Published : 11 Oct 2025, 04:30 PM
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষিত হওয়ার কিছু সময় পর থেকেই তুমুল সমালোচনার মুখে রয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো।
নোবেল কমিটি তাকে ‘শান্তির অগ্রদূত’ আখ্যা দিয়েছে; অথচ এই মাচাদো ইসরায়েল ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘোরতর সমর্থক, যা প্রকারান্তরে তাকে ‘গাজায় বোমাবর্ষণ ও গণহত্যার সাথী’ বানিয়েছে; এমনকী তিনি নিজ দেশের সরকার উৎখাতে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপও চেয়েছেন।
এসবই তাকে ‘শান্তি পুরস্কারের অযোগ্য’ এবং নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করেছে বলে মত সমালোচকদের।
এনডিটিভি লিখেছে, ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থিদের আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মাচাদো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাগরিক সাহসের শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। নোবেল পুরস্কার কমিটি শুক্রবার লাতিনের দেশটিতে গণতন্ত্রের প্রসারে কাজ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে।
এর কয়েক ঘণ্টা পরই হোয়াইট হাউস এ ঘোষণার সমালোচনা করে বলে, নোবেল কমিটি ‘শান্তির ওপরে রাজনীতিকে স্থান দিয়েছে’। বিশ্বব্যাপী ৬-৭টি যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার পাইয়ে দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর তাদের এ মন্তব্য আসে।
মাচাদো পরে তার পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টও পরে জানান, মাচাদো পুরস্কার পাওয়ায় তিনি খুশি।
কেন মাচাদোকে বেছে নিল নোবেল কমিটি
নোবেল কমিটি বলছে, মাচাদো শান্তির অগ্রদূত যিনি ক্রমবর্ধমান অন্ধকারেও ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্রের শিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন।
কমিটির প্রধান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস মাচাদোকে একধা বহুধাবিভক্ত ভেনেজুয়েলার ‘রাজনৈতিক বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নারী’ আখ্যা দিয়েছেন।
এ শান্তি পুরস্কারজয়ী দেখিয়েছেন গণতন্ত্র ও শান্তির পন্থা এক। তিনি এমন এক ভবিষ্যতের আশা প্রকাশ করেন, যেখানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং তাদের কণ্ঠ শোনা যাবে। তারা শান্তিতে বাঁচার স্বাধীনতা পাবে, বলেছে নোবেল কমিটি।
“গত কয়েক বছর ধরে মাচাদোকে বাধ্য হয়ে আত্মগোপনে থাকতে হচ্ছে। জীবন ভয়াবহ হুমকির মুখে থাকার পরও তিনি দেশেই আছেন, যা লাখ লাখ মানুষকে উদ্দীপ্ত করেছে। যখন কর্তৃত্ববাদীরা ক্ষমতা দখলে নেয়, তখন মুক্তির সাহসী রক্ষক যারা উঠে দাঁড়ায় ও প্রতিরোধ করে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ,” ঘোষণায় বলেছেন ফ্রিডনেস।
যেসব কারণে মাচাদোর সমালোচনা
সমালোচকরা ভেনেজুয়েলার এ রাজনীতিকের পুরনো সব পোস্ট হাজির করছেন যেখানে মাচাদো ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির প্রতি তার অকুষ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের প্রতি সংহতি জানানো এই নারী অবশ্য কোনো পোস্টে ফিলিস্তিনে হত্যাকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সরাসরি কিছু লেখেননি। অবশ্য তিনি বারবার যার প্রশংসা করেছেন, সেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।
বছরের পর বছর ধরে তার পোস্টে বোঝা যাচ্ছে যে তিনি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র। তিনি একসময় বলেছিলেন, “ভেনেজুয়েলার সংগ্রামই ইসরায়েলের সংগ্রাম।”
তারও দুইবছর পর তিনি ইসরায়েলকে ‘স্বাধীনতার সত্যিকারের মিত্র’ অভিহিত করেছিলেন। এমনকী ক্ষমতায় গেলে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
নরওয়ের আইনপ্রণেতা বিয়র্নার মক্সনেস বলছেন, মাচাদো ২০২০ সালে ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির সঙ্গে সহযোগিতামূলক দলিলে স্বাক্ষর করেছেন।
লিকুদ পার্টি ‘গাজায় গণহত্যার’ জন্য দায়ী, যে কারণে এবারের পুরস্কার নোবেলের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়নি, বলেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম নাগরিক অধিকারভিত্তিক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস ভেনেজুয়েলার মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ‘অচিন্তনীয় সিদ্ধান্তের’ কড়া সমালোচনা করেছে।
ভেনেজুয়েলার ‘লৌহ মানবী’ মাচাদো: অন্ধকারেও যিনি জ্বেলে রেখেছেন ‘গণতন্ত্রের শিখা’
দীর্ঘ অনলাইন পোস্টে তারা নোবেল কমিটিকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে, কারণ মাচাদোকে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে ‘তারা তাদের সুনাম নষ্ট করেছে’।
“নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির বরং এমন একজন স্বীকৃতি দেওয়া উচিত যিনি নৈতিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন এবং সাহসের সঙ্গে সকল মানুষের ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করেছেন, যেমন সেই ছাত্র, সাংবাদিক, কর্মী বা চিকিৎসক যারা আমাদের সময়ের অন্যতম বড় অপরাধ গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়তে নিজের কর্মজীবন ও প্রাণকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন,” বলেছে তারা।
ভেনেজুয়েলায় বিদেশি হস্তক্ষেপ চাওয়া
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর শাসনের বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় বিদেশি হস্তক্ষেপ চাওয়ার কারণেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন মাচাদো।
২০১৮ সালে তিনি তার দেশের শাসনব্যবস্থা বদলাতে ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনার সমর্থন চেয়ে চিঠিও লিখেছিলেন।
সেই চিঠির কপি অনলাইলেও দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, “মাদক চোরাকারবার ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ভেনেজুয়েলার অপরাধী শাসনব্যবস্থা ধ্বংসে আজ আমি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মরিসিও মাক্রি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছে চিঠি পাঠাচ্ছি, যেন তারা তাদের শক্তি ও প্রভাবকে এ কাজে লাগাতে পারেন।”