বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের ঘটনা।
Published : 28 Dec 2024, 12:54 PM
অস্ত যাচ্ছে ২০২৪ সালের সূর্য, কিন্তু বিদায়ী বছরের অনেক ঘটনার রেশ নতুন বছরে, এমনকি তার পরেও অনুভূত হবে বিশ্বজুড়ে।
চলতি বছর গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। এই যুদ্ধ ছড়িয়েছে লেবাননেও। সেখানে গত মাসে দুর্বল একটি চুক্তির আগ পর্যন্ত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল ইসরায়েলি বাহিনী।
সিরিয়ায় শেষমেশ বিদ্রোহীরা ‘আচমকা’ আক্রমণে বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করেছে; ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ গড়িয়েছে তৃতীয় বছরে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ-সংঘাতের বাইরে ২০২৪ সালকে ‘ভোটারদের পছন্দের বছরও’ বলা যেতে পারে।
এ বছর রেকর্ডসংখ্যক দেশে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, যার প্রভাব ২০২৫ সালের বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়বে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের ঘটনা।
অর্থনীতিবিদ ও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সাবেক ‘আন্ডার সেক্রেটার’ নাথান শিটস যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনে বলেন, “বিশ্ব অর্থনীতি যেভাবে চলছে, তাতে হতাশ হওয়ার মত অনেক কারণই আছে।”
৬০টির বেশি দেশে নির্বাচন হওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে মার্কিন কোম্পানি সিটিগ্রেুপের এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, “আমার কাছে রাজনৈতিক পরিবেশ স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চতায় ভরা মনে হচ্ছে।”
অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই অনিশ্চয়তার প্রধান উৎস হল ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফিরে আসা। বিভিন্ন দেশের ওপর তার অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকিই মূলত এ উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, যা চীনের পণ্যের ক্ষেত্রে হবে ৬০ শতাংশ।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর গত মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প বলেন, মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আসা পণ্যে তিনি ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসাতে চান।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি বাস্তবায়ন হলে সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে নানা আভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে আরোপিত শুল্কের পরিমাণের ওপর। তবে ক্ষতি যে হবে, সে বিষয়ে বিশ্লেষকরা নিশ্চিত।
ইউরোপের পণ্যে ট্রাম্পের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের প্রভাব সম্পর্কে চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লেগার্দে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বরাবরই মনে করি, বিধিনিষেধ আরোপের মত সুরক্ষাবাদী পদক্ষেপ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিপন্থি।”
উচ্চহারে শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। বহুজাতিক বিনিয়োগকারী মার্কিন ব্যাংক ‘গোল্ডম্যান স্যাক্স’ আভাস দিয়েছে, ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলেও তা মার্কিন জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই প্রভাব সবচেয়ে প্রকট হবে ২০২৬ সালে গিয়ে। ভোক্তাব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে মার্কিনিদের মধ্যে ব্যয় সংকোচনের প্রবণতা বেড়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ বিশ্ব অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা অনেকটা নির্ভর করবে ভুক্তভোগী দেশগুলোর পাল্টা পদক্ষেপের ওপরও। কারণ অনেক দেশ মার্কিন পণ্য আমদানিতেও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স’ সম্প্রতি এক ‘নোটে’ বলেছে, ‘শুল্ক আরোপের লড়াই শেষমেশ বিশ্ব বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সে যুদ্ধ হতে পারে নানাভাবে। এই যুদ্ধ তীব্র হলে বৈশ্বিক জিডিপি কমে যেতে পারে দুই থেকে তিন শতাংশ পয়েন্ট।
বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশ পয়েন্ট কমে গেলে তা বিশ্বের সিংহভাগ দেশের জিডিপিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গোল্ডম্যান স্যাক্সের পাশাপাশি আরেক বিনিয়োগকারী কোম্পানি জেপি মরগ্যান আশঙ্কা করছে, ট্রাম্প সবার ওপর ‘নির্বিচারে’ শুল্ক আরোপ না করলেও চীনের মত কয়েকটি দেশ নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশটি সম্পর্কে গত মাসে গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষকরা বলে, “চীনের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে এবং তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই শুল্ক আরোপের মুখে পড়তে যাচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আরও অনেক দেশের রাজনীতিতে চলতি বছর বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নতুন বছরের মাঝামাঝি সময়ে দেশে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন।
একই পরিস্থিতি জার্মানিতেও। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন বছরের শুরুতে সেখানেও আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে, তার প্রভাবেও বিঘ্ন ঘটতে পারে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে। যদিও অদূর ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব খুব একটা পড়বে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কারণ হিসেবে সিএনএনকে নাথান শিটস বলছেন, “বর্তমান সংঘাতের যে মাত্রা, তাতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই।
“সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বড় অর্থনীতির দেশগুলো তা আর বাড়াতে চায় না।”