Published : 14 Mar 2026, 09:46 PM
বিশ্বের বিত্তবানদের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে দুবাইয়ের যে ভাবিমূর্তি, তাতে বেশ জোরেশোরেই আঘাত হেনেছে ইরান যুদ্ধ।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে, বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন শহরটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই শহরে যাদের পারিবারিক ব্যবসা বা অবকাঠামো রয়েছে, তারা সেখানে থাকা না থাকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।
সিএনবিসির খবরে বলা হয়েছে, গত এক দশকে দুবাই নিজেকে বিশ্বের অভিজাত শ্রেণির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
লন্ডনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের হিসাব বলছে, রোদ পোহাতে, নিরাপত্তা পেতে এবং করমুক্ত আয়ের লোভে ২০১৪ সালের পর দুবাইয়ে কোটিপতির সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে। বর্তমানে এই সংখ্যা ৮১ হাজারের বেশি।

টানা পাঁচ বছর দুবাইয়ে বিলাসবহুল আবাসনের বাজার বিস্তৃত হয়েছে। গত বছর দুবাইয়ে ১ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সম্পত্তি কেনাবেচনা হয়েছে ৫০০টি, যা ২০২০ সালে ছিল ৩০টি।
ইরান যুদ্ধ ঘিরে এখন দুবাইয়ের সুনাম ভেঙে পড়ছে।
গত সপ্তাহে বিস্ফোরণ ঘটে খেজুরপাতার আকৃতির দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত পাঁচ তারকার ‘ফেয়ারমন্ট দ্য পাম’ হোটেলে। কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ায় দ্বীপপুঞ্জটির বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
ভূপাতিত একটি ইরানি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুন লেগে যায় বিখ্যাত বুর্জ আল আরব হোটেলে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুবাই বিমানবন্দরও।
মঙ্গলবার দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ওই হামলায় কনস্যুলেটের পাশের একটি স্থাপনায় আগুন ধরে যায়।
রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের গবেষক জিম ক্রেন মনে করেন, দুবাইয়ের নিরাপদ শহরের আবহ ইরান যুদ্ধে ওলটপালট হয়ে গেছে।
“দুবাইয়ের অর্থনৈতিক মডেল মূলত বাইরে থাকা আসা মানুষের মেধা, শ্রম ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। মেধাবী বিদেশিদের আনতে হলে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা লাগবেই।”

নিরাপত্তা নিয়ে দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
দেশটির ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ শনিবার দাবি করে, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’।
এছাড়া চলতি সপ্তাহে দুবাই পুলিশ বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কোনো কনটেন্ট শেয়ার করা যাবে না, যা সরকারের ঘোষণার পরিপন্থি এবং সমাজে আতঙ্ক তৈরি করে। এ নির্দেশনা না মানলে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ডের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বড়লোকদের শহর হিসেবে পরিচিত আবু ধাবি, দোহা ও রিয়াদও নিজেদের ভাবমূর্তি নিয়ে সংকটে পড়ে গেছে।
দুবাইয়ের মতো তারাও ধনীদের নিজেদের শহরে টানাকে অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে নিয়েছে। তবে এসব শহরের মধ্যে সম্পদশালীদের কাছে দুবাইয়ের প্রতি টানই বেশি।
ক্রেন বলেন, প্রতিবেশীদের মতো দুবাই এখন আর তেল বিক্রির ওপর নির্ভর করে না; বরং তাদের অর্থনীতি এখন বিদেশিদের ‘আস্থার ওপরেই’ দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, “বিদেশি পাসপোর্টধারীরা সবাই পালিয়ে গেলে শহরটি চলতে পারবে না; কার্যত অচল হয়ে পড়বে।”

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্যমতে, বর্তমানে দুবাইয়ে ১০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ থাকা ব্যক্তি আছেন ২৩৭ জন। ২০ জন আছেন, যাদের সম্পদ ১০০ কোটি ডলারের বেশি।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৯৮০০ জন কোটিপতি দুবাইয়ে পাড়ি জমান। এদের মাধ্যমে শহরটিতে ৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ প্রবেশ করেছে।
দুবাইয়ের ধনীদের বড় অংশ যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত এবং ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা।
কয়েক দশক আগে থেকেই শাসক মাকতুম পরিবার তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ নেয়। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ‘গোল্ডেন ভিসা’ কর্মসূচি চালু করে সম্পদ আকর্ষণকে কার্যত জাতীয় কৌশলে রূপ দেওয়া হয়।
দুবাইয়ে কোনো ব্যক্তিগত আয়কর নেই। মুনাফা কর বা উত্তরাধিকার করও দিতে হয় না। ফলে অনেক ধনকুবের নিজেদের গন্তব্য হিসেবে দুবাইকে বেছে নেন।
দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টার (ডিআইএফসি) গেল জানুয়ারির শুরুতে জানায়, সেখানে শীর্ষ ১২০টি পরিবারের হাতে এক লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদ রয়েছে।
গত মাসে ডিআইএফসি জানায়, সেখানে ১ হাজার ২৮৯টি পরিবারভিত্তিক ব্যবসায়িক ‘সত্তা’ রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬১ শতাংশ বেশি।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বহু ধনী পরিবার ও উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরা দুবাই ছাড়ার কথা ভাবছেন।
চার্টার কোম্পানিগুলো বলছে, ব্যক্তিগতভাবে বিমান ভাড়া নেওয়ার চাহিদা বেড়ে গেছে।
‘বিমানা প্রাইভেট জেটসের’ প্রধান নির্বাহী আমির নরান মঙ্গলবার বলেন, এক রাতেই তাদের ব্রোকারেজে ১০০ জনের বেশি অনুসন্ধান চালিয়েছে।
তার দাবি, কোভিড মহামারীর পর এমন চাহিদা তিনি আর দেখেননি।
রিয়াদ থেকে ইউরোপে একটি উড়োজাহাজ ভাড়া করতে খরচ পড়তে পারে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
তবে যেসব দুবাইবাসীর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন, তাদের বেশির ভাগই ব্যবসায়িক বৈঠকের জন্য ভ্রমণ করছেন, নিরাপত্তার ভয়ে পালাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “তারা নিজেদের অনিরাপদ মনে করছেন না। ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দে বাড়তি উৎকণ্ঠা আছে, কিন্তু জীবন মোটামুটি স্বাভাবিকই চলছে। জীবন থেমে থাকতে পারে না। তাদের ভ্রমণ করতেই হবে।”

নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল গার্ডিয়ানের প্রধান নির্বাহী ডেল বাকনার বলেন, মানুষ বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমার লক্ষণ নেই। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বড় আর্থিক ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানসহ সাতটি করপোরেট ক্লায়েন্ট তাদের হাজার তিনেক কর্মী সরিয়ে নিতে চেয়েছে।
তিনি বলেন, “এটি অনেকটা ইউক্রেইনের পরিস্থিতির মতো মনে হচ্ছে।
“সবাই বুঝতে পেরেছে যে, ইরানিরা বড় পরিসরে পাঁচ তারকা হোটেল ও বিমানবন্দরে আঘাত হানতে সক্ষম। আর এখন তারা তেল অবকাঠামোতেও আঘাত হানা শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতির কথা এখানকার কেউ হয়ত ভাবেনি।”
তবে দুবাইয়ের বহু কোম্পানি ও পেশাজীবী বলছেন, সেখানে থাকার ব্যবসায়িক কারণ এখনো শক্তিশালী।
দুবাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেলিমারের ভূরাজনীতি কৌশল বিভাগের প্রধান হাসনাইন মালিক বলেন, বাইরের বিনিয়োগ মূলত দুবাইয়ের করব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে আকৃষ্ট হয়। এসব সুবিধা এখনো বহাল আছে।
“সেই কারণগুলো বদলায়নি। কেবল জীবনযাত্রার একটি দিক, অর্থাৎ নিখুঁত নিরাপত্তার বিষয়টি যুদ্ধের ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দুবাইয়ের আবাসন বাজারে। যদিও টানা পাঁচ বছর ধরে সেখানে সম্পত্তির দাম বেড়েছে।
দেশটিতে ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা তার বেশি মূল্যের সম্পত্তি কিনলে বিদেশিদের ১০ বছরের নবায়নযোগ্য ভিসা দেওয়া হয়। এর নাম ‘গোল্ডেন ভিসা’।
গত বছর নতুন বুগাত্তি রেসিডেন্সেসের ৪৭ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি পেন্টহাউস রেকর্ড ৫৫ কোটি দিরহাম, অর্থাৎ প্রায় ১৫ কোটি ডলারে বিক্রি হয়।
তবে দুবাইয়ের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো ও সমস্পত্তির ঊর্ধ্বমুখী দাম যে গতি হারাতে পারে, সেই আলোচনা ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও ছিল।
আর্থিক সেবা দেওয়া কোম্পানি ইউবিএস গেল সেপ্টেম্বরে অনুমান করেছিল, ২১ শহরের আবাসন ব্যবস্থা গতি হারাবে, তাতে দুবাইয়ের অবস্থান পঞ্চম।
সম্প্রতি ‘ফিচ রেটিং’ আভাস দেয়, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ও ২০২৬ সালে আবাসন বাজার সংশোধনে চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দাম কমে যেতে পারে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।
ফিচ রেটিংসের অ্যান্টন লোপাটিন বলেন, সম্পত্তির মূল্যে প্রভাব কতটা পড়বে, সেটা নির্ভর করবে যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্বের ওপর।
আপাতত প্রবাসীদের প্রস্থান দুবাইয়ের আবাসন বাজারে ‘চাপ সৃষ্টি করতে পারে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরও পড়ুন
মুজতাবা খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতাদের তথ্য চেয়ে পুরস্কার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের পাল্টা আক্রমণ চলছেই, দুবাইয়ে বিস্ফোরণ, বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে হামলা
তৃতীয় সপ্তাহে ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে ২৫০০ মেরিন সেনা
ইরানি হামলায় 'সৌদি আরবে ৫টি মার্কিন সামরিক বিমান' ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানের খার্ক দ্বীপে বোমা ফেলল যুক্তরাষ্ট্র, তেল স্থাপনায় হামলার হুমকি