৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

ডাইনোসরের আগের যুগে সমুদ্রতলে ছিল এই অদ্ভুত উভচর প্রাণী

এর আগে, সামুদ্রিক জীবনযাত্রার অস্তিত্ব নির্দেশ করে এমন কোনো উভচর প্রাণীর জীবাশ্মের প্রমাণ মেলেনি।

ডাইনোসরের আগের যুগে সমুদ্রতলে ছিল এই অদ্ভুত উভচর প্রাণী

প্রাণীটির বিস্তৃত মুখমণ্ডলে ইঙ্গিত মেলে, এটা সমুদ্রের তলদেশে ওত পেতে শিকার ধরা এক ধরনের প্রাণী ছিল। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Oct 2026, 11:47 AM

Updated : 30 Oct 2026, 11:46 AM

আর্দ্র ও সংবেদনশীল ত্বকের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস ও পানি পানের জন্য স্বাদুপানির ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় উভচর প্রাণীদের।

সামুদ্রিক পানির অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে বর্তমানে টিকে আছে বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এমন পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক জীবনধারার কোনো উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব এ যাবতকালে জানা ছিল না।

নতুন এক আবিষ্কার সেই ধারণা আমূল বদলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

চীনের গুইঝাউ প্রদেশে প্রায় ২৩ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে ট্রায়াসিক যুগের এক পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক উভচর প্রাণীর প্রায় দুটি সম্পূর্ণ কঙ্কালের সন্ধান মিলেছে।

গোলাকার, চ্যাপ্টা ও শক্ত বর্মওয়ালা দেহের এ প্রাণীটির বিস্তৃত মুখমণ্ডলে ইঙ্গিত মেলে, এটা সমুদ্রের তলদেশে ওত পেতে শিকার ধরা এক ধরনের প্রাণী ছিল।

‘গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাস’ নামের এ প্রাণীর দৈর্ঘ্যে ছিল প্রায় ৩০ ইঞ্চি বা ৭৫ সেন্টিমিটার। ডাইনোসরদের আবির্ভাবের আগেই পৃথিবীতে এর বিচরণ ছিল।

Image

এ প্রাণীর দৈর্ঘ্যে ছিল প্রায় ৩০ ইঞ্চি বা ৭৫ সেন্টিমিটার। ছবি: রয়টার্স

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’-এ।

এ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস’-এর প্যালিয়োবায়োলজিস্ট রিয়োসুকে মোতানি বলেছেন, “এ গবেষণার সবচেয়ে বড় তথ্য হল, পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক জীবন কাটানো এক প্রাচীন উভচরের সন্ধান পাওয়া।”

সমুদ্রের তলদেশের পলি থেকে তৈরি পাথরের স্তর ভেঙে কঙ্কাল দুটি উদ্ধার হয়। একই জায়গায় ‘গুইঝাউইখথিওসরাস’ নামের প্রায় ২৩ ফুট দীর্ঘ এক সামুদ্রিক সরীসৃপের জীবাশ্মও মিলেছে।

সমুদ্রের শীর্ষ শিকারি এসব দানবীয় প্রাণীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতেই সম্ভবত উভচরটির বিবর্তনে শক্ত হাড়ের বর্ম তৈরি হয়েছিল।

প্রাণীটির মুখের গঠন ও গলার হাড়ের বিন্যাস থেকে জানা যায়, এটা চুষে খাবার গ্রহণ করত। পানির তলদেশের প্রাণীরা মুখের ভেতরের ফাঁকা জায়গা দ্রুত প্রসারিত করে চাপ কমিয়ে শিকারসহ পানি ভেতরের দিকে টেনে নেয়।

গবেষণার সহ-লেখক ও ‘পেকিং ইউনিভার্সিটি’র প্যালিয়োন্টোলজিস্ট দা-ইয়ং জিয়াং বলেছেন, “এর মাথার খুলিটি চ্যাপ্টা ও বিস্তৃত। বড় মুখে রয়েছে বহু ছোট ছোট শঙ্কু আকৃতির দাঁত।

“এটা সমুদ্রের কাদা বা পলিওয়ালা তলদেশের প্রাণী ছিল। পাশ দিয়ে সাঁতরে যাওয়া মাছ, কৃমি বা সম্ভবত স্কুইড জাতীয় যে কোনো প্রাণীকেই এটা দ্রুত গিলে ফেলত।”

গবেষক মোতানি বলেছেন, বর্তমান যুগের ‘ওবেগং’ নামের তলদেশে থাকা চোষক হাঙরের সঙ্গে এ বিলুপ্ত প্রাণীটির কাজের ধরনের বেশ মিল রয়েছে।

গবেষকরা বলেছেন, বর্মওয়ালা স্বাদুপানির পূর্বপুরুষ থেকেই বিবর্তিত হয়ে সমুদ্রের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল ‘গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাস’।

এর আগে, স্বাদুপানিতে বাস করা এর কাছাকাছি প্রজাতির বর্মওয়ালা উভচরের ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছিল।

যেভাবে সমুদ্রের লবণাক্ততা জয় করেছিল এরা

ব্যাং, স্যালামান্ডার এবং পা-হীন সিসিলিয়ানসহ বর্তমান পৃথিবীতে আট হাজারের বেশি প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি নোনা ও মিষ্টি পানির মিশ্রণে বা নদীর মোহনায় টিকে থাকতে পারলেও দুই শতাংশেরও কম উভচর নোনা পানি সহ্য করার সক্ষমতা রাখে।

তবে এদের কেউই পুরোপুরি সামুদ্রিক পরিবেশে বাস করে না। আগে কখনোই সামুদ্রিক জীবনযাত্রার অস্তিত্ব নির্দেশ করে এমন কোনো উভচর প্রাণীর জীবাশ্মের প্রমাণ মেলেনি।

উভচর প্রাণীর ত্বক সংবেদনশীল ও বহুমুখী কাজ সম্পন্ন করে থাকে। যার মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ ও পানি পান করার মূল মাধ্যম হিসেবে ত্বক কাজ করে।

গবেষক মোতানি বলেছেন, “সমুদ্রের নোনাপানিতে তাদের ত্বক স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। কোনো ব্যাঙ যদি সমুদ্রের পানিতে সাঁতার কাটে তবে অসমোটিক চাপের কারণে সমুদ্রের নোনাপানি এর দেহের ভেতরের পানি টেনে নেয়।

“একই কারণে তারা পানি পানও করতে পারে না। ফলে দেহের ওজন কমতে থাকে ও সুস্থ হতে একে আবার স্বাদুপানিতে ফিরে আসতে হয়। এ শারীরিক সীমাবদ্ধতাই উভচরদের পুরোপুরি সামুদ্রিক হয়ে উঠতে বাধা দেয়।”

তবে ‘এক্সাপ্টেশন’ নামের এক জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বাধা জয় করেছিল প্রাচীন ‘গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাস’। এ প্রক্রিয়ায় জীবদেহের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য এক কাজের জন্য বিবর্তিত হলেও পরবর্তীতে ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

মোতানি বলেছেন, “স্বাদুপানির এমন একটি উভচর প্রাণী ছিল, যার দেহে সমুদ্রে টিকে থাকার প্রয়োজনীয় হাতিয়ার বা বর্ম ছিল। স্বাদুপানিতে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতেই এই বর্মের বিবর্তন হয়েছিল।

“পরবর্তীতে এই বংশধররা যখন অপেক্ষাকৃত বেশি লবণাক্ত জলসীমায় প্রবেশ করে তখন বর্মটিই তাদের লোনাপানির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। ঠিক যেভাবে মানুষ পানির নিচে অনুসন্ধানের জন্য ডাইভিং স্যুট পরে থাকে এটাও তেমনই কাজ করেছিল।”

বর্ম থাকার কারণে প্রাণীর ত্বকের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি শুষে নেওয়া বাধাগ্রস্ত হত। ফলে প্রাণীটি মুখ দিয়ে নোনাপানি পান করত ও পরবর্তীতে এর ফুলকার সাহায্যে সেই লবণের পরিমাণ ছেঁকে ফেলে দিত।

জীবাশ্মের ইতিহাসে এমন বহু স্থলচর বা স্বাদুপানির জলজ প্রাণী মিলেছে, যাদের মৃত্যুর পর মৃতদেহ ভেসে সমুদ্রে চলে গিয়েছিল।

গবেষকরা বলছেন, উভচর এ প্রাণীটি খাঁটি সামুদ্রিক জীব ছিল। কারণ এর হাড় পরীক্ষা করে ট্রায়াসিক যুগের সমুদ্রের পানির রাসায়নিক ছাপ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে, প্রাণীটি মহাসাগরেই বেড়ে ওঠে ও জীবন কাটিয়েছিল।

নতুন এ প্রজাতি সম্পর্কে গবেষক মোতানি বলেছেন, “প্রাণীটি তার নিজস্ব এক অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এর আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর অনন্য ও কিছুটা কৌতুকপূর্ণ শারীরিক গঠনে।

“আমি কখনো কল্পনাই করিনি যে ইখথিওসরের মতো জলজ দানবদের সঙ্গে কোনো উভচর প্রাণীর সহাবস্থান থাকতে পারে। কেবল এ বিষয়টিই আমার মনে গভীর দাগ কেটেছে।”