Published : 26 Nov 2025, 09:19 PM
ইতালির ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে এবার যোগ হল নারী হত্যার অপরাধ। শুধুমাত্র নারী বা মেয়ে হওয়ার কারণে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার জন্য নতুন আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ইতালিতে পার্লামেন্টের ভোটে এ সংক্রান্ত বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে মঙ্গলবার। দিনটি ছিল আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। আর এদিনেই ইতালির পার্লামেন্টে ‘নারী হত্যায় শাস্তির বিধান রেখে’ বিলটি পাস হয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, ফেমিসাইড বা নারী হত্যা নিয়ে আলোচনার সূচনা আগেই হয়েছিল; তবে ২০২৩ সালে ২২ বছর বয়সী এক নারী জিউলিয়া চেকেত্তিন তার সাবেক প্রেমিকের হাতে হত্যার শিকার হওয়ার পর এমন হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রনয়ণের দাবি জোরদার হয়।
সাবেক প্রেমিক ফিলিপ্পো তুরেত্তা ওই নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে দেহ ব্যাগে ভরে লেকের ধারে ফেলে গিয়েছিল। ঘটনাটি তুরেত্তার গ্রেপ্তার পর্যন্ত ইতালির শীর্ষ খবরে ছিল।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সাড়া ফেলে জিউলিয়ার বোন এলেনার শক্ত অবস্থান, তিনি বলেছিলেন, হত্যাকারী “দানব নয়”, বরং “পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সুস্থ সন্তান”। তার এ কথাই ইতালিজুড়ে জনতাকে রাস্তায় নামায় এবং তারা পরিবর্তন দাবি করেন।
বিবিসি লিখেছে, দুই বছর পর তীব্র আলোচনা ও দীর্ঘ অধিবেশন শেষে পার্লামেন্টের এমপি’রা নারী হত্যা-কে আলাদা অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে নারী হত্যাকে আলাদা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হাতে গোনা কয়েকটি দেশের কাতারে উঠে এল ইতালি।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বিলটি পার্লামেন্টে উথ্থাপন করেছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি সরকার এবং বিরোধী এমপি’রাও আইনটিকে সমর্থন করেছেন। সহিংসতায় নিহত নারীদের স্মরণে অনেকে লাল ফিতা বা লাল পোশাক পরেন।
এখন থেকে নারীর লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড আলাদাভাবে নথিবদ্ধ হবে। বিচারক পাওলা দি নিকোলা বলেন, “এই অপরাধগুলো এখন স্বীকৃতি পাবে, প্রাসঙ্গিকভাবে বিশ্লেষিত হবে, এবং অদৃশ্য আর থাকবে না।”
সম্প্রতি নারী হত্যার ২১১টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে ‘ফেমিসাইড’বিলের খসড়া তৈরি করেছিল একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন। ওই বিশেষজ্ঞ দলেই ছিলেন বিচারক পাওলা দা নিকোলা।
তার মতে, এ ধরনের হত্যার ঘটনার ক্ষেত্রে প্রেমের টানাপড়েন বা প্রবল ঈর্ষাকে কারণ হিসাবে দাঁড় করানোটা আসলে এক ধরনের বিকৃতি। তিনি বলেন, “নতুন আইন প্রণয়ণের মানে হল, আমরা ইউরোপে প্রথম অপরাধীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য চিহ্নিত করেছি, তা হল ক্ষমতা ও আধিপত্য।”
ইতালির নতুন আইন অনুযায়ী, নারীর প্রতি ঘৃণা, বৈষম্য, আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ বা সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্তের প্রতিশোধ হিসেবে সংঘটিত হত্যাই ফেমিসাইড হিসেবে গণ্য হবে।
সর্বশেষ সরকারি তথ্যে দেখা যায়, গত বছর দেশে ১১৬ নারীকে হত্যা করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১০৬টি ছিল উদ্দেশ্যমূলক। এখন এসব ঘটনা আলাদাভাবে নথিবদ্ধ হবে এবং এর সাজা হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রযোজ্য হবে।
খুনের শিকার হওয়া নারী জিউলিয়ার বাবা জিনো চেকেত্তিন বলেন, তিনি জানেন যে, আইনটি তার মেয়েকে হয়ত ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তবে যাই হোক খুনির যাবজ্জীবন সাজা হবে।
তবে তিনি মনে করেন, সামাজিকভাবে বিষয়টি আলোচনা হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। বিবিসি-কে তিনি বলেন, “আগে কেন্দ্র কিংবা ডানপন্থিদের অনেকেই ‘ফেমিসাইড’ শব্দটা শুনতে চাইত না। এখন আমরা সে বিষয়ে কথা বলতে পারছি—ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু জরুরি।”
আইনের পাশাপাশি তার অগ্রাধিকার শিক্ষায়। মেয়ে খুন হওয়ার পর তিনি নিজের চারপাশ দেখে সিদ্ধান্ত নেন, জিউলিয়ার নামে একটি ফাউন্ডেশন গড়বেন, যা সচেতনতার মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করবে।
চেকেত্তিন বলেন, সমাজে নারীদের নিয়ে বিপুল সংখ্যক স্টেরিওটাইপ, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আর তরুণদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতাই এর পেছনে ভূমিকা রাখে।
তার মেয়েকে সাবেক প্রেমিক শাস্তি দিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে, কারণ সে সম্পর্ক পুনরায় শুরু করতে রাজি হয়নি। এখন মেয়ের বাবা ইতালির স্কুল-কলেজ ঘুরে তরুণদের সঙ্গে আচরণ, সম্মান ও সম্পর্কের শিক্ষা নিয়ে কথা বলেন।
তবে শিক্ষাক্রমে বাধ্যতামূলক আবেগগত ও যৌন শিক্ষা চালু করায় বাধা দিচ্ছেন ডানপন্থি এমপিরা। ‘ফেমিসাইড’ সংক্রান্ত নতুন আইন নিয়ে সমালোচনাও আছে।
ফগিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভ্যালেরিয়া তোরে মনে করেন, নারীদের সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনে ঘাটতি নেই, বরং নতুন আইন বেশ অস্পষ্ট এবং এর প্রয়োগ কঠিন হবে।
তিনি বলেন, নারীদের বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড সঙ্গী বা সাবেক সঙ্গীর হাতে ঘটে—তাই হত্যাটি উদ্দেশ্যমূলক ছিল কি না, তা প্রমাণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
সহিংসতা প্রতিরোধে নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন লিঙ্গ-অধিকার কর্মীরা।
এদিকে রোমের ‘মিউজিয়াম অব প্যাট্রিয়ার্কি’ প্রদর্শনীতে ইতালির বৈষম্যের নানা দিক ফুটে উঠেছে। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে দেশটি বর্তমানে ৮৫তম, ইইউ’র মধ্যে প্রায় সর্বনিম্ন।
অ্যাকশন এইড ইতালির ফাবিয়ানা কস্তান্তিনো বলেন, “সহিংসতা থামাতে হলে সমতা গড়ে তুলতে হবে। সহিংসতার ধরন অনেক, একটি পিরামিডের মতো। এর নিচের স্তর ভাঙতে পারলেই ফেমিসাইড, ঠেকানো সম্ভব।”
বিচারক দি নিকোলার ভাষায়, “নতুন বিল সর্বসম্মতভাবে পাসের বিষয়টি প্রমাণ করে, নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইতালি একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে এসেছে।”
“ইতালি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলছে, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা আর সহ্য করা হবে না। বহুদিন পর দেশটি এমন একটি সমস্যা নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে, যা এতদিন আড়ালে ছিল,” বলেন তিনি।