‘মিউজ’ এআই এজেন্টের সেবায় মানুষ যোগ করবে মেটা?
বাজারে আসার পর গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ ডাউনলোডের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে মেটার মিউজ এআই এজেন্টটি।
মেটা তাদের নতুন ব্যক্তিগত এআই সহকারী মিউজ-এর জন্য মানব কর্মীভিত্তিক সেবা পরীক্ষা করছে, যার মাধ্যমে ডিজিটাল এজেন্টের সাহায্যে করা কিছু ফোন কল গোপনে মানুষের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে।
রয়টার্সের দেখা কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ কিছু পোস্ট থেকে জানা গেছে, ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানিটি গেল সপ্তাহে মিউজের জন্য একটি ফোন-কলিং ফিচার চালুর পরপরই কর্মীদের বিষয়টি সম্পর্কে জানায়।
বাজারে আসার পর গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ ডাউনলোডের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে মেটার মিউজ এআই এজেন্টটি।
ব্যবহারকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমেইল পাঠানো, কেনাকাটা করা ও ভ্রমণের টিকিট বুকিংয়ের মতো বিভিন্ন কাজ যাতে সম্পন্ন করতে পারেন সেজন্য মিউজ তৈরি করেছে মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা।
ফোন-কলিং ফিচারের মাধ্যমে একজন মিউজ ব্যবহারকারী এজেন্টটিকে মার্কিন ব্যবসার বিভিন্ন নম্বরে কল করতে ও অপরপ্রান্তে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলে চুল কাটা বুক করা, কোনো দোকানে কোনো পণ্যের স্টক আছে কি না তা যাচাই করা বা বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে দরদাম নেওয়ার মতো কাজ করার নির্দেশ দিতে পারে।
অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পোস্টে দেখা গেছে, মানুষ দিয়ে এসব কল পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে কিছু কর্মী প্রাইভেসি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, এ পদ্ধতির ফলে কল সেন্টারে থাকা মানব ঠিকাদারদের কাছে অজান্তেই সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
একজন কর্মী অভ্যন্তরীণ পোস্টে লিখেছেন, “ফিচারটি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ার কোনো কারণ আমার বোধগম্য নয়। আমরা অপ্রয়োজনীয় তথ্য মানব কলারদের কাছে লিক হয়ে যাওয়ার মতো বাগের থেকে কেবল এক ধাপ দূরে আছি।”
আরেকজন কর্মী ইন্টারনেট ও কেবল প্রদানকারী সংস্থাকে কল করে তার বিলের বিষয়ে দরকষাকষি করতে মিউজকে বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, আলাপের ট্রান্সক্রিপ্টে দেখা গেছে, সেই মানব প্রতিনিধি কথা বলার সময় বর্ণবাদী মন্তব্য করেছিলেন।
এর জবাবে, মেটার ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ল্যাবস’ ইউনিটের একজন সহ-সভাপতি বলেছেন, যথাযথ প্রকাশ ছাড়াই ঠিকাদার-পরিচালিত কল পরীক্ষা শুরু করাটা ‘ভুল ছিল’ ও কোম্পানি আপাতত ফিচারটি ‘বাতিল’ করে নিয়েছে।
তিনি তার পোস্টে বলেছেন, মেটা এখনও ‘এআই কলিংয়ের মানোন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে’। কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে মানুষ দিয়ে কল করালে সাফল্যের হার এআইভিত্তিক কলিংয়ের ‘নিম্ন শতাংশের’ তুলনায় বেড়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
এ ছাড়া, মিউজের ওই কলে বর্ণ সংক্রান্ত প্রসঙ্গ উত্থাপনের বিষয়টি যিনি জানিয়েছিলেন সেই কর্মীর কাছেও তিনি ক্ষমা চেয়েছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এর সঙ্গে জড়িত ‘হিউম্যান এজেন্ট’ ভবিষ্যতে মেটা’র কোনো প্রকল্পে কাজ করবেন না।
এআই চমকের আড়ালে মানুষের শ্রম
‘মিউজ টেস্ট’ এমন এক পরিস্থিতির আভাস দেয়, যেখানে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি স্বয়ংক্রিয় এআইয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পর্দার আড়ালে মানুষের শ্রমের ওপর নির্ভর করে, বিশেষ করে যখন ‘রোবো-কল’ বা স্বয়ংক্রিয় কলের গ্রহীতারা এতে সাড়া দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।
ঘটনাটি প্রায় এক দশক আগে মেটার করা আরেকটি পুরনো পরীক্ষার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ওই সময় ফেইসবুক নামে পরিচিত কোম্পানিটি তাদের মেসেঞ্জার সেবামুখী ‘এম’ নামের এক ডিজিটাল সহকারী ট্রায়াল চালিয়েছিল।
পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছিল, ওই এজেন্টের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজই মানুষের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হত।
মিউজের ‘হিউম্যান কনসিয়ার্জ’ পরিকল্পনা সম্পর্কে মেটার একজন মুখপাত্র বলেছেন, কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া ‘ইতিবাচক’। এ পরীক্ষার উদ্দেশ্য, এসব ‘ফিচার জনসম্মুখে প্রকাশের আগে সেগুলোর নিরাপত্তা ও প্রাইভেসি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ও সেগুলোর মান বাড়াতে মতামত সংগ্রহ করা’।
মুখপাত্র ড্যানিয়েল রবার্টস বলেছেন, “এ সম্ভাব্য কলিং ফিচারের মান উন্নত করতে আমরা মার্চেন্টদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি ও ফিচারটি পুরোপুরি প্রস্তুত ও যথাযথ সতর্কতা নিশ্চিত করা গেলে কেবল তখনই তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে।”
বাজার গবেষণা কোম্পানি ‘সেন্সর টাওয়ার’-এর দেওয়া তথ্য অনুসারে, মেটার মিউজ এজেন্টটি বাজারে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৫ লাখেরও বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।
ফিচার ও এআইয়ের সাফল্যের পর থেকে কোম্পানির শেয়ারদর ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সর্বশেষ সমাপনী পর্যন্ত এতে কোম্পানির বাজার মূলধন ২০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি যোগ হয়েছে, যা গেল সাত মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর।
এদিকে, মঙ্গলবার মেটার শেয়ারের দর ০ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
প্রধান বিক্রি পয়েন্টে ধাক্কা
মিউজ চালুর সময় মেটা এআই সহকারীর নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছিল। তারা সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের বলেছিল, প্রতিটি এজেন্টের নিজস্ব নিরাপদ ‘ভার্চুয়াল মেশিন’ বা ক্লাউডে ডেডিকেটেড কম্পিউটার থাকবে, যা ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন সেশন আলাদা রাখতে ডিজাইন করা হয়েছে।
এ ছাড়া, পাসওয়ার্ডের মতো সংবেদনশীল বিভিন্ন তথ্য আলাদা নিরাপদ স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হবে।
মেটার ভেতরে ‘হিউম্যান কনসিয়ার্জ’ পরিকল্পনাটির সমালোচনা করা কর্মীরা তাদের ফিডব্যাক দেওয়ার সময় ঠিক এ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাই তুলে ধরেছেন।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে এই এজেন্টের মূল বিক্রয় পয়েন্ট বা ‘ইউনিক সেলিং প্রোপজিশন’ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মেটা অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পোস্ট থেকে জানা গেছে, অগাস্টে মেটা তার কর্মীদের দিয়ে ফোন-কলিং সক্ষমতার পরীক্ষা শুরু করে ও অ্যাপটি আত্মপ্রকাশের পরপরই ধীরে ধীরে তা মিউজ ব্যবহারকারীদের জন্য চালু করে।
তবে কিছু ব্যবহারকারী এসব কল নিয়ে নানা সমস্যার কথা বলেছেন। যেমন, একজন কর্মী বলেছেন, তিনি তার বিমা সংস্থায় কল করার চেষ্টা করেছিলেন ও ‘তারা যখনই শুনতে পায় যে এটা এআই তখনই মিউজের মুখের ওপর ফোন কেটে দিয়েছে’।
অভ্যন্তরীণ পোস্ট অনুসারে, এ ধরনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে মেটা গেল সপ্তাহে তাদের অর্ধেক কর্মীর জন্য ‘হিউম্যান এজেন্ট কল’ ফিচারটি চালু করেছিল।
কর্মীদের কাছে ফিচারটি ঘোষণা করে দেওয়া পোস্টে বলা হয়েছে, “মিউজ এখন কোনো অনুরোধ একজন প্রশিক্ষিত এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করতে পারে, যিনি কলটি প্লেস করে কাজটি সম্পন্ন করেন।”
ওই পোস্টে আরও বলা হয়, যেসব কর্মী এ প্রক্রিয়ায় যোগ হতে চাননি, তাদের জন্য অপ্ট-আউট বাছাই করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
