Published : 02 Jun 2026, 09:38 PM
বিশ্বজুড়ে আগামী মাসগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে মাঝারি বা শক্তিশালী ‘এল নিনো’।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই পূর্বাভাস দিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ডব্লিউএমও’র তথ্য অনুযায়ী, ‘এল নিনো’ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এর প্রভাবে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। সাধারণত এই পরিস্থিতি ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি এল নিনোর বিকাশে জ্বালানি জোগাচ্ছে। এর প্রভাবে জুন থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি আগামী নভেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএমও। সংস্থাটি এও বলেছে যে, এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে তা নিয়ে বিভিন্ন মডেলে ভিন্নতা থাকায় কিছুটা অনিশ্চয়তা আছে। তবে এর তীব্রতা মোকাবেলার প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ডব্লিউএমও-র মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, “আমাদের একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এটি খরা ও ভারি বৃষ্টিপাতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে। সঙ্গে স্থলভাগ ও মহাসাগর, উভয় ক্ষেত্রেই দাবদাহের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে।”
আরও খরা, হ্যারিকেন ও দাবদাহ?
এই আবহাওয়াগত পরিবর্তন আঞ্চলিক জলবায়ুকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করার জন্য পরিচিত।
এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকার শিং (হর্ন অব আফ্রিকা) এবং মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেতে পারে।
অন্যদিকে, এল নিনোর কারণে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশসহ অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা ও ইন্দোনেশিয়ায় তীব্র খরা দেখা দিতে পারে।
সেই সঙ্গে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হ্যারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পট প্রস্তুত হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা।
সেলেস্তে সাউলো উল্লেখ করেন, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া সর্বশেষ শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে ২০২৪ সালটি ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল।
তিনি সতর্ক করে বলেন, তীব্র গরমের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মশাবাহিত রোগের দ্রুত বিস্তার এবং খাদ্য ও পানির সরবরাহ কমে যাওয়া।
তার মতে, “যেসব জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যে জীবনধারণের জন্য লড়াই করছে, তারা আরও চরম সংকটের মুখে পড়বে।”
ইরান যুদ্ধের কারণে চলমান বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির মাঝে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য এল নিনো খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বড় চকলেট ও কোকো প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান ‘ব্যারি ক্যালবট’-এর প্রধান নির্বাহী হাইন শুমাখার সতর্ক করেছেন যে,
বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের ৬০ শতাংশ সরবরাহকারী ইকুয়েডর এবং পশ্চিম আফ্রিকার কোকো চাষের অঞ্চলগুলোতে ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। এল নিনোর প্রভাবে কোকোর দাম টনপ্রতি আরও কয়েক হাজার পাউন্ড বেড়ে যেতে পারে।”
বর্তমানে লন্ডনের বাজারে কোকো প্রতি মেট্রিক টন ২,৯৪৪ পাউন্ডে লেনদেন হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের এপ্রিলে ৯,০০০ পাউন্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
কিছু দেশের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা গত এক দশকের মধ্যে এবার সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অবশ্য এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য না করে জানিয়েছে, তারা ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে অস্বাভাবিক উষ্ণ পরিস্থিতি লক্ষ্য করেছে।
সেখানকার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মূলত সমুদ্রপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করার একটি বড় তাপ-ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিকে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়ার একটি জরুরি বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, “বিশ্বের উচিত এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করা। এল নিনো মূলত উত্তপ্ত হতে থাকা এই পৃথিবীর আগুনে আরও ঘি ঢালবে।”