অ্যাপল-গুগলের সঙ্গে সংঘাতের পথে মাস্কের টুইটার?

অ্যাপের লাভ থেকে গুগল বা অ্যাপল যে পরিমাণ অর্থ কেটে রাখে, তা নিয়ে আপত্তি মাস্কের।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Nov 2022, 09:49 AM
Updated : 25 Nov 2022, 09:49 AM

গেল মাসে টুইটারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন চিফ টুইট ইলন মাস্ক; তবে সেই পরিকল্পনা আশা জাগানোর চেয়ে বিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে বেশি।

টুইটারের সেবাগ্রাহকদের সাবস্ক্রিপশন থেকে আসা আয় বাড়াতে চান মাস্ক। আবার মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্মটিকে বাকস্বাধীনতার জন্য উন্মুক্ত করার কথাও তিনি বলছেন। তার নমুনা হিসেবে টুইটারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তিনি তুলে নিয়েছেন।

কিন্তু মাস্ক যে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন, তাতে টুইটার যে বাজারের শীর্ষ টেক জায়ান্ট অ্যাপল ও গুগলের সঙ্গে সংঘর্ষের পথে যেতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে।

উত্তেজনা বাড়ছে

সিএনবিসি লিখেছে, ‘টুইটার ২.০’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাস্ক যে পরিবর্তনগুলো আনতে চাইছেন, তা অ্যাপল ও গুগলের অ্যাপ নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এর ফলে উভয় কোম্পানির অ্যাপ স্টোর থেকে টুইটার অ্যাপ মুছে দেওয়া হতে পারে।

টুইটারের মত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে গুগল ও অ্যাপল যে ‘অ্যাপ স্টোর ফি’ রাখে, মাস্ক টুইট করে সে বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন গত সপ্তাহেই।

“আইওএস/অ্যান্ড্রয়েড ডুয়োপলির কারণে অ্যাপ স্টোরের ফি স্পষ্টভাবেই মাত্রাতিরিক্ত। ইন্টারনেটের ৩০ শতাংশ গোপন ট্যাক্স এটা।”

ওই টুইটে মার্কিন বিচারবিভাগের ‘বাজার প্রতিযোগিতা’ বিভাগকেও ট্যাগ করেছিলেন মাস্ক। মার্কিন বিচারবিভাগ অ্যাপ স্টোর নীতিমালা নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে প্রযুক্তি বাজারে।

অ্যাপের অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কেটে রাখে অ্যাপল ও গুগল। এ বিষয়েই মূল অভিযোগ মাস্কের। সিএনবিসি জানিয়েছে, মাস্ক ৮ ডলারের ‘টুইটার ব্লু’ সাবস্ক্রিপশন সেবার মাধ্যমে আয় বাড়ানোর যে পরিকল্পনা করেছেন, অ্যাপস্টোরের নীতিমালার কারণে তার বড় একটা অংশ যেতে পাতে অ্যাপল-গুগলের পকেটে। তাতে মাস্কের পরিকল্পনা মাফিক আয় বাড়বে না টুইটারের।

অন্যদিকে সম্প্রতি নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট মুছে দিয়েছেন ফিল শিলার। বর্তমানে অ্যাপ স্টোরের দেখভাল করেন অ্যাপলের এই সাবেক বিপণন প্রধান। মুছে দেওয়ার আগে তার টুইটার অনুসারীর সংখ্যা ছিল কয়েক লাখের বেশি।

সিএনবিসি লিখেছে, মাস্ক টুইটারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইতোমধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্টের উপস্থিতি বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। মাস্ক নিজেকে ‘চিফ টুইট; ঘোষণা করার পর প্ল্যাটফর্মটিতে বিদ্বেষমূলক এবং বর্ণবাদী বক্তব্যের উপস্থিতি বেড়েছে লক্ষ্যণীয় হারে।

গবেষণা সংস্থা ‘নেটওয়ার্ক কন্টাজিওন রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর বরাত দিয়ে সিএনবিসি জানিয়েছে, বিদ্বেষপূর্ণ ও বর্ণবাদী ভাবধারার প্রচারকরা বহু প্রচলিত ইমেজবোর্ড ওয়েবসাইট ফোরচ্যানে সংঘবদ্ধ হয়ে টুইটারে কৃষ্ণাঙ্গ ও ইহুদিবিরোধী প্রচার শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এমন বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট বন্ধও করে দিয়েছে টুইটার।

আরও বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে মাস্কের অর্থের বিনিময়ে নামের পাশে নীল ব্যাজ ঝোলানোর পরিকল্পনা থেকে। টুইটার ব্লু সেবার সুযোগ নিয়ে বেশ কিছু ব্যক্তি প্রথমসারির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বহুল পরিচিত ব্যক্তিদের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলায় পিছিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞাপনদাতাদের অনেকে।

আর বিজ্ঞাপনদাতাদের পিছ পা হওয়ার বিষয়টি চোখ এড়ায়নি অ্যাপ স্টোরগুলোর। টুইটারের সাবেক নির্বাহী ইয়োয়েল রথ এ মাসেই নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, “আমি কোম্পানি ছাড়ার সময়েই অ্যাপ রিভিউ টিমের কাছ থেকে কল আসা শুরু হয়ে গিয়েছিল।”

ফি আর সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক আয়

অ্যাপল ও টুইটার জোট বেঁধে কাজ করছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। ২০১১ সালে আইওএস অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে টুইট সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল অ্যাপল। কোম্পানির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের বিষয়গুলো অনেকক্ষেত্রেই টুইট আকারে সরাসরি পোস্ট করা হয় অ্যাপল প্রধান টিম কুকের অ্যাকাউন্ট থেকে। নতুন আইফোনসহ অন্যান্য হার্ডওয়্যার উন্মোচনের আগে টুইটারে বিজ্ঞাপনও দিয়েছে অ্যাপল।

কিন্তু মাস্ক সাবস্ক্রিপশন থেকে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করায় সে ‘সুসম্পর্ক’ এখন নাও থাকতে পারে।

২০২১ সালে টুইটারের আয় হয়েছে ৫০৮ কোটি ডলার। ভবিষ্যতে এর অর্ধেক সাবস্ক্রিপশন থেকে কামানোর পরিকল্পনার কথা বলেছেন মাস্ক। সেক্ষেত্রে টুইটারের সাবস্ক্রিপশন আয়ের একটা বড় অংশ যাবে অ্যাপল-গুগলের পকেটে। দুই টেক জায়ান্টের মোট আয়কে বিবেচনায় নিলে টুইটার থেকে আসা আয় যৎসামান্য; তবে, মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্মটির ওপর এর প্রভাব হবে লক্ষ্যণীয়।

ডিজিটাল কনটেন্টের বেলায় অ্যাপলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালাগুলোর একটি হচ্ছে– আইফোন অ্যাপে কোনো লেনদেন হলে সেক্ষেত্রে অ্যাপলের নিজস্ব লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে গ্রাহক ও নির্মাতাকে। এক্ষেত্রে সাবস্ক্রিপশনের প্রথম বছরে আয়ের ৩০ শতাংশ কেটে রাখে অ্যাপল; দ্বিতীয় বছরে ফি-এর আকার নেমে আসে ১৫ শতাংশে।

অ্যাপলের এই ব্যবসায়িক নীতিমালার বিরোধিতা করে আসছে এপিক গেইমস, স্পটিফাই, ম্যাচ গ্রুপের মতো বিভিন্ন কোম্পানি। অ্যাপলের সঙ্গে একই কাতারে আছে গুগল।

অ্যাপল-গুগলের অ্যাপের অভ্যন্তরীণ লেনদেন থেকে ফি কেটে রাখার বিরোধিতা করে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে মাইক্রোসফট ও মেটা।

সিএনবিসি বলছে, অ্যাপের অভ্যন্তরীণ লেনদেনে আয় খোয়ানো এড়াতে স্পটিফাইয়ের কৌশল বেছে নিতে পারেন মাস্ক। স্পটিফাইয়ের ওয়েব সংস্করণের জন্য ব্যবহারকারীদের ৯.৯৯ ডলার খরচ করতে হয়; অ্যাপলকে এর কোনো ভাগ দেয় না স্পটিফাই, ব্যবহারকারীরা ব্রাউজার থেকে সরাসরি স্পটিফাইয়ের অ্যাপের মাধ্যমে নিজের অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করেন।

আর আইফোন অ্যাপের মাধ্যমে যে ব্যবহারকারীরা প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন প্ল্যান কেনেন, তাদের কাছ থেকে ১২.৯৯ ডলার ফি রাখে স্পটিফাই। কার্যত বাড়তি দাম নিয়ে অ্যাপলের ফি মেটায় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটি।

টুইটার এক্ষেত্রে নেটফ্লিক্সের পথেও হাঁটতে পারে; ২০১৮ সাল থেকে অ্যাপলের মাধ্যমে সাবস্ক্রিপশন সেবা অফার করাই বন্ধ করে দিয়েছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটি।

এছাড়া, মাস্ক কোম্পানির ওয়েবসাইটে আরও কম দামে টুইটার ব্লু সেবা বিক্রি করার কৌশল বেছে নিতে পারেন। সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সেবাটি আইফোন অ্যাপের বদলে ওয়েব সংস্করণেও সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন মাস্ক। এতে অন্তত অ্যাপলকে আয়ের ভাগ দেওয়া এড়াতে পারবে মাস্কের টুইটার।

সেক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের সাবস্ক্রিপশন সেবা প্রসঙ্গে জানানোর নানা বিষয় অ্যাপের ভেতর থেকে মুছে দিতে হবে টুইটারকে।

কনটেন্ট মডারেশন নিয়ে ক্ষমতার লড়াই

অ্যাপের বাজারে অ্যাপল-গুগলের কথাই কার্যত শেষ কথা। কোনো অ্যাপকে অ্যাপস্টোরের অনুমোদন না দেওয়ার ক্ষমতা আছে উভয় কোম্পানির; ক্ষতিকর কনটেন্টের প্রচার এবং কনটেন্ট মডারেশন নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে অ্যাপ স্টোর থেকে বিদ্যমান অ্যাপ ‍মুছে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে তারা।

আগেও এমন পদক্ষেপ নিয়েছে অ্যাপল। ২০২০ সালে মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো এক চিঠিতে বিতর্কিত কনটেন্টের উপস্থিতির কারণে ৩০ হাজার অ্যাপ মুছে দেওয়ার কথা জানিয়েছিল আইফোন নির্মাতা।

এ পরিস্থিতিতে টুইটারের জন্য অ্যাপ স্টোর সংশ্লিষ্ট জটিলতা বড় ‘বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন কোম্পানির সাবেক হেড অফ ট্রাস্ট অ্যান্ড সেইফটি ইয়োয়েল রথ।

অ্যাপের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে ওই অ্যাপ প্ল্যাটফর্মের লেনদেন নীতিমালা মেনে কাজ করছে কি না – এমন নানা কারণ দেখিয়ে অ্যাপ মুছে দিতে পারে অ্যাপল ও গুগল। আর অ্যাপের নতুন পরিবর্তন পর্যালোচনা করে দেখার প্রক্রিয়ার কারণে মাস্ক নতুন ফিচার বাজারজাত করতে চাইলেও বিলম্বের মুখে পড়তে পারেন তিনি।

গত কয়েক বছর ধরে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কনটেন্টের ওপরেও নজরদারি বাড়িয়েছে অ্যাপ স্টোরগুলো। এর আগে তুলনামূলক ছোট সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘পার্লার’ অ্যাপ মুছে দিয়েছিল অ্যাপল ও গুগল। ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার পক্ষে প্রচারণায় সমর্থন দিয়েছিল রক্ষণশীলদের মধ্যে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মটি।

অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরে কোন অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানির ‘এক্সিকিউরিভ রিভিউ বোর্ড’, যার নেতৃত্বে আছেন ফিল শিলার।

অন্যদিকে নভেম্বর মাসে টুইটারের কনটেন্ট মডারেশন টিমের বেশ কিছু সদস্যকে ছাঁটাই করেছেন মাস্ক নিজে।

পার্লারের মত অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ করার সময় সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছে অ্যাপল ও গুগল; উভয়ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কারণ দেখিয়েছে দুই কোম্পানি। টুইটারের মত বড় প্ল্যাটফর্মেও নীতিমালাবিরোধী কনটেন্টের উপস্থিতি মিলতে তাদের বেগ পেতে হবে না।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, মাস্ক টুইটারে অর্থের বিনিময়ে ভিডিও কনটেন্ট দেখার সেবা চালু করার কথাও বলেছেন। কোম্পানির সাবেক কর্মীদের আশঙ্কা, এতে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী কনটেন্টের উপস্থিতি বাড়বে মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্মটিতে।

নিজস্ব অ্যাপ স্টোরে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত কোনো অ্যাপ রাখে না অ্যাপল। একই ধরনের নীতিমালা আছে গুগলেরও।

এ বিষয়ে অ্যাপলের নীতিমালা স্পষ্ট, “যেসব অ্যাপ মূলত ব্যবহারকারীদের নির্মিত পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হয়… অ্যাপ স্টোরে তাদের কোনো জায়গা নেই এবং কোনো নোটিস ছাড়াই মুছে দেওয়া হতে পারে।”

কিন্তু মাস্কও লড়াই থেকে পিছ পা হওয়ার মানুষ নন। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি বাজারের শীর্ষ দুই কোম্পানির বিপরীতে যুদ্ধে গেলে সেটা তার জন্য সুফল বয়ে আনবে কি না- সেটাই এখন দেখার বিষয়

সিএনবিসি লিখেছে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অ্যাপল, গুগল, টুইটার ও ইলন মাস্কের মন্তব্য জানার চেষ্টা করেছিল তারা। অ্যাপল-গুগল মুখপাত্ররা তাতে সাড়া দেয়নি।

টুইটারের জনসংযোগ বিভাগ কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে মাস্কের অধীনে; সিএনবিসির টুইটের উত্তর দেননি চিফ টুইট নিজেও।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক