Published : 01 Apr 2026, 06:18 PM
ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
চলমান এ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে গত ৩১ মার্চ জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইউএনডিপির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট বুধবার লিখেছে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় আরব দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন ১২০ বিলিয়ন থেকে ১৯৪ বিলিয়ন ডলার কমে যেতে পারে।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব এবং আরব দেশগুলোর আঞ্চলিক ব্যুরোর পরিচালক আবদুল্লাহ আল-দারদারি সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আশারক আল-আওসাতকে বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ একটি ‘তীব্র ও আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা’ সৃষ্টি করেছে।
“আমাদের এ অঞ্চলে মাত্র এক মাসের মধ্যেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, বহু বছরের অর্থনৈতিক সংকটের ফলে এত বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারে। অথচ এখন তা ঘটছে মাত্র এক মাসের মধ্যে।
“এই সংকট উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা। এটা তাদের আর্থিক, খাতভিত্তিক এবং সামাজিক নীতিমালার কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো মৌলিকভাবে পুনর্বিবেচনার তাগিদ দিচ্ছে।”
আল-দারদারি বলেন, এ যুদ্ধের প্রভাব যে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হবে, তা এখন স্পষ্ট।

“হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা চরম পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি; যার অর্থ জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর ভয়াবহ আঘাত।”
ইউএনডিপির প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে, যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ ১৯৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তাতে আঞ্চলিক বেকারত্বের হার বেড়ে যেতে পারে চার শতাংশ পয়েন্ট। তাতে প্রায় ৩৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ২০২৫ সালে ওই অঞ্চলে সৃষ্ট মোট কর্মসংস্থানের চেয়েও বেশি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-ভুক্ত দেশগুলো এবং লেভান্ত (পূর্ব ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক এলাকা) অঞ্চল। উভয় অঞ্চলের দেশগুলো তাদের জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশের বেশি হারানোর শঙ্কায় রয়েছে।
লেভান্ত অঞ্চলে এই সংকটের ফলে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২৮ দশমিক ৫ লাখ থেকে ৩৩ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে।
ইতোমধ্যে লেভান্ত অঞ্চলভুক্ত দেশ যেমন- ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান এবং লেবাননে তীব্র দারিদ্র্য বিরাজ করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে অবরুদ্ধ। হরমুজ প্রণালিই পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মত উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এ পথ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে তারা প্রায় শতভাগ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
এই উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদন করে। বিশ্বের মোট এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ চালান হরমুজ প্রণালি দিয়েই যায়।
ফলে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় তেল ও এলএনজি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কিছু আরব দেশ তেল এবং এলএনজি রপ্তানির জন্য এখন বিকল্প পথের সন্ধান করছে, যার মধ্যে রয়েছে স্থলপথের পরিবহন ব্যবস্থা।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব আল-দারদারি বলেন, সৌদি আরব বর্তমানে লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত তেল পাইপলাইনের ওপর বেশি নির্ভর করছে। অন্যদিকে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে স্থলপথে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পরিবহনের সম্ভাব্যতা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা চলছে।