১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপ থেকে নবজাতকসহ মা উদ্ধার: শোনালেন বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা

উদ্ধার পাওয়া এই মা জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা অবস্থায় তার ১৮ দিন বয়সী সন্তানই তাকে সজাগ ও সচেতন থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপ থেকে নবজাতকসহ মা উদ্ধার: শোনালেন বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা
ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৮ দিনের সন্তানসহ এই মাকে। ছবি: বিবিসি

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Jun 2026, 12:27 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:32 PM

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৮ দিন বয়সী সন্তানসহ বেঁচে ফেরা এক মা বর্ণনা করেছেন তার বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা। 

বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দায়ানা পাতিনো নামের ওই নারী জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা অবস্থায় তার ছোট শিশু হুয়ান দাভিদই তাকে সজাগ ও সচেতন থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

দায়ানা বলেন, “যতক্ষণ আমার সন্তান বেঁচে ছিল, ততক্ষণ আমারও বেঁচে থাকার তাগিদ ছিল। সে তখনও শ্বাস নিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আমি বারবার ওর নাকে হাত দিয়ে দেখতাম।” 

নবজাতকসহ মাকে উদ্ধারের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং হুয়ান দাভিদ ভেনেজুয়েলার মানুষের কাছে এক নতুন আশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার উত্তরের উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরার একটি বহুতল ভবনের ৮ তলার ফ্ল্যাটে থালাবাসন ধোয়ার কাজ করছিলেন দায়ানা। ভূমিকম্প শুরু হলে তিনি প্রথমে এটিকে সাধারণ মৃদু ঝাঁকুনি ভেবে দ্রুত সন্তানকে কোলে তুলে নেন। 

দায়ানা বলেন, “হঠাৎ আমার মনে হলো আমি বাতাসে উড়ছি। এরপর মনে হলো আমি পানি ও ধুলোময়লার ভেতরে তলিয়ে যাচ্ছি। আমি গভীর এক গর্তে গিয়ে পড়লাম। ছিটকে আসবাবপত্রের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার পরও কীভাবে যে সন্তানকে ধরে রেখেছিলাম, তা আমি জানি না।”

গর্তের ভেতরে পড়ার পরপরই তিনি চিৎকার করতে শুরু করেন, কিন্তু দ্রুতই বুঝতে পারেন যে বাইরে থেকে কেউ তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না। শক্তি অপচয় না করে যখনই আশেপাশে মানুষের কণ্ঠস্বর বা পায়ের আওয়াজ পাবেন, ঠিক তখনই চিৎকার করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। 

কংক্রিটের নিচে তার বাম পা আটকে ছিল এবং মাথার একপাশ চেপে ছিল একটি পাথরের সাথে। এমন পরিস্থিতিতে নিচে একটি বাইবেল খুঁজে পেয়ে তিনি বেঁচে থাকার নতুন আশা পান। ‘সেখান থেকেই আমার বেঁচে থাকার যাত্রা শুরু হয়েছিল,’ বলেন দায়ানা।

ধ্বংসস্তূপের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে ওপর থেকে সুতোর মতো সামান্য আলো আসছিল, যা দেখতে চাঁদের মতো লাগছিল বলে জানান দায়ানা। হঠাৎ তিনি তার ভাইয়ের গলার আওয়াজ শুনতে পান। 

দায়ানা বলেন, “আমি নিজেকে বললাম, এটাই আমার শেষ সুযোগ। আমি আমার গায়ের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললাম, আমি এখানে। তখন আমার ভাই বলল, “আমি তোমাদের খুঁজে পেয়েছি। তোমাদের বের না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না।”

ভাই তার কথা রেখেছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে এক অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে মা ও শিশুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে বের করা হয়। ভূমিকম্পে দায়ানার দুই পায়ে আঘাত লাগলেও শিশু হুয়ান সৌভাগ্যবশত সামান্য চোট পেয়েছে। 

অন্যদিকে দায়ানার স্বামী গেরসন ভূমিকম্পের ঠিক আগমুহূর্তে গাড়ি পার্ক করে বাড়ির বাইরে থাকায় সীমানা প্রাচীর টপকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন।

ধসে পড়া ভবনের অবস্থা দেখে গেরসন স্ত্রী ও সন্তানের বেঁচে থাকার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তাই তাদের জীবিত ফিরে আসাকে একটি ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। 

উদ্ধার পাওয়ার পর আবেগাপ্লুত গেরসনের তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কান্না করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। 

গেরসন বলেন, “সেই মুহূর্তটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি ভেবেছিলাম তারা আর নেই। যখন ছেলেকে জীবিত দেখলাম, মনে হলো আমার নিজেরই পুনর্জন্ম হয়েছে।”

ভূমিকম্পে গেরসন ও দায়ানার বাড়ি এবং সমস্ত আসবাবপত্র ধ্বংস হয়ে গেছে, এমনকি তাদের পোষা কুকুরটিও এখনো নিখোঁজ। তবে সবকিছু হারিয়েও তারা নতুন করে জীবন শুরু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। 

গেরসন বলেন, “আমরা আমাদের প্রায় সবকিছুই হারিয়েছি, কিন্তু আমরা এখনও বেঁচে আছি। যা হারিয়েছি, তা আমরা আবার নতুন করে গড়ে তুলব।”