Published : 19 Apr 2023, 07:39 PM
সমকামী বিয়ের আইনি স্বীকৃতি দাবি করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে করা বেশ কয়েকটি পিটিশন নিয়ে বুধবার দ্বিতীয়দিনের মত শুনানি চলছে। ‘জনগণের স্বার্থে এ শুনানি কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার’ করা হচ্ছে।
সমকামী বিভিন্ন জুটির পাশপাশি এলজিবিটিকিউ প্লাস (নারী ও পুরুষ সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামী, কিম্ভুত ও অন্যান্য) সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন আশা করছে, সুপ্রিম কোর্টের রায় তাদের পক্ষে যাবে।
যদিও ভারত সরকার এবং দেশটির বিভিন্ন ধর্মীয় নেতারা সমকামী বিয়ের তীব্র সমালোচনা করে এর বিরুদ্ধে জোরাল অবস্থান নিয়েছে।
মঙ্গলবার থেকে সমকামী বিয়ের বৈধতা প্রশ্নে শুনানি শুরু হয়। উভয়পক্ষ আদালতে নিজেদের পক্ষে জোরাল যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন বলে জানায় বিবিসি।
পিটিশনকারীদের পক্ষের আইনজীবীরা বলেন, বিয়ে হচ্ছে দুইটি মানুষের এক হওয়া। এখানে শুধু একজন পুরুষ এবং একজন নারীই থাকতে হবে এমনটা নয়।
তারা যুক্তি দিয়েছেন, বিবাহ আইনে পরিবর্তন আনা উচিত। যাতে প্রতিফলিত হয় যে, বিয়ের ধারণা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এবং একই লিঙ্গের দম্পতিরাও বিবাহের সম্মান চান।
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সুপ্রিম কোর্টে ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি আদালত আদৌ এই বিষয়টি নিয়ে শুনানির অধিকার রাখেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেছেন, পাঁচজন ব্যক্তির (পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ) সিদ্ধান্ত গ্রহণের মত বিষয় এটি নয়। এবং একমাত্র পার্লামেন্টই পারে বিয়ের মত একটি সামজিক-আইনী বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে।
সরকার পক্ষের এই আপত্তি উপেক্ষা করে বিচারকদের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার বলা হয়, তারা দেখবেন যে ১৯৫৪ সালে হওয়া স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট-যা বিভিন্ন বর্ণ ও ধর্মের লোকদের মধ্যে বিবাহের অনুমতি দিয়েছে সেখানে এলজিবিটিকিউ প্লাস লোকদেরও অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা।
আদালত উভয় পক্ষকে আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে নিজেদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কাজ শেষ করতে বলেছেন। সুপ্রিম কোর্টের এই শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে এবং যারা গভীর মনযোগে তা দেখছেন তাদের মধ্য অন্যতম ডা. কবিতা আরোরা এবং অঙ্কিতা খান্না।
এই সমকামী জুটি বছরের পর বছর ধরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অপেক্ষা করছেন। এমন নয় যে এই দুই নারী প্রথম দেখাতে পরষ্পরের প্রেমে পড়েছেন। বরং তারা প্রথমে সহকর্মী ছিলেন, সেখান থেকে বন্ধু হন এবং তারপর প্রেমে পড়েন।
তাদের দুইজনের পরিবারও তাদের সম্পর্ক মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু তারপরও তাদের দেখা হওয়ার ১৭ বছর পর এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে থাকার পরও তারা বিয়ে করতে পারছেন না।
যে ১৮টি সমকামী জুটি সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন করেছেন তাদের মধ্যে কবিতা-অঙ্কিতা জুটিও রয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত তিনটি জুটি বাচ্চাও লালন-পালন করছেন।
ভারতের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করে পাঁচজন বিচারপতি নিয়ে একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করেছেন। যারা আইন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন এবং এ বিষয়ে রায় দেবেন।
ভারতে এলজিবিটিকিউ প্লাস সম্প্রদায়ের লাখ লাখ মানুষ রয়েছে। যাদের জন্য এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০১২ সালে ভারত সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী দেশটিতে প্রায় ২৫ লাখ এলজিবিটিকিউ প্লাস সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা তার থেকে অনেক বেশি এবং যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি মানুষ।
গত কয়েক বছরে ভারতের সমাজ ব্যবস্থায় সমকামী মানুষদের গ্রহণ করার প্রবণতাও বেড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যৌন জীবন এবং যৌনতা এখনও দেশটিতে অত্যন্ত গোপনীয় এবং সংবেদনশীল বিষয় বলে বিবেচিত হয়।
সমাজকর্মীরা বলেন, ভারতে এলজিবিটিকিউ প্লাস সম্প্রদায়ের মানুষরা এখনো নিজেদের প্রকাশ করতে ভয় পান। এমনকি নিজেদের বন্ধু এবং পরিবারের সামনে আসতেও তারা দ্বিধান্বিত থাকেন।
সমকামী জুটির উপর হামলার ঘটনা সেখানে নিয়মিত খবরের কাগজে শিরোনাম হয়। তাই অনেকেই অধীর আগ্রহে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অপেক্ষায় আছেন।
যদি রায় পিটিশনকারীদের পক্ষে যায় তবে ভারত হবে বিশ্বের ৩৫তম দেশ যেখানে সমলিঙ্গে বিয়ে বৈধতা পাবে এবং দেশটির সমাজিক ইতিহাসে যা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে বিবেচিত হবে।
এটি ভারতে বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। এর ফলে দেশটিতে সন্তান দত্তক নেওয়া, বিয়ে-বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার আইনসহ আরো অনেক আইনে পরিবর্তন আসতে পারে।
অঙ্কিতা-কবিতা বলেছেন, তারা আশা করছেন এমনটাই ঘটবে এবং তারা দুইজন বিয়ে করতে পারবেন।
পেশায় অঙ্কিতা একজন থেরাপিস্ট আর কবিতা একজন মনরোগ চিকিৎসক। তারা দুইজনে মিলে একটি ক্লিনিক পরিচালনা করেন। যেখানে মূলত শিশু ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কাজ করা হয়।
এই জুটি ২০২০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন। সাতদিন পর তারা যখন নিজেদের এলাকার ম্যাজিস্ট্রেট অফিসে যান তাদের বিয়ের নিবন্ধন করতে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তারা এরপর দিল্লি হাইকোর্ট যান এবং সেখানে সমলিঙ্গে বিয়ের আইনগত বৈধতা চেয়ে আবেদন করেন। আদালতের কাছে তারা তাদের বিয়ে নিবন্ধন করার আদেশ দেওয়ার প্রার্থনাও জানান।
ভারতে বিভিন্ন হাই কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে এমন আরও কয়েকটি আবেদন জমা পড়েছিল। গত জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্ট ওই সব আবেদনের একসঙ্গে শুনানি করার সিদ্ধান্ত নেন। আদালত থেকে বলা হয়, এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
২০১৮ সালে ভারতের আদালত ‘সমলিঙ্গে যৌন সম্পর্ক’ আর অপরাধ বলে গণ্য হবে না বলে রায় দেয়।
ঔপনিবেশিক আমলের এ আইন বাতিলের সময় আদালত বলেছিল, ‘‘এলজিবিটিকিউ মানুষদের সঙ্গে সমাজ যে বর্বরতা এবং অসম্মান দেখিয়েছে সেজন্য তাদের কাছে ইতিহাসের ক্ষমা চাওয়া উচিত।”
আদালত সমকামীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও ভারত সরকার এখনো তাদের বিপক্ষে। সরকার বলেছে, কেবলমাত্র দুই বিপরীত লিঙ্গের মানুষ, একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যেই বিয়ে হতে পারে।
তারা সুপ্রিম কোর্টের প্রতি সমকামী বিয়ের আইনি বৈধতা চেয়ে করা সব পিটিশন বাতিল করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আদালতে আইন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, “সমলিঙ্গের মানুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া এবং তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক....এসব ভারতে পরিবারের যে ধারণা, একজন স্বামী, একজন স্ত্রী ও সন্তান... তার সঙ্গে যায় না।”
আবেদনে আরো বলা হয়, একটি দেশের পুরো আইনি ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের জন্য আদালতকে বলা যায় না। এটি নিয়ে বিতর্কের এখতিয়ার বরং পার্লামেন্টের হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত।”
সমকামী বিয়ের বিরোধিতায় ভারতের সব ধর্মের নেতাদের মধ্যে বিরল এক ঐক্য দেখা গেছে। দেশটির সংখ্যালঘু হিন্দু, মুসলমান, জৈন, শিখ ও খিস্টানসহ সব ধর্মের নেতারাই সমকামী বিয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের যুক্তি, বিয়ের উদ্দেশ হল প্রজননের মাধ্যমে বংশধারা অক্ষুন্ন রাখা, বিয়ে কোনও বিনোদন নয়।
গত মাসে হাইকোর্টের ২১ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিও সমকামী বিয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। বলেছেন, ‘‘সমকামী বিয়ে যদি বৈধতা পায় তবে পরিবার, সমাজ ও শিশুদের উপর তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে।”
সমকামী বিয়ে বৈধতা দিলে ভারতে এইচআইভি-এইডস রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়ে যাবে বলে যুক্তি দেখান তারা।
অন্যদিকে, গত সপ্তাহে ভারতের সাইক্রিয়াটিক সোসাইটি সমকামীদের পক্ষে এক বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘‘সমকামিতা কোনো রোগ নয়।”
বরং এলজিবিটিকিউ প্লাস মানুষের সঙ্গে যদি বৈষম্য করা হয় তবে সেটা তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করবে বলে মত তাদের। এখন দেখার অপক্ষা সুপ্রিম কোর্ট কী রায় দেয়।