Published : 16 Aug 2025, 01:19 AM
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকে অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তিন বছর ধরে চলা ইউক্রেইন যুদ্ধ অবসান নিয়েই কথা বলাটাই লক্ষ্য।
আর এই ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে কোনওরকম শান্তি চুক্তি হতে গেলে প্রথমেই ভূমি নিয়ে একটি বোঝাপড়ায় আসার দরকার পড়বে, যেহেতু রাশিয়ার দখলে এরই মধ্যে আছে ইউক্রেইনের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এলাকা।
পুতিনের সঙ্গে আলাস্কার বৈঠকে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছার জন্য ইউক্রেইন এবং রাশিয়া দুই পক্ষকেই ‘কিছু ভূখন্ড ছাড় দিতে হতে পারে’ এবং এই ‘ভূমি বিনিময়’ -এর বিষয় নিয়েই বৈঠকে ট্রাম্প কথা বলবেন বলে গত শুক্রবার জানিয়েছিলেন।
তবে ট্রাম্প এই ভূমির কথা বলতে কোন অঞ্চলগুলোকে বোঝাচ্ছেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। ইউক্রেইন রাশিয়াকে কোনও ভূমি ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। রাশিয়াও ভূমি ছাড়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত বুধবার ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট এবং ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। এরপর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, ট্রাম্প তাদের কাছে পরিষ্কার করে বলেছেন যে, ইউক্রেইনের ভূমির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে ছাড়া তিনি কোনও আলোচনা করবেন না এবং ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি চায়।
আবার ট্রাম্প নিজে এমন কথাও বলেছেন যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি ইউক্রেইনের জন্য কিছু ভূখণ্ড ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করবেন।
তবে ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক থেকে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেইনের মানচিত্রই জোর করে বদলের ঘটনা ঘটতে পারে কিনা তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে।
রাশিয়া ২০১৪ সাল থেকেই ইউক্রেইনের বিশাল ভূখণ্ড দাবি করে আসছে। ওই সময় পুতিন অপেক্ষাকৃত রক্তপাতহীন জবরদখল অভিযানে ইউক্রেইনের ক্রাইমিয়া উপদ্বীপ নিয়ে নিয়েছিলেন। ইউক্রেইনের আর কোন কোন অঞ্চল চান পুতিন?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, মস্কোয় গত সপ্তাহে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে দেওয়া একটি প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছিল ইউক্রেইনের পূর্ব দোনেৎস্ক এবং লুহান্সক অঞ্চলের কথা- দু’য়ে মিলে যে অঞ্চল ডনবাস নামে পরিচিত।
যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে ইউক্রেইনের কাছ থেকে এই অঞ্চলগুলোর বাদবাকী অংশ দাবি করা হয়েছিল প্রস্তাবে। ডনবাসের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে রাশিয়ার দখলে। গত তিন মাসে ওই অঞ্চলে আরও অগ্রগতি হয়েছে রুশ বাহিনীর।
তাদের হামলায় পতনের মুখে দোনেৎস্কের ডেব্রোপিলিয়া শহর। এই অঞ্চল ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেইনের খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া রয়েছে পুতিনের তালিকায়।
দোনেৎস্কের বেশিরভাগ এলাকা এবং লুহান্সকের প্রায় সব এলাকাই মস্কোর দখলে। কিন্তু খেরসন এবং জাপোরিঝিয়ায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আছে মাত্র প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ওই অঞ্চলগুলোর বড় অংশের দখল করেছিল রুশ বাহিনী। ২০২২ সালের শেষদিকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন এবং জাপোরিঝিয়ায় গণভোট করে সেগুলোকে ইউক্রেইনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন পুতিন।
কিন্তু পরে খেরসন এবং জাপোরিঝিয়ার বড় অংশ পুনরুদ্ধার করে ইউক্রেইনের সেনা বাহিনী। এখন সেখানকার অল্প কিছু অংশই রাশিয়ার হাতে রয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে পুতিন কি ইউক্রেইনের নিয়ন্ত্রণে থাকা খেরসন এবং জাপোরিঝিয়ার অংশ কিইভের হাতেই ছেড়ে দেবেন? সেটি স্পষ্ট নয়।
কিন্তু ইউক্রেইনকে এই অঞ্চল ছেড়ে দিতে হলে বিপুল পরিমাণ ভূমি রাশিয়াকে দিয়ে দিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে এই বিশাল অঞ্চলের লোকজন সরিয়ে তা খালিও করে দিতে হবে অথবা তাদেরকে রাশিয়ান হয়ে যেতে হবে।
তাছাড়া, ইউক্রেইন এই অঞ্চলগুলো মস্কোর কাছে ছেড়ে দিলে তারা ক্রাইমিয়ায় পূর্ণ প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং আজভ সাগর নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে।
ক্রাইমিয়ার উপর পুতিনের নজরের মূল কারণ সামরিক ও বাণিজ্যিক। কৃষ্ণসাগর উপকূলে ক্রাইমিয়ার সেবাস্তিপোল বন্দর শীতের সময়ও সচল থাকে। মূল রুশ ভূখণ্ডের কোনও বন্দরে সেই সুবিধা নাই।
২০১৪ সালে ঝটিকা অভিযানে ক্রাইমিয়া উপদ্বীপ দখল করে গণভোট করিয়ে একে রুশ ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিল পুতিন সরকার। ২০১৮ সালে কের্চ সেতুর যান চলাচলের অংশ উদ্বোধন করেন পুতিন। তার দু’বছর পর সেতুতে রেল পরিবহণ চালু হয়।
ফলে ক্রাইমিয়া, আজভ সাগর কিংবা কৃষ্ণ সাগর অঞ্চল রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানকার কোনও এলাকা ছাড়তে পুতিন নারাজ হওয়ারই কথা।
দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া ছাড়াও খারকিভ, সুমি, মিকোলাইভ এবং নিপ্রোপেট্রোভস্কের কিছু অঞ্চলও রাশিয়ার দখলে আছে। ডনবাসের ক্রামাটোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কের মতো শহরেও অবিরাম হামলা চালানোর চেষ্টা করছে রুশ বাহিনী।
এক বছর আগেই পুতিন যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইউক্রেইনের মানচিত্র বদলের কথা বলেছিলেন। এবার আলাস্কা বৈঠকে তিনি সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।