পক্ষকে চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন বলে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে। তবে দুই পক্ষের সংঘাত কোনদিকে মোড় নেবে তা স্পষ্ট নয়।
অতীতে গুরুতর সংঘর্ষ হলেও দ্রুতই তা প্রশমিত হয়েছে। জুলাইয়ে বিবিসি প্রতিবেদক জোনাথন হেডও মনে করেছিলেন, একই পথ হয়ত অনুসৃত হবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, উভয় দেশেরই এমন নেতৃত্বের অভাব আছে, যারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংঘাত থেকে পিছিয়ে আসতে পারে।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় ভ্রমণ নিরাপদ?
থাইল্যান্ডে ভ্রমণকারীদের জন্য ব্রিটিশ পররাষ্ট্রদপ্তর বর্তমানে পরামর্শ দিয়ে বলেছে, কম্বোডিয়া সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রয়োজন ছাড়া যেন ভ্রমণ না করা হয়।
কম্বোডিয়ায় ভ্রমণকারীদের জন্যও একই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডের সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করতে বলা হয়েছে মানুষজনকে।