Published : 13 Aug 2025, 08:22 AM
দক্ষিণ চীনের ইয়ুননান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে বলা হয় ‘বসন্তের নগরী’; চোখ মেললেই দেখা মিলে নানা প্রজাতির গাছপালা আর রঙিন ফুল। সেখানকার দৌনান ফুল বাজারই হচ্ছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম তাজা ফুলের বাজার।
এ বাজারেই রয়েছে চীনের একমাত্র ফুল নিলাম কেন্দ্র- কুনমিং ইন্টারন্যাশনাল ফ্লোরা অকশন ট্রেডিং সেন্টার (কেআইএফএ)।
কেন্দ্রের ইন্টারন্যাশনাল রিসেপশন বিভাগের পরিচালক লি শিয়ান বলেন, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রটি জাতীয় উন্নয়ন কমিশন ও ইয়ুননান প্রাদেশিক সরকার যৌথভাবে পরিচালনা করে থাকে। কেন্দ্রটি এখন প্রদেশের ফুল শিল্পের ‘ইঞ্জিন রুম’ হিসেবে পরিচিত।
ভৌগোলিক কারণেই ইয়ুননান প্রদেশে ফুল বেশি উৎপাদিত হয়। আধুনিক প্রযুক্তিতে সেখানে চাষ এক হাজারেরও বেশি প্রজাতির ফুল।
চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীনা সরকারের আমন্ত্রণে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ৬ থেকে ৯ অগাস্ট কুনমিং সফর করে। প্রতিনিধি দলটি সেখানকার ফুল নিলাম কেন্দ্র ও বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলকে নিলাম কেন্দ্রের বিভিন্ন সেবা ঘুরিয়ে দেখান লি শিয়ান।
ইয়ুননান প্রদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কেন্দ্রের মাধ্যমে চীনের ফুল বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং এশিয়ার বৃহত্ অংশের ফুল বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। এখানে নিলাম হওয়া ফুল চীনের প্রধান শহরগুলোতে বিক্রি হয় এবং রপ্তানি করা হয় থাইল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ ৪০টিরও বেশি দেশে।

নিলাম প্রস্তুতি যেভাবে
লি শিয়ান জানালেন, প্রতিদিন বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ইয়ুননানের বিভিন্ন এলাকা ও পাশের প্রদেশ থেকে বিশেষ রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে ফুল এসে পৌঁছায় কুনমিং ফ্লোরা অকশন সেন্টারে। উৎপাদকরা সরবরাহ করেন গোলাপ, কার্নেশন, লিলি, জিপসোফিলা, গেরবেরা, ক্যালা লিলি, রজনীগন্ধা, গাঁদাসহ নানা ফুল।
ফুল পৌঁছানোর পরপরই শুরু হয় কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও গ্রেডিং প্রক্রিয়া। কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, দৃঢ়তা, ফুলের আকার, পরিপক্বতা, রং, সতেজতা ও ত্রুটিমুক্ততা পরীক্ষা করা হয়। এরপর ফুলগুলোকে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’- এমন নানা গ্রেডে ভাগ করা হয়, যেখানে ‘এ’ গ্রেড সর্বোচ্চ মান নির্দেশ করে, মেলে সর্বোচ্চ দাম।
‘এ’ গ্রেডের ফুলের দাম সম্পর্কে ধারণা চাইলে লি শিয়ান বললেন, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৫ টাকা।
তিনি জানান, স্বয়ংক্রিয় সর্টিং মেশিনের সাহায্যে ফুলের প্রজাতি, রং, দৈর্ঘ্য ও গ্রেড অনুযায়ী সাজিয়ে নিলামের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

নিলাম প্রক্রিয়া
কুনমিং ফুল নিলাম কেন্দ্রের দৃশ্য অনেকটা পুঁজিবাজারের মতন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ ফুল কেন্দ্র সরগরম হতে থাকে দুপুরের দিক থেকে।
লি শিয়ান বলেন, “এখানে নিলাম সম্পূর্ণ ডিজিটাল, দ্রুতগতির ও স্বচ্ছ। সাধারণ ফুল নিলামে সীমিত দরদাতা, ধীর লেনদেন ও দূরবর্তী ক্রেতাদের অংশগ্রহণ সীমিত হলেও কুনমিংয়ে প্রতি ৪ সেকেন্ডে একটি লেনদেন সম্পন্ন হয়।
“৯০০ আসনের হাই-টেক অকশন হলে কিংবা কয়েকশ কিলোমিটার দূরের বেইজিং বা কুয়াংচৌ থেকে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল প্লাটটফর্মে ক্রেতারা বিড করতে পারেন।”
ডাচ পদ্ধতিতে স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় নিলাম শুরু হয়; যেখানে দাম উচ্চ থেকে নিম্নগামী হয়। বড় পর্দায় ফুলের ছবি, পরিমাণ, গ্রেড, উৎপাদকের কোড প্রদর্শিত হয়। হাজারো ক্রেতা—স্থানীয় পাইকার, আন্তর্জাতিক রপ্তানিকারক, ফুল দোকানি, প্রসেসিং কোম্পানি ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান নিলামে অংশ নিয়ে থাকে।
রিমোট অ্যাকসেস সিস্টেমের মাধ্যমে চীনের যেকোনো প্রান্তের ব্যবসায়ী নিলামে অংশগ্রহণ করতে পারে। কুনমিং নিলাম কেন্দ্রের অংশীদার প্রতিষ্ঠান বেইজিং ফ্লাওয়ার ট্রেডিং সেন্টারের সহায়তায় ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
তাৎক্ষণিক অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হয় ‘হুয়াশেংবেও’ অ্যাপের মাধ্যমে, যেখানে অর্থ স্থানান্তর ও লেনদের তথ্য নথিবদ্ধ থাকে।

সরবরাহ ব্যবস্থা
কুনমিং নিলাম কেন্দ্রের অবকাঠামো বিশাল ও আধুনিক; রয়েছে বৃহৎ রিসেপশন ও স্টোরেজ হ্যাঙ্গার, স্বয়ংক্রিয় গ্রেডিং লাইন, নিলাম হল, প্যাকিং স্টেশন, কোল্ড স্টোরেজ, ডেটা সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম।
অনলাইন নিলাম ব্যবস্থা ও মোবাইল অ্যাপ ক্রেতা ও উৎপাদককে রিয়েল-টাইম লেনদেন, বাজারদর দেখা ও লট ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা দেয়। পরিবহনকালে ফুলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সতেজতা নিশ্চিত করে আইওটি সেন্সর।
নিলাম শেষে ক্রেতার নাম ও গন্তব্য অনুযায়ী ফুল সাজিয়ে প্যাকিং জোনে পাঠানো হয়। উন্নত কোল্ড চেইন সুবিধা- যেমন কুলিং রুম, রেফ্রিজারেটেড ট্রাক ও কন্টেইনার—ফুলের সতেজতা বজায় রাখে।
কেন্দ্রের বিগ ডেটা ও এআইনির্ভর লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এমনভাবে তৈরি যে- তা সম্ভাব্য আঞ্চলিক চাহিদা ঠিক করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্যাকেজিং সারতে পারে। কোল্ড চেইন প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অনেক চালান বিমান ও উচ্চগতির ট্রেনেও পাঠানো হয়। ফলে দুপুরে বিক্রি হওয়া গোলাপ পরদিনই সাংহাই, টোকিও বা সিডনিতে সতেজ অবস্থায় পৌঁছে যায়।

জীবিকা লাখ লাখ মানুষের
প্রায় ২৫ হাজারের বেশি উৎপাদক—ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় চাষি এবং সমবায় সমিতি ফুল সরবরাহ করে এই কেন্দ্রে। সেখানে নিবন্ধিত ক্রেতা রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার, যার মধ্যে আছে স্থানীয় পাইকার, আন্তর্জাতিক রপ্তানিকারক, প্রসেসিং কোম্পানি ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান।
ইয়ুননানে উৎপাদিত মোট ফুলের ৮০ শতাংশ এবং চীনের মোট তাজা ফুলের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে দৌনান এলাকা থেকে, যা এই কেন্দ্রের মাধ্যমে বিক্রি হয়। চাষিরা প্রতিদিন ৮০০–১,০০০ টন ফুল পাঠিয়ে থাকে।
সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া লিখেছে, চীনে ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে ফুল চাষাবাদ হয় এবং এ শিল্পের সঙ্গে ৫০ লাখ মানুষ জড়িত। দৌনান ফুল বাজারে গত বছর লেনদেন হয়েছে ১৪ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডাঁটা। এর আর্থিক মূল্য ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশেরও রয়েছে সম্ভাবনা
কুনমিং শহরের সঙ্গে বাংলাদেশের আবহাওয়ার বেশ মিল রয়েছে। যশোর জেলার গদখালী, ঝিকরগাছাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ ফুল উৎপাদন হলেও মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাব এবং দুর্বল বিপণন ব্যবস্থার কারণে কৃষকরা প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়েন।
এসব সুবিধা নিশ্চিত করে বাংলাদেশরও যে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেই সম্ভাবনার কথা বললেন সফররত প্রতিনিধি দলের প্রধান আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।

প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব বলেন, “কুনমিংয়ের প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণ করে বাংলাদেশেও একই ধরনের আধুনিক ফুলের বাজার গড়ে তোলা সম্ভব। ডিজিটাল মার্কেটিং কৌশল ব্যবহার করে দেশীয় ও আঞ্চলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির নতুন দ্বার খুলে যাবে। এতে ফুল চাষের মাধ্যমে দেশের বহু মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারবেন।”
আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, চীন বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহায়তা দিতে আগ্রহী। এ সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কুনমিং ফুল নিলাম কেন্দ্রের লি শিয়ান বলেন, “এখান থেকে সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ফুল বিক্রি করা হয় না; প্রথমে চীনা ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি দামে বিক্রি হয়, পরে তারা বিদেশে রপ্তানি করেন।
“বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা চাইলে বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে এই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।”