Published : 22 Jan 2026, 12:25 PM
গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ পেতে শুল্ক আরোপের হুমকি থেকে হুট করে সরে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আর্কটিকের দ্বীপটিতে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন এবং স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ অঞ্চলটি নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব নিরসনে একটি চুক্তির সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নেটোর দুই সদস্যের মধ্যে ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকা ট্রান্স-আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটটির ভবিষ্যৎকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
গ্রিনল্যান্ড পেতে ট্রাম্পের হুমকি-ধামকি একদিকে মিত্রদের মধ্যে অবিশ্বাস ও অস্বস্তি তৈরি করছিল, পাশাপাশি তা বিশ্বব্যাপী নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকিও প্রকট করে তুলেছিল।
কিন্তু সুইজারল্যান্ডের দাভোসে নেমে ট্রাম্পকে ‘আপাতত’ পিছু হটতে দেখা গেল বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সুইস আলপাইন রিসোর্টে নেটো মহাসচিব মার্ক রুটের বৈঠক শেষে তিনি বলেছেন, ৫৭ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে পশ্চিমা আর্কটিক মিত্ররা একটি নতুন চুক্তিতে উপনীত হতে পারে যা তার ‘গোল্ডেন-ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের সুযোগ করে দেবে; পাশাপাশি আর্কটিকে চীন-রাশিয়ার প্রভাব কমিয়ে আনবে।
“এটি এমন এক চুক্তি যা সবাইকে খুশি করবে। এটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি। এটি সবাইকে সত্যিকারের ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও খনিজের ক্ষেত্রে।
“এটি চিরস্থায়ী চুক্তি,” বলেছেন ট্রাম্প।
রুটে পরে জানান, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের সঙ্গে থাকবে কিনা এই বিষয়টি ট্রাম্পের সঙ্গে তার আলাপে ওঠেইনি।
“প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার আজ রাতের আলোচনায় এই ইস্যুটি আসেইনি। আর্কটিকে এখন অনেক কিছু বদলাচ্ছে এবং চীনা ও রুশরা ক্রমশ সক্রিয় হচ্ছে। বিশাল ওই অঞ্চলটি ঠিকঠাক সুরক্ষিত রাখতে আমরা কী করতে পারি সে বিষয়ে তিনি বেশি মনোযোগ দিয়েছেন,” ফক্স নিউজের এক অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন নেটো মহাসচিব।
এর আগে বুধবার ট্রাম্প ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় ধরে সেসব দেশকে নিশানা বানিয়ে তোপ দেগেছেন, উল্টাপাল্টা হুমকি দিয়েছেন যারা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের এক নেটো মিত্রের কাছ থেকে ভূখণ্ড দখলে ট্রাম্পের চাপে আগে থেকেই তুমুল অস্বস্তিতে ছিলেন।
ইউরোপের কূটনীতিকরা বলছেন, নেটো মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্পের এমন সুর বদলের ফলে সমস্যা পুরোপুরি না মিটলেও মিত্রদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ কমিয়ে আনতে তা ভূমিকা রাখবে, তাও এমন এক সময়ে যখন সবাই বিরোধ মতপার্থক্য নিরসনে গোপনে কাজ করছে।
ঠিক কী ধরনের চুক্তি গ্রিনল্যান্ডের ‘সম্পূর্ণ মালিকানা’ পেতে চাওয়া ট্রাম্প এবং ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়’ বলা আর্কটিকের দ্বীপটির বাসিন্দা ও নেতাদের সন্তুষ্ট করবে তাৎক্ষণিকভাবে তা স্পষ্ট হওয়া যায়নি।
“রাশিয়া ও চীন যেন গ্রিনল্যান্ডে অর্থনৈতিক বা সামরিক কোনোভাবেই জায়গা করে নিতে না পারে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র আলাপ চালিয়ে যাবে,” বলেছেন নেটোর এক মুখপাত্র।
আলোচনা কখন, কোথায় হবে সে বিষয়ে কিছু এখনও জানানো হয়নি। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে সামনের আলোচনাগুলোতে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন।
“গ্রিনল্যান্ডে যা হচ্ছে তার প্রভাব আমাদের ওপর পড়বে না,” রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তৃতায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির বার্তা সংস্থাগুলো।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো গ্রিনল্যান্ড, আদতে পুরো আর্কটিক অঞ্চলের জন্য ভবিষ্যৎ চুক্তির একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। এই বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে আমি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া শুল্ক আর বসাচ্ছি না।”
গ্রিনল্যান্ড না পাওয়া পর্যন্ত ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্যসহ ৮ ইউরোপীয় দেশের পণ্যে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর পাল্টায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ, ইউরোপের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সীমিত করাসহ নানান ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছিল।
ডেনমার্ক বলেছে, গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা সোশাল মিডিয়ার বদলে গোপন কূটনৈতিক চ্যানেলে হওয়া উচিত।
“কিংডম অব ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের অধিবাসীদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্মান দেখিয়ে আমরা এর শেষ করতে পারছি কিনা, তাই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ,” সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ডিআরকে বলেছেন ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লোকে রাসমুসেন।
তিনি জানান, তার সঙ্গে নেটো মহাসচিব রুটের কথা হয়েছে তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।
গ্রিনল্যান্ডের সরকারও এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে করা রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
আর্কটিকের দ্বীপটি নিয়ে মিত্রদের ওপর দেওয়া শুল্কের হুমকি যে শেয়ার বাজারগুলোকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল বুধবার ট্রাম্পও তা স্বীকার করে নেন এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভায় দেওয়া বক্তব্যে ডেনিশ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি দখলে নিতে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন।
“লোকজন ভাবছে আমি বলপ্রয়োগ করতে যাচ্ছি, কিন্তু তার দরকার হবে। আমি বলপ্রয়োগ করতে চাই না, করবোও না,” বলেছেন রিপাবলিকান এ প্রেসিডেন্ট।