চীন-তাইওয়ান উত্তেজনার পেছনে কী?

তাইওয়ানের বেশিরভাগ নাগরিকই স্বশাসিত দ্বীপটির এখনকার স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষে; যেখানে তাইওয়ান না স্বাধীন, না পরাধীন।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 August 2022, 01:45 PM
Updated : 4 August 2022, 01:45 PM

চীনের হুমকি ধামকি উপেক্ষা করে তাইওয়ানে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সফরের পর স্বশাসিত দ্বীপটিকে ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।

বিবিসি লিখেছে, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানান ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে এমনিতেই টানাপোড়েন চলছিল; পেলোসির সফর তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বেইজিং-তাইপে বিরোধের কেন্দ্রে অবস্থান করছে তাইওয়ান নিয়ে চীন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি।

চীন তাইওয়ানকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দেখে; সে হিসেবে, তাইওয়ান চীনেরই অংশ।

অন্যদিকে তাইওয়ানের অনেক নাগরিকই স্বাধীনতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হোক বা না হোক তাদের স্বশাসিত দ্বীপটিকে পৃথক দেশ মনে করেন।

ইতিহাস যা বলে

অস্ট্রোনেশিয়ান আদিবাসী লোকজনই জানামতে প্রথম তাইওয়ানে বসতি স্থাপন করে। এই অস্ট্রোনেশিয়ানরা এখনকার দক্ষিণ চীন থেকেই সেখানে গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।

চীনের রেকর্ডে দ্বীপটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ২৩৯ খ্রিস্টাব্দে, সেসময় এক রাজা তাইওয়ানে একটি অভিযাত্রী দল পাঠান।

১৬২৪ থেকে ১৬৬১ সাল পর্যন্ত দ্বীপটি ডাচ উপনিবেশ ছিল, এরপর ১৬৮৩ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত এটি চীনের কিং রাজবংশের শাসনাধীনে ছিল।

সপ্তদশ শতক থেকে দলে দলে চীনারা তাইওয়ানে ভিড় জমাতে শুরু করে, বেশিরভাগই ছিল ফুজিয়ান প্রদেশের হোকলো ভাষাভাষী কিংবা গুয়াংডংয়ের হাক্কা ভাষাভাষী। তাদের বংশধররাই এখন স্বশাসিত দ্বীপের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী।

১৮৯৫ সালে জাপান প্রথম সিনো-জাপানিজ যুদ্ধে জেতার পর কিং রাজবংশ তাইওয়ানকে জাপানের হাতে তুলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান চীনের কাছ থেকে দখল করা অঞ্চলগুলো ছেড়ে দিলে বিশ্বযুদ্ধে জয়ী দলের অন্যতম চীন প্রজাতন্ত্র দ্বীপটির কর্তৃত্ব ফিরে পায়।

কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় চীনে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়, এবং এক পর্যায়ে মাও জে দংয়ের কমিউনিস্ট সেনারা চীনের তখনকার নেতা চিয়াং কাই-শেকের বাহিনীকে পরাজিত করে দেশের শাসনভার নিয়ে নেয়।

কুওমিনতাং সরকারের অবশিষ্টাংশ এবং তাদের সমর্থক, সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ লোক নিয়ে চিয়াং তাইওয়ানে পালিয়ে যান। এরা পরিচিতি পান চীনের মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দা হিসেবে; জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ হয়েও বহুদিন এই চীনা মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই তাইওয়ানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন।

তাইওয়ানে পালানো চিয়াং সেখানেই নির্বাসিত সরকার গঠন করে পরের ২৫ বছর তার নেতৃত্ব দেন। তার ছেলে চিয়াং চিং-কুয়ো ক্ষমতায় এসে শাসনকাঠামোকে আরও গণতান্ত্রিক করার পথ করে দেন। তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসনে বিরক্ত স্থানীয়দের তীব্র প্রতিরোধ এবং গণতন্ত্রের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে চাপের মুখে পড়েন।

তাইওয়ানের ‘গণতন্ত্রের জনক’ খ্যাত প্রেসিডেন্ট লি তেং-হুই সংবিধানে পরিবর্তন আনলে ২০০০ সালে কুওমিনতাং-এর বাইরে দ্বীপটির প্রথম প্রেসিডেন্ট হন চেন শুই-বিয়ান।

কারা তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দিয়েছে?

তাইওয়ান যে আসলে কী, তা নিয়ে মতভেদ ও বিভ্রান্তি আছে।

দ্বীপটির নিজস্ব সংবিধান, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতৃত্ব, সশস্ত্র বাহিনীতে তিন লাখের মতো সক্রিয় সদস্য রয়েছে।

কমিউনিস্টদের কাছে হারানো ভূমি ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় চিয়াং কাই-শেকের নির্বাসিত সরকার একসময় পুরো চীনেরই কর্তৃত্ব দাবি করতো। জাতিসংঘে চীনের আসনে তারাই প্রতিনিধিত্ব করতো, পশ্চিমা অনেক দেশই চীনের সরকার হিসেবে তাদেরই স্বীকৃতি দিয়েছিল।

মূল ভূখণ্ডের শতকোটি মানুষের প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে তাইপেতে থাকা অল্প কিছু মানুষের প্রতিনিধিদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে ১৯৭০-র দিক থেকে প্রশ্ন ওঠা শুরু করে।

১৯৭১ সালে জাতিসংঘও তাইওয়ানে থাকা চীন প্রজাতন্ত্রের সরকারের বদলে বেইজিংয়ের সরকারকে চীনের সরকার হিসেবে মেনে নেয়। ১৯৭৮ সাল থেকে তাদের চীন অর্থনীতিও উন্মুক্ত করা শুরু করে।

বিপুল বাণিজ্য সম্ভাবনা দেখে যুক্তরাষ্ট্র তার পরের বছরই বেইজিংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে।

এরপর থেকে তাইওয়ানে থাকা চীন প্রজাতন্ত্রের সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা কমতে কমতে এখন পনেরোরও নিচে নেমে গেছে।

যে কারণে, স্বাধীন রাষ্ট্রের সব ধরনের বৈশিষ্ট্য এবং চীনের থেকে আলাদা রাজনৈতিক ব্যবস্থা থাকার পরও তাইওয়ানের পরিচিতি অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

তাইওয়ান-চীনের সম্পর্ক

১৯৮০-র দিকে তাইওয়ান চীনে ভ্রমণ ও বিনিয়োগের নিয়মকানুন শিথিল করলে দুই পক্ষের সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করে। ১৯৯১ সালে স্বশাসিত দ্বীপটি জানায়, বেইজিংয়ের গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

চীন তখন তাইওয়ানকে তথাকথিত ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থার’ আওতায় একত্রিত হওয়ার প্রস্তাব দেয়, যে প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে হংকংও মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একত্রিত হয়।

তাইওয়ান ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, বেইজিংও তাইওয়ানের চীন প্রজাতন্ত্র সরকারকে অবৈধ বলতে থাকে। তার মধ্যেই দুইপক্ষ অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমিত পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল।

স্বাধীনতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া ডেমোক্রেটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টির (ডিপিপি) চেন শুই-বিয়ান ২০০০ সালে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বেইজিংয়ের চোখ কপালে উঠে যায়।

২০০৪ সালে চেন দ্বিতীয় মেয়াদে দ্বীপটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে পরের বছর চীন বিচ্ছিন্নতা-বিরোধী আইন পাস করে, যাতে তাইওয়ান চীন থেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ‘শান্তিপূর্ণ নয় এমন পন্থা’ অবলম্বনেও বেইজিংকে অধিকার দেওয়া হয়।

২০০৮ সালে কুওমিনতাংয়ের মা ইং-জেওউ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি নানান অর্থনৈতিক চুক্তি করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করেন।

আট বছর পর স্বাধীনতাপন্থি ডিপিপির সাই ইং-ওয়েন প্রেসিডেন্ট হলে পরিস্থিতি ফের বদলে যায়।

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কোম্পানির ওপর বেইজিং চাপের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে দুই পক্ষের বিবাদ আরও বেড়ে যায়। সেসময় বেইজিং কোম্পানিগুলোকে তাদের ওয়েবসাইটে তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে না দেখালে কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দেয়।

২০২০ সালে সাই রেকর্ড পরিমাণ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর যত দিন যাচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও বাড়ছে।

তাইওয়ানের কাছে স্বাধীনতা কতটা গুরুত্ব বহন করে?

রাজনৈতিক দূরত্ব নিরসনে অগ্রগতি খূব একটা দেখা না গেলেও, তাইওয়ান-চীনের মধ্যে বাণিজ্য দিন দিনই বেড়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের মে পর্যন্ত চীনে তাইওয়ানের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৯ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে তাইওয়ানি কর্মকর্তাদের হিসাব বলছে।

দ্বীপটির অনেক লোকজনই চীনের ওপর তাদের অর্থনীতির নির্ভরশীলতা নিয়ে চিন্তিত। অন্যরা আবার মনে করেন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক যত ভালো হবে, চীনের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও তত কমবে। কেননা চীনকে তখন সামরিক পদক্ষেপের কারণে নিজের অর্থনীতির ক্ষতিটাও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিতর্কিত এক বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালে তাইওয়ানে ‘সূর্যমুখী আন্দোলন’ও হয়েছে; দ্বীপটির ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরোধিতায় সেবার শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকর্মীরা তাইওয়ানের পার্লামেন্ট দখলেও নিয়ে নিয়েছিল।

মূলত তাইওয়ানে এখন যারা ক্ষমতাসীন সেই ডিপিপিই তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার পক্ষে, অন্যদিকে কুওমিনতাং বা কেএমটি চায় চীনের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে।

তবে বেশিরভাগ তাইওয়ানি এ দুটোর কোনোটিই চান না, তারা বরং এখনকার মতোই থাকতে চান; যেখানে, তাইওয়ান না স্বাধীন, না পরাধীন।

চলতি বছরের জুনে হওয়া এক জরিপ বলছে, মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশ তাইওয়ানি নাগরিক যত দ্রুত সম্ভব চীন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা হতে চান, অন্যদিকে মাত্র এক দশমিক ৩ শতাংশ চান পারলে এখনই মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একত্রিত হতে। বাকিরা ‘যেমনটা আছে, তেমন রাখা’র পক্ষে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কেন?

ওয়াশিংটন বলছে, তারা ‘এক চীন’ নীতিতে অটল, যাতে বেইজিংয়ের সরকারকেই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

তাদের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কও বেইজিংয়ের সঙ্গে, তাইপের সঙ্গে নয়।

অন্যদিকে তাইওয়ান আক্রান্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতিও আছে তাদের। যে কারণে তারা তাইওয়ানকে নানান সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। চীন তাইওয়ানে আক্রমণ করে বসলে তা ‘গভীর উদ্বেগের’ হবে বলে সতর্কও করেছে তারা।

স্বশাসিত দ্বীপটি আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সুরক্ষায় সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে কিনা, এ বছরের মে মাসে এমন এক প্রশ্নের জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। পরে তড়িঘড়ি হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক চীন’ নীতির কোনো নড়চড় হয়নি।

তাইওয়ান নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পষ্ট হচ্ছে। তাইপেকে ওয়াশিংটনের যে কোনো সহযোগিতার নিন্দা জানিয়ে যাচ্ছে বেইজিং; বাইডেন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা অঞ্চলে চীনা জঙ্গিবিমানের অনুপ্রবেশের ঘটনাও বেড়েছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক