Published : 28 Jun 2026, 12:21 AM
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেসের নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে একই সঙ্গে এই বিপর্যয় একটি বিভক্ত সরকারকে এক সুতোয় বাঁধার এবং জরাজীর্ণ দেশটিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক অনন্য সুযোগও এনে দিয়েছে তাকে।
বুধবার সন্ধ্যার এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য মডেল অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ১০,০০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ধসে পড়া অবকাঠামো পুনর্গঠন, আহতদের চিকিৎসা এবং গৃহহীনদের পুনর্বাসনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞই মূলত রদ্রিগেসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। রদ্রিগেস বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং নিজেকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দূত হিসেবে তুলে ধরছেন। অথচ গত জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন কর্তৃক সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি তার সরকারেরই ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
কারাকাসভিত্তিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টনি ফ্রাঞ্জি মাওয়াদ এই পরিস্থিতিকে কিছুটা বিদ্রূপাত্মক উল্লেখ করে বলেন, “নতুন ভেনেজুয়েলার যে আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে তা পুনর্গঠনের ওপর ভিত্তি করে; অথচ দেশটিকে এখন চরম সংকটের মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই তার পরিকাঠামো পুনর্গঠনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।”

ফ্রাঞ্জি আরও মনে করেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট এবং ভেঙে পড়া জনপরিষেবার কারণে এই উদ্ধার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন হবে এবং এটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
তবে সরকার যদি আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও পুনর্গঠন কৌশল সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে, তবে এই জাতীয় দুর্যোগকে কাজে লাগিয়ে তারা একটি জাতীয় ঐক্যের আবহ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
ইতিমধ্যে রদ্রিগেসও এই সুরেই কথা বলছেন এবং দুর্যোগের পরপরই এক বার্তায় তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সমর্থন পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বৃহস্পতিবার আশ্বস্ত করে বলেছেন, মার্কিন সহায়তা হবে অনেক বড়, দ্রুত এবং কার্যকর।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিশাল ত্রাণের ফলে ভেনেজুয়েলায় ওয়াংশিটনের প্রভাব এবং একই সাথে রদ্রিগেস সরকারের মার্কিন-নির্ভরতা দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
কারাকাসভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘পোদের অ্যান্ড এস্ত্রেতেহিয়া’র প্রধান রিকার্ডো রিওস বলেন, পরিস্থিতিটি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য খুব ভালোভাবে ব্যবহার করা হতে পারে এবং রদ্রিগেসও যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রধান মিত্র হিসেবে আঁকড়ে ধরবেন।
লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বড় নজির হয়ে রয়েছে। এর আগে ১৯৭২ সালে নিকারাগুয়া এবং ১৯৮৫ সালে মেক্সিকোর ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজে সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্নীতি তৎকালীন দীর্ঘমেয়াদি শাসকদের পতনের পথ সুগম করেছিল।
আবার ১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়েলার প্রলয়ংকরী ভূমিধসের পর মার্কিন সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে দেশকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একঘরে করেছিলেন তৎকালীন নেতা উগো চাভেস।
ঠিক একইভাবে, ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতিতেও উদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে যেকোনো ব্যর্থতার পুরো দায় রদ্রিগেজের ওপরই বর্তাবে, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত এক দশকের অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও প্রায় ৮০ লাখ মানুষের দেশত্যাগের কারণে ভেনেজুয়েলার জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা এখন একদম শূন্যের কোঠায়। ফলে বিপুল আন্তর্জাতিক সাহায্য ও বড় ধরনের অর্থায়ন ছাড়া প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলারের ঋণে জর্জরিত এই দেশটির পুনর্গঠনের পথ হবে অত্যন্ত দীর্ঘ ও দুরূহ।
আরও পড়ুন: