Published : 20 May 2026, 11:45 AM
দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনায় বুধবার বেইজিংয়ে এক সম্মেলনে একত্রিত হচ্ছেন চীন ও রাশিয়ার দুই শীর্ষ নেতা, যা শেষ হবে চা নিয়ে দুই ‘পুরনো বন্ধুর’ একান্ত আড্ডার ভেতর দিয়ে।
চীনের রাজধানীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দুই দিনের সফরের পরপরই বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে হতে যাওয়া এ বৈঠকের দিকে নজর থাকবে গোটা বিশ্বের। চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি থাকবে দুই সফরের তুলনাও।
সফররত নেতাদের চা দিয়ে আপ্যায়িত করার খ্যাতি রয়েছে শি-র, কিন্তু সে বৈঠকের পরিবেশ আর ধরনেই বোঝা যেতে পারে চীনের নেতা অতিথিকে কতটুকু কদর করছেন, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
২০২৪ সালের মে মাসে শি যখন পুতিনকে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন, সেবার দুই নেতা আনুষ্ঠানিক ভাবগাম্ভীর্যকে দূরে ঠেলে দিয়ে এক সময়কার রাজকীয় বাগান ঝোংনানহাইয়ে চা খেতে খেতে খোলামেলা আলাপে মেতেছিলেন।
এই ঝোংনানহাইতেই এখন চীনের ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারের বিভিন্ন কার্যালয় অবস্থিত।
গত সপ্তাহে একই গোপন বাগানে ট্রাম্প যখন হাঁটছিলেন, এবং চা খাচ্ছিলেন, এমনকী টেম্পল অব হেভেনে তার সফরও যেন ছিল অনেক বেশি সাজানো গোছানো, আনুষ্ঠানিকতায় মোড়া।
“এই ধরনের দৃশ্যপট বেইজিং দারুণ পছন্দ করে। তারা বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকতে পছন্দ করে এবং যতটা সম্ভব, দেশের দর্শকদের কাছেও তারা এটা তুলে ধরে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করবে। কোনো কোনো দিক থেকে দেখলে, শি ওই দুই বিশ্ব নেতার মানসিক অস্থিরতার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন,” বলেছেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রশান্ত মহাসাগর বিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ ফেলো গ্রায়েম স্মিথ।
রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে তুমুল প্রতিপক্ষ—বিশ্বের এমন দুই শীর্ষ প্রভাবশালী দেশের নেতার পরপর বেইজিং সফর, চীনের গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। তারা একে ক্রমশ ভঙ্গুর বিশ্ব ব্যবস্থায় চীনের শক্তিশালী অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুতিনকে চীনে স্বাগত জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। রানওয়েতে হওয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে সেনাদলের অনার গার্ড প্রদর্শনের পাশাপাশি চীনা তরুণ-তরুণীরা চীন-রাশিয়ার পতাকা দুলিয়ে রুশ প্রেসিডেন্টকে বরণ করে নেয়।
পুতিন শি-কে বলে আসছেন ‘প্রিয় বন্ধু’, অন্যদিকে চীনের নেতার কাছে তিনি ‘পুরনো বন্ধু’। এই বন্ধুত্বের বাতাবরণের মধ্যে রুশ প্রেসিড্ন্টে এমন এক সময়ে বেইজিংয়ে নামলেন যখন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এ বছরের প্রথম চার মাসে দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫ সালে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য হয়েছিল ২৪ হাজার কোটি ডলারের, যা আগের বছরের রেকর্ড বাণিজ্যের তুলনায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কম ছিল। ৫ বছরে এমন উল্টোরথ দেখেনি মস্কো-বেইজিং।
ইউক্রেইনে অভিযান ও এর কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত মস্কোর কাছে চীন ‘অর্থনৈতিক লাইফলাইন’, তাই পুতিনও বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে উত্তরোত্তর উন্নতি চান।
এবারের সফরে একাধিক উপপ্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যাংকের প্রধানরা তার সঙ্গী হয়েছেন।
রয়টার্স লিখেছে, পুতিনের এবারের সফর ঘিরে ক্রেমলিনের ‘প্রত্যাশা ব্যাপক’। রুশ প্রেসিডেন্টের এ সফরে কেবল চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকই থাকছে না; আরও থাকছে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান, ভোজসভা। একেবারে শেষে থাকবে চা পান পর্ব, এখানে দুই নেতা অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে খোলামেলা কথা বলবেন।
৪০টির মতো নথি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে, এরপর ৪৭ পৃষ্ঠার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হবে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।
বহুমেরুর বিশ্ব ব্যবস্থা এবং ‘নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ গড়ে তোলা নিয়ে পুতিন ও শি এক যৌথ ঘোষণা দিতে পারেন বলেও প্রত্যাশা করা হচ্ছে, বলেছেন ক্রেমলিনের এক কর্মকর্তা।
রাশিয়ার সঙ্গে চীনের উত্তরাঞ্চলকে সংযুক্ত করা গ্যাস পাইপলাইন পাওয়ার অব সাইবেরিয়া টু নিয়ে আলোচনা চলছে; পুতিনের এবারের সফরে এ পাইপলাইন নিয়েও বড় ঘোষণা আসতে পারে বলে অনেক শিল্পখাত বিশেষজ্ঞ ধারণা করছেন।
ইউক্রেইনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরুর পর মস্কোকে শাস্তি দিতে পশ্চিমারা ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা দিলে এর পাল্টায় চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ‘সীমাহীন অংশীদারিত্ব’ ক্রমশ মজবুত হতে থাকে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়ার যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সরবরাহে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা রাশিয়ার ওই পাইপলাইনের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিতে পারে; তবে এরপরও বেইজিং বৈচিত্রপূর্ণ উৎস থেকে জ্বালানি নেওয়ার কৌশলেই অটুট থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।