Published : 25 Feb 2026, 01:10 PM
নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে গত বছরের সেপ্টেম্বরে হওয়া ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ৭৭ জন নিহত ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর র্যাপার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া বালেন্দ্র শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার লাখ লাখ ভক্তের উদ্দেশ্যে স্বল্প ভাষায় সোজাসাপ্টা এক বার্তা দিয়েছিলেন।
“প্রিয় জেন-জি, তোমাদের হত্যাকারীর পদত্যাগ এসেছে। এখন তোমাদের প্রজন্মকে দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে। প্রস্তুত হও,” বালেন নামে বেশি পরিচিত ৩৫ বছর বয়সী কাঠমান্ডুর মেয়র তখন এমনটাই লিখেছিলেন।
তার পাঁচ মাস পর, ২০২২ সালে রাজধানীর মেয়র হয়ে রাজনীতির মঞ্চে হাতেখড়ি নেওয়া সেই বালেন্দ্রকেই এখন আগামী ৫ মার্চ হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী মনে হচ্ছে, লিখেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
নেপালে এমন কোনো জনমত জরিপ নেই যার ওপর আস্থা রাখা যায়। তবে চারজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো দেশটির চিরাচরিত রাজনৈতিক অভিজাতদের একপাশে ঠেলে দিয়ে বালেনকেই প্রধানমন্ত্রী পদে এগিয়ে রাখছে।
“বালেন শাহ এতই জনপ্রিয় যে কাঠমান্ডুতে আসা অনেক বাসের গায়ে ‘বালেনের শহরে যাচ্ছি’ লেখা স্টিকার থাকে,” বলেছেন কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ বিপীন অধিকারী।
শেষ পর্যন্ত বালেন শাহ যদি ক্ষমতায় বসতে পারেন, তাহলে সেটা হবে এমন এক মানুষের নাটকীয় উত্থান যিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী র্যাপ গানের মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি কেড়ে পরে সেই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে রাজনীতির উচ্চাসনে পৌঁছেছেন।
একইসঙ্গে তা চীন-ভারতের মাঝে, হিমালয়ের কোলে থাকা ছোট দেশটির রাজনীতির অনেক হিসাব-নিকাশও পাল্টে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অল্প কয়েকটি দলই প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
এর মধ্যে আছে চীনঘেঁষা ওলির কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট)। আর আছে মধ্যপন্থি নেপালি কংগ্রেস, যাদেরকে ভারতঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বালেনের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিও (আরএসপি) নতুন মধ্যপন্থি দল। যারা দুই বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে ‘ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র সম্পর্ক’ বজায় রাখবে বলে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে।
‘এত সহজ হবে না’
দেশজুড়ে বালেনের পরিচিতির পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রেখেছে মেয়র হিসেবে তার করা বেশ কিছু কাজ। রাজধানীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ নগর অবকাঠামোর উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো পরিষেবা নিশ্চিতে মনোযোগী হয়েছিলেন।
রাস্তার হকারদের মালামাল কেড়ে নেওয়া, বস্তি উচ্ছেদের চেষ্টাসহ নানা কারণে তার বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অনেকের ব্যাপক সমালোচনাও ছিল।
সাধারণ নির্বাচনে লড়ার আকাঙ্ক্ষায় বালেন্দ্র এ বছরের জানুয়ারিতে মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেন। রয়টার্স তার সাক্ষাৎকার নিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও তিনি সাড়া দেননি; বার্তা সংস্থাটি তাকে ইমেইলে কিছু প্রশ্ন পাঠিয়েছিল, সেগুলোরও জবাব মেলেনি।
আগের প্রজন্মের অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের মতো না হয়ে তিনি এমনকী নেপালের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকেও মোটাদাগে এড়িয়েই চলছেন।
এর বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ফেইসবুকেই তার ৩৫ লাখের বেশি অনুসারী, এই প্ল্যাটফর্ম তাকে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের সুযোগ করে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তার ফেইসবুকজুড়ে প্রচারণার নানান ঢঙের ছবি আসছে, যার প্রায় সবগুলোতেই তাকে কালো রঙের সানগ্লাস ও কালো-সাদা দাঁড়িতে দেখা যাচ্ছে।
“বালেনের ক্ষেত্রে বিশেষত্ব হচ্ছে, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ছোট বার্তার মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সংযোগ রাখছেন, তবে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পর তার পথ এতটা সহজ হবে না,” বলেছেন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিশ্লেষক পুরঞ্জন আচার্য।
‘আমাকে বলতে দিন’
প্রথাগত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক পিতা ও গৃহিনী মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া বালেন ছোটবেলা থেকেই কবিতার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, যা পরবর্তীতে র্যাপ সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসায় রূপ নেয়। তার ওপর টুপাক শাকুর ও কার্টিস ‘৫০ সেন্ট’ জ্যাকসনের মতো আমেরিকান শিল্পীদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে তার এক সহকারী জানিয়েছেন।
নেপালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি দক্ষিণ ভারতে কাঠামাগত প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে যান, অবশ্য তার আগেই তিনি নিজের দেশে র্যাপ তারকা হিসেবে খ্যাতি পেয়ে গেছেন।
প্রায় ৩ কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালের ২০ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যে দিনযাপন করায় শাসক শ্রেণিকে তাক করা বালেনের গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত বালেনের অন্যতম সুপরিচিত গান ‘বলিদান’ ইউটিউবে এরই মধ্যে এক কোটি ২০ লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে। ওই গানের কথায় আছে, “আমাকে বলতে দিন, স্যার, এটা অপরাধ নয়।”
কাঠমান্ডুতে মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন। সেসময় তার নির্বাচনী স্লোগান ছিল, “এখন পরিবর্তনের সময়।” নির্বাচনে তিনি বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হন।
গত বছরের ডিসেম্বরে বালেন্দ্র শাহ টিভি উপস্থাপক থেকে রাজনীতিক হওয়া রবি লামিছানের আরএসপিতে যোগ দিয়েই দলের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হয়ে যান।
আরএসপি তাদের ইশতেহারে ১২ লাখ চাকরি সৃষ্টি এবং বেকারত্ব ও কম মজুরির কারণে দেশ ছেড়ে অন্যত্র অভিবাসী হতে বাধ্য হওয়া বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
তারা নেপালের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৪৭ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার ডলার করা, অর্থনীতি দ্বিগুণ করে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ১০ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়া এবং সমগ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যবীমাসহ সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাও মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই।
এসব প্রতিশ্রুতি পূরণ ও জাতীয় পর্যায়ে তার সফলতার অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি আশেপাশে কী পরিমাণ মেধাবীদের জড়ো করতে পারেন তার ওপর, যারা নেপালের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করার সাহস রাখবে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
“দরকার হবে দল, বিশেষজ্ঞ ও সমর্থন। এখনকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তিনি কাজ করতে পারবেন না, উল্টো তাকে ঘুণে ধরা কাঠের মতো খেয়ে ফেলা হবে,” শঙ্কা পুরঞ্জন আচার্যের।
লিংক-
মার্চের নির্বাচনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হতে লড়বেন কাঠমান্ডুর মেয়র