২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতের গুহায় খুঁজে পাওয়া রুশ নারী ও দুই শিশুকে ঘিরে রহস্য

তারা কবে ভারতে ঢুকেছে, কতদিন ধরে আছে তা নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নেমে তাদের বলা কাহিনীর টুকরা টুকরা অংশ জোড়া দিয়ে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে পুলিশ।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Jul 2025, 12:06 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:24 PM

দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের এক গহীন জঙ্গলের গুহা থেকে এক রাশিয়ান নারী ও তার দুই মেয়েকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা কবে ভারতে প্রবেশ করেছে, কতদিন ধরে আছে তা বোঝার চেষ্টা চলছে।

বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নেমে এই রুশ মা ও শিশুদের গল্পের টুকরা টুকরা অংশ জোড়া দিয়ে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে ভারতের পুলিশ।

৪০ বছর বয়সী রুশ নারী নিনা কুটিনা ও তার ছয় এবং পাঁচ বছর বয়সী দুই মেয়েকে গত ৯ জুলাই গোয়ার সীমান্তবর্তী গোকর্ণার রামতীর্থ পাহাড় এলাকায় পুলিশ নিয়মিত টহলের সময় খুঁজে পায়।

কর্ণাটকের উত্তর কন্নড় জেলার পুলিশ সুপার এম নারায়ণ বলেন, “এই এলাকাটি বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও বর্ষাকালে এখানে ভূমিধস ও সাপের উপদ্রবের কারণে এটি ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই টহল বাড়ানো হয়েছিল।”

পুলিশ জানায়, পাহাড়ি এলাকায় রঙিন কাপড় শুকাতে দেখে তারা সন্দেহ হলে নিচে নামে এবং সেখানে একটি গুহার প্রবেশপথে ঝুলানো শাড়ির পেছনে এক সোনালি চুলের ছোট্ট শিশুকে দৌড়াতে দেখে থমকে যায়। এরপর ভিতরে গিয়ে তারা কুটিনা ও তার আরেক শিশুকে দেখতে পায়।

গুহার ভিতরে তাদের যা কিছু ছিল, তা খুবই সামান্য — প্লাস্টিকের চাটাই, কিছু জামাকাপড়, ইনস্ট্যান্ট নুডলস আর অল্প কিছু খাবারদাবার।

তবে পুলিশ ভিডিওতে দেখে, শিশুরা রঙিন ভারতীয় পোশাকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছে। পুলিশ বলছে, তারা গুহায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই ছিল। 

কুটিনা তার জীবনযাপনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, তিনি এবং তার মেয়েরা গুহায় সুখেই ছিলেন। প্রকৃতি স্বাস্থ্য ভাল রেখেছে। তিনি বলেন, “প্রাণীরা আমাদের বন্ধু। বিপজ্জনক তো মানুষই।”

কিন্তু গুহায় তাদের সন্ধান মেলার পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি, কীভাবে তারা সাপ ও বন্য প্রাণীতে ভরা ওই জঙ্গলে গেলেন, কত দিন ধরে সেখানে ছিলেন এবং আদতে তারা কারা।

রাশিয়ান, তবে ১৫ বছর রাশিয়ায় ছিলেন না:

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নিনা কুটিনা ভারতে অবস্থান করার কোনও বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। 

ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস এর এক কর্মকর্তা বিবিসি-কে জানান, কুটিনা ও তার সন্তানদেরকে এখন বেঙ্গালুরুতে একটি বিদেশিদের আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে। শিগগিরই তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

তিনি জানান, তারা চেন্নাইয়ে রুশ কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিবিসিও এ বিষয়ে দিল্লিতে রুশ দূতাবাসে লিখিতভাবে জানতে চেয়েছে, তবে এখনও সাড়া মেলেনি।

ভারতের সংবাদ সংস্থা এএনআই ও পিটিআইকে দেওয়া ভিডিও সাক্ষাৎকারে কুটিনা বলেন, তিনি রাশিয়ায় জন্মালেও গত ১৫ বছর সেখানে ছিলেন না। তিনি কোসটরিকা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ইউক্রেনসহ অন্তত ২০টি দেশে ঘুরেছেন।

তার চার সন্তান রয়েছে জানিয়ে কুটিনা বলেন, তাদের বয়স ২০ বছর থেকে ৫ বছর। সবচেয়ে বড় ছেলেটির ২০২৩ সালে গোয়ায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। 

ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, কুটিনার দ্বিতীয় সন্তান, ১১ বছর বয়সী এক ছেলে রাশিয়ায় রয়েছে। তারা রুশ কনস্যুলেটকে এই সন্তানের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।

মঙ্গলবার রাতে ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস জানায়, তারা কুটিনার মেয়েদের বাবার পরিচয় শনাক্ত করেছে। তার নাম ড্রোর গোল্ডস্টেইন। তিনি একজন ইসরায়েলি ব্যবসায়ী। বর্তমানে ভারতে আছেন।

ভারতীয় কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং কুটিনা ও তার মেয়েদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর খরচ বহনে তাকে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন।

বুধবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গোল্ডস্টেইন বলেন, কুটিনা তাকে না জানিয়ে গোয়া চলে গিয়েছিলেন। তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন।

গোল্ডস্টেইন আরও বলেন, তিনি তার মেয়েদের যৌথ অভিভাবকত্ব চান এবং সরকার যেন তাদেরকে রাশিয়ায় পাঠাতে না পারে সেজন্য সবকিছু করবেন।

কুটিনা কবে ভারতে যান?

এ বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। পুলিশ বলছে, কুটিনা তাদের বলেছেন যে, তারা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে গুহাটিতে থাকছেন এবং এক সপ্তাহ আগে স্থানীয় একটি দোকান থেকে সবজি ও ইনস্ট্যান্ট নুডলসসহ কিছু মুদিপণ্য কিনেছিলেন।

কুটিনা আরও বলেন, তিনি কর্ণাটকে গেছেন গোয়া থেকে। গোয়াতেও তিনি গুহায় বাস করতেন। তার এক মেয়েও গোয়ার গুহায় জন্ম নিয়েছিল।

বুধবার পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুটিনা অভিযোগ করেন, তাদেরকে যেখানে আটক রাখা হয়েছে সেটি 'জেলের মতো'। তিনি বলেন, 'আমরা খুব ভাল জায়গায় থাকতাম। কিন্তু এখন আমরা একা থাকতে পারি না। বাইরে যেতে পারি না। এখানে খুব নোংরা, আর খাবারও তেমন নেই।”

কুটিনা ঠিক কবে এবং কীভাবে ভারতে গেলেন তার স্পষ্ট কোনও তথ্য এখনও নেই। পুলিশ জানায়, কুটিনা বলেছেন তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে। 

তবে তার জিনিসপত্রের মধ্যে একটি পুরোনো পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যায় তিনি ২০১৬ সালের অক্টোবরে ব্যবসা ভিসায় ভারতে ঢুকেছিলেন এবং ২০১৭ সালের এপ্রিলে তা শেষ হয়। 

কুটিনা তার ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভারতে অবৈধভাবে থাকেন। গোয়ার ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস তাকে ভারতের বাইরে যাওয়ার জন্য 'এক্সিট পারমিট' ইস্যু করে। 

তার পাসপোর্টের ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্প থেকে জানা যায়, তিনি ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল নেপালে যান এবং তিন মাস পর বের হন। তারপর তিনি কোথায় গিয়েছিলেন তা স্পষ্ট নয়।

তবে কুটিনা এএনআইকে বলেছেন, তিনি ২০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে অন্তত চারটি দেশে তিনি গেছেন ২০১৮ সালে ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর।

 ভারতে তিনি পরে আবার কখন ফিরেছিলেন সেটি স্পষ্ট নয়। যদিও কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সম্ভবত ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ফিরেছিলেন ভারতে। 

পিটিআইকে কুটিনা বলেন, “ভারতকে ভালোবাসি বলেই এখানে ফিরেছি।” কুটিনা স্বীকার করেন যে, তার ভিসার মেয়াদ কয়েক মাস আগে শেষ হয়েছে। তবে তিনি বলেন, ছেলের মৃত্যুর শোকের কারণেই ভিসা নবায়ন করা নিয়ে চিন্তা করতে পারেননি।

গুহায় থাকার কারণ?

গুহায় পাওয়া গিয়েছিল একটি হিন্দু দেবতা পাণ্ডুরঙ্গা (ভিটঠল)-এর মূর্তি। অনেকে ধারণা করেন, তিনি আধ্যাত্মিক চর্চার জন্য এখানে এসেছিলেন। তবে এএনআই-কে কুটিনা বলেন, “এটা আত্মিকতার জন্য নয়। আমরা শুধু প্রকৃতিকে ভালোবাসি, কারণ প্রকৃতি আমাদের সুস্থ রাখে।”

তিনি আরও বলেন, “আমার গুহায় থাকার অভিজ্ঞতা অনেক, আমরা জঙ্গলে থাকতাম, ঝরনায় সাঁতার কাটতাম, শিল্প চর্চা করতাম, খাবার রান্না করতাম — মেয়ে দুটো খুব খুশি ছিল।”

কুটিনা যে গুহাটি বেছে নিয়েছিলেন তা 'খুব বড় ও সুন্দর'। গুহার কাছেই একটি গ্রাম ছিল। তাই তিনি খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারতেন।

কুটিনা এএনআই-কে বলেন, “আমরা সেখানে মরতে যাইনি। আমি আমার সন্তানদের জঙ্গলে মরে যাওয়ার জন্য নিয়ে যাইনি। তারা খুব খুশি ছিল। ঝর্ণায় সাঁতার কাটত, শোয়ার জন্য খুব ভাল জায়গা ছিল।

তারা শিল্পকলা শিখত। আমরা মাটি দিয়ে কিছু বানাতাম, ছবি আঁকতাম, ভাল খেতাম। আমি খুব সুস্বাদু খাবার রান্না করতাম।” বনে বাস করা সন্তানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার ধারণা অস্বীকার করেছেন কুটিনা। 

তিনি বলেন, “আমরা সেখানে থাকার সময়, হ্যাঁ, কিছু সাপ দেখেছি। লোকজন যেমন: তাদের বাড়ির রান্নাঘর বা টয়লেটে সাপ দেখতে পায়- এটি তেমনই একটি বিষয়।