Published : 28 May 2026, 10:47 PM
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সংঘাত পারমাণবিক উত্তেজনায় রূপ নেওয়ার ঝুঁকি আছে। এমন ক্ষেত্রে দুই দেশই একে অপরের কমান্ড ও যোগাযোগব্যবস্থাকে নিশানা করে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছে শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা কেন্দ্র ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (আইআইএসএস)।
এ সপ্তাহান্তে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠেয় এশিয়ার বৃহত্তম বার্ষিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনের আগে দিয়ে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক কৌশলগত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে লন্ডন-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইএসএস বলেছে, বিশ্ব নতুন এক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দু এখন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।
আঞ্চলিক দেশগুলো এবং যেসব দেশের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, তারা নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ করছে। সেইসঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন দেশগুলোও দূরপাল্লার প্রচলিত হামলার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এতে বিশ্বের কৌশলগত স্থিতিশীলতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
১৫৬ পৃষ্ঠার আইআইএসএস প্রতিবেদনে এশিয়া অঞ্চলের পরিবর্তনশীল সামরিক নীতিমালা এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের লক্ষ্য ভিন্ন হলেও দুই পক্ষই ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাতে পারে। চীনের লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের দূরে রাখা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “তাইওয়ান চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সংঘাতে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে এবং তা পারমাণবিক পর্যায়েও পৌঁছতে পারে।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে এমন কোনও স্পষ্ট প্রমাণ নেই যে, দুই দেশের সেনাবাহিনী সংঘাত এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় আচরণবিধি তৈরি করেছে, যা একে অপরের কমান্ড, কন্ট্রোল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কম্পিউটার, গোয়েন্দা, নজরদারি ও রিকনাইসেন্স কেন্দ্রগুলোকে হামলার নিশানা করা থেকে বিরত রাখতে পারে।
ফলে তাইওয়ান নিয়ে যে কোনও বড় ধরনের যুক্তরাষ্ট্র–চীন সংঘাতে পারমাণবিক উত্তেজনার ঝুঁকি দীর্ঘ সময় ধরেই বড় উদ্বেগ হিসেবে থেকে যাবে।
আইআইএসএস- এর এই মূল্যায়নের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন এই মূল্যায়নকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে ‘পুরোপুরি অসঙ্গতিপূর্ণ’ বলেছেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান পুরোপুরি চীনের অভ্যন্তরীন বিষয়। এতে বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানের বিষয়ে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তাইওয়ান, ইরান যুদ্ধ এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা- এসবকিছুই সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠেয় আইআইএসএস-এর ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ সম্মেলনে গুরুত্ব পেতে পারে।
২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। এতে অংশ নেবেন বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা প্রধান, কূটনীতিক, বিশ্লেষক ও অস্ত্র নির্মাতারা।
এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকের পর। চলতি মাসের শুরুতে হয়ে যাওয়া এই বৈঠক তাইওয়ানে উদ্বেগ তৈরি করেছে- বিশেষ করে দ্বীপদেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। তবে চীন ‘শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণ’-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে। অন্যদিকে, তাইওয়ান সরকার চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর চীন তাইওয়ানের ওপর সামরিক চাপ বাড়িয়েছে। দ্বীপদেশটির চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে নজরদারি বজায় রেখেছে চীন।
আইআইএসএস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানিয়েল স্যালিসবারি বলেন, সাম্প্রতিক শি জিনপিং-ডনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি। পারমাণবিক বিষয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক বর্তমানে জটিল।
তিনি বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে এমন আলোচনা করা জটিল হবে। কারণ, চীনের পারমাণবিক সক্ষমতার বড় অংশই গোপন রাখা হয়েছে।
এই ধরনের আলোচনার সংস্কৃতি বর্তমানে নেই। ফলে সম্পর্কের ভিত্তি তৈরির সুযোগও অনেক কম, বলেন ড্যানিয়েল স্যালিসবারি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনের গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছাতে পারে।