বাইন্যান্সে হ্যাকিংয়ের অস্ত্র ছিল এআই টুল আর চাকরির লোভ
এ সাইবার হামলা কোনো একদিনের হঠাৎ আক্রমণ ছিল না, বরং মাসজুড়ে নিখুঁত ও চতুর পরিকল্পনায় এই হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনার শুরু এ বছরের জুনে।
ডিজিটাল সম্পদে রেকর্ড ৬৩৪ কোটি ডলার ক্রিপ্টো চুরির সেই সাইবার হামলার বিষয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে ঘটসার শিকার ও বিশ্বের শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স।
বিবৃতিতে কোম্পানিটি বলেছে, ২৯ অক্টোবরের ওই নজিরবিহীন চুরি ও হামলার পেছনে মূল কারিগর ছিল উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার দল, যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
বাইন্যান্সের দাবি, এ সাইবার হামলা কোনো একদিনের হঠাৎ আক্রমণ ছিল না, বরং মাসজুড়ে নিখুঁত ও চতুর পরিকল্পনায় হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনার শুরু এ বছরের জুনে।
বাইন্যান্সের ওয়ালেট অবকাঠামোতে কর্মরত একজন প্রকৌশলী সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে জনপ্রিয় এক এআই কোডিং টুল খুঁজছিলেন। সেখানে অসাবধানতাবশত তিনি এক ‘হোমব্রু’ ইনস্টলেশন ফাইল ডাউনলোড করে ফেলেন, যেটি ছিল হ্যাকিং আক্রান্ত।
কোম্পানিটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ওই সময় অসঙ্গতিটি শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে হ্যাকারদের হাতে চলে যায় ওই প্রকৌশলীসহ বেশ কয়েকজন সহকর্মীর সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য।
এরপর শুরু হয় অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ। সেপ্টেম্বরে হ্যাকারদের পরবর্তী লক্ষ্য হন বাইন্যান্সের আরেক সফটওয়্যার প্রকৌশলী। একটি চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভুয়া ‘প্রজেক্ট ডিরেক্টর’ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ প্রস্তাব পেয়ে ওই প্রকৌশলী দুই ধাপের চাকরির ইন্টারভিউতে অংশ নিতে রাজি হন।
প্রথম ধাপে একজন ছদ্মবেশী এইচআর প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি লাইভ ভিডিও কলে কথা বলেন তিনি। প্রকৌশলীর আস্থা পেতে ওই হ্যাকার নিজের একটি ভুয়া ব্যক্তিগত সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টও তার সঙ্গে শেয়ার করেন।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে, একটি চ্যাটিং অ্যাপের মাধ্যমে ভুয়া কোম্পানির সিইওর সঙ্গে তার চূড়ান্ত সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। সেই ভুয়া সিইও প্রকৌশলীকে একটি কাজ পাঠান। আর কাজের ফাইলটি কম্পিউটারে ইনস্টল বা সেটআপ করার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে লুকিয়ে থাকা ম্যালওয়্যারটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
হামলার কৌশল ব্যাখ্যায় বাইন্যান্স বলেছে, ম্যালওয়্যারটি সিকিউরিটি অ্যালার্ট বা শনাক্তকরণ এড়াতে ‘জটিল ও অস্পষ্ট ফাঁকি দেওয়ার এক কৌশল’ ব্যবহার করেছিল।
“সাইবার অপরাধীরা কমান্ড কার্যকর করার জন্য সিস্টেমের আসল একটি ডেভেলপমেন্ট টুল সরিয়ে সেটির জায়গায় ম্যালওয়্যার সংস্করণ বসিয়ে দিয়েছিল।
“ম্যালওয়্যারটি নিজস্ব কাজ সম্পূর্ণ গোপনে পরিচালনা করত ও কাজ শেষ করার পর সিস্টেম হ্যাকিংয়ের যাবতীয় ডিজিটাল আলামত স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলত।
নজিরবিহীন এ চুরির ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার ছদ্মবেশ নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
২০ অক্টোবর সাইবার অপরাধীরা ওই সফটওয়্যার প্রকৌশলীর হ্যাকড কম্পিউটার ব্যবহার করে বাইন্যান্সের অভ্যন্তরীণ এআই টুলে প্রবেশ করে। এরই মাধ্যমে তারা প্রথম প্রকৌশলী ও তার আরেক সহকর্মীর কম্পিউটারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নেয়।
এরপর ২৯ অক্টোবর হ্যাকাররা তৃতীয় ওই প্রকৌশলীর কম্পিউটারে লগইন করে। সেখানে তারা প্রথম ওয়ালেট প্রকৌশলীর কাছ থেকে চুরি করা গোপন তথ্য ব্যবহার করে ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট সক্রিয় করে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালায়।
ঘটনায় ৬৩৪ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদের মধ্যে প্রায় ২৮৫ কোটি ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করতে পেরেছে বাইন্যান্স।
তবে বাইন্যান্স বলেছে, গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করার পরও কিছু সম্পদের লেনদেন বন্ধ করা যায়নি। কারণ সেসব লেনদেন হামলার শুরুতেই অনুমোদিত ছিল।
৩ নভেম্বরের মধ্যে বাইন্যান্স তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ওয়ালেট সিস্টেম ও অভ্যন্তরীণ এআই টুলগুলো সম্পূর্ণ নতুন করে চালু করেছে।
পাশাপাশি, সাইবার হামলার শিকার হওয়া ডিভাইসগুলো পরিবর্তন, হ্যাকড ক্রেডেনশিয়াল ও টোকেন বাতিল এবং কর্মীদের সব ডিভাইসে উন্নত সিকিউরিটি স্ক্যান করেছে বাইন্যান্স।
এ ছাড়া পুরো কোম্পানিটিকে সুরক্ষিত রাখতে এআইচালিত অসঙ্গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সংযোজন করা হয়েছে।
বাইন্যান্স বলেছে, এ হামলার সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি কোম্পানি বহন করবে এবং চুরি হওয়া অর্থের সমপরিমাণ ফান্ড এরইমধ্যেই আলাদা করে রেখেছে তারা।
“চুরি হওয়া টোকেন সম্পদের ৯৮ শতাংশ এরইমধ্যে পুনরুদ্ধার হয়েছে ও অবশিষ্ট সম্পদগুলো বাজার থেকে পুনরায় কিনে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”
