Published : 11 Jan 2026, 01:25 AM
গ্রিনল্যান্ড বরফে ঢাকা অল্প জনসংখ্যার দ্বীপ হলেও ভূরাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ভূখণ্ড। দ্বীপটি বহুদিন ধরেই শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নজরে থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আমলে নতুন করে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ডেনমার্কের অংশ হিসেবে থাকা গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার ট্রাম্পের প্রস্তাব নিয়ে হোয়াইট হাউজের 'সক্রিয়' আলোচনার খবর এসেছে। আগামী সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বসছেন।
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই দ্বীপটি তার ‘দখলে’ থাকা প্রয়োজন। ট্রাম্প এর আগে প্রয়োজনে দ্বীপটি জোর করে দখল করে নেওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করেননি।
আর এখন ভেনেজুয়েলায় অতিসম্প্রতি ট্রাম্প সামরিক অভিযান চালিয়ে যেভাবে দেশটির প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিচারের মুখে দাঁড় করিয়েছেন, তাতে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। এমন কিছু গ্রিনল্যান্ডেও ঘটে কিনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা।
গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাজ্যের তুলনায় ৯ গুন বড়। তবে এর জনসংখ্যা মাত্র ৫৭ হাজার। এই দ্বীপ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডবাসীরা বলছে, তাদের এই আর্কটিক দ্বীপটিতে তারা শান্তিতে বাস করতে চায় মাত্র। অন্য সব কিছু থেকে দূরে থাকতে চায় তারা। আর বেশিরভাগেরই বক্তব্য হল, তারা আমেরিকার নাগরিক হতে চায় না।
কিন্তু ট্রাম্পের আস্ফালন এবং হুমকি-ধামকির মুখে গ্রিনল্যান্ডের অনেকের মধ্যেই এখন ভয় কাজ করছে এবং অনেকেই বিষন্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, “ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ দেখার পর আমি এখন ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিতে মৃত্যুভয়ে আছি।”
২০ বছর বয়সী আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমরা সবাই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ভীষণ ক্লান্ত। আমরা সবসময় এখানে খুব শান্তিতে বাস করেছি, আমরা কেবল নিজেদের মতো করে থাকতে চাই।”
রাজধানী নুউক এর আরেক বাসিন্দা পিৎসি কারোলুসেন তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “গত কয়েকটি দিন খুবই কঠিন গেছে, খুবই বিচলিত অবস্থার মধ্য দিয়ে কেটেছে।” গ্রিনল্যান্ডের আরও অনেকেই দ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বলেও জানান তিনি।
তার কথায়, “আমার মনে অনেককিছু নিয়ে চিন্তা চলছে। অন্যদিকে, আমি শান্ত থাকারও চেষ্টা করছি। কারণ, আমরা জানি না কি হতে চলেছে। আমরা যেন আমাদের দেশে নিরাপদ বোধ করতে পারি, সেটিই চাই।”
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হিসাবে থাকলেও সম্পর্ক কখনওই স্বস্তিকর নয়। গ্রিনল্যান্ডের অনেক বাসিন্দাই ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চায়। তারা তাদের অভ্যন্তরীন বিষয়েই কেবল নয়, বৈদেশিক বিষয়েও আরও বেশি কথা বলার স্বাধীনতা চায়।
কিন্তু ডেনমার্কের সঙ্গে এই অস্বস্তিকর সম্পর্কের পরও গ্রিনল্যান্ডবাসীদের ৮৫ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে চলে যাওয়ার বিপক্ষে। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের কব্জায় যাওয়ার পরিবর্তে বরং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করার পক্ষে।
গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী এক রাজনীতিবিদ পেলে ব্রোবার্গ বলেন, "এটি সত্য, আমরা (গ্রিনল্যান্ড) বিক্রির জন্য নই, কিন্তু আমরা ব্যবসার জন্য প্রস্তুত।" তবে বর্তমান পরিস্থিতি ব্যবসার চেয়ে ‘দাবি’ বা ‘হুমকি’র পর্যায়েই বেশি।
রাজধানী নুউক এর আরেক বাসিন্দা এরিক ড্যানিশ বেতারে বলেন, “আমি বুঝিনা কেন ট্রাম্প মনে করেন যে, আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়া উচিত। আমি আমেরিকান হতে চাই না। আমি ডেনমার্ক এর সঙ্গে সম্পর্ক থাকা একজন গ্রিনল্যান্ডিক। আর তাতে কোনও সমস্যা একেবারেই নেই।”
কেন গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্পের অগ্রাধিকার?
ভৌগোলিকভাবে গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকার অংশ এবং ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের চেয়ে এটি নিউ ইয়র্কের ১০০০ মাইল বেশি কাছে। ট্রাম্পের এই আগ্রহের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
১. জাতীয় নিরাপত্তা: রাশিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল আমেরিকা পৌঁছানোর সবথেকে ছোট পথ হলো গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর মেরু। মার্কিন ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এই দ্বীপটি অপরিহার্য।
২. খনিজ সম্পদ: গ্রিনল্যান্ডে প্রচুর পরিমাণে বিরল খনিজ সম্পদ রয়েছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৩. চীন-রাশিয়া ফ্যাক্টর: ট্রাম্পের দাবি, ডেনমার্ক এই দ্বীপটি রক্ষায় যথেষ্ট কাজ করছে না। তিনি মনে করেন গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে রুশ ও চীনা জাহাজের নজরদারির শিকার।
ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্বেগ:
ইউরোপীয় দেশগুলো এবং নেটো এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের প্রতিরক্ষা খাতে নির্ভরতা থাকার কারণে তারা সরাসরি ওয়াশিংটনের বিরোধিতা করতে পারছে না।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ফরাসি নেতারা ডেনমার্কের পাশে থাকার কথা বললেও ট্রাম্পের সামরিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে তারা কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আর্কটিক অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে “হাই নর্থ, লো টেনশন” নীতি মেনে চললেও, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ওয়াশিংটনের বর্তমান একতরফা অবস্থান সেই ভারসাম্যকে বিপজ্জনকভাবে নস্যাৎ করে দিচ্ছে।