০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ: দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমীকরণ ও বৈশ্বিক বাস্তবতা

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ আজ কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন মূলত উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ: দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমীকরণ ও বৈশ্বিক বাস্তবতা

রাশিয়া-ইউক্রেইন সংঘাত যত তীব্র হচ্ছে, কূটনীতির প্রয়োজনও তত বেশি দেখা দিচ্ছে।

মঞ্জুরে খোদা মঞ্জুরে খোদা

Published : 06 Oct 2026, 09:25 AM

Updated : 06 Oct 2026, 09:25 AM

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ ও কূটনীতি যেন এক সঙ্গে চলছে। একদিকে ইউক্রেইনের শহর, জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়াচ্ছে রাশিয়া; অন্যদিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামোতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেইন। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘাতের তীব্রতা যেমন বাড়ছে, তেমনি কূটনৈতিক পরিসরেও নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইউক্রেইনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পথ প্রসারিত করছে। যুক্তরাজ্যও অস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিইভকে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। আবার ওয়াশিংটন মস্কো ও কিইভকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির কৌশল কি শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথ তৈরি করবে, নাকি অস্ত্র ও নিষেধাজ্ঞার নতুন প্রতিযোগিতা যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে?

রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যাপ্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব কেবল মস্কো-ওয়াশিংটন সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; চীন ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও এর ধাক্কা গিয়ে পড়বে।

তবে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা আর যুদ্ধ থামানো এক কথা নয়। গত কয়েক বছরে রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিকল্প বাজার, নতুন বাণিজ্যপথ ও নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছে। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করছে চীন, ভারত ও তুরস্কের মতো রাশিয়ার বড় বাণিজ্যিক মিত্ররা মার্কিন চাপ কতখানি মানবে তার ওপর। এসব নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার যুদ্ধ ব্যয় বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে মস্কোর কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে এমনটি ঘটবেই, ওই নিশ্চয়তা নেই।

ইউক্রেইনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখছে। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স বা প্রযুক্তিগত সহায়তা ইউক্রেইনের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে লাইসেন্স পাওয়া আর দ্রুত বিপুল পরিমাণ উৎপাদন এক বিষয় নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সময়ের প্রয়োজন।

তাই তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে এর প্রভাব সামান্য মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর গুরুত্ব অনেক। ইউক্রেইন নিজের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারবে। পাশাপাশি পশ্চিমা প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা বহাল থাকলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শক্তিও বাড়বে।

এক্ষেত্রে পশ্চিমা সহায়তায় ইউক্রেইন যদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তবে রাশিয়াও দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ, একই পদক্ষেপ একদিকে আলোচনার চাপ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে আবার যুদ্ধের সময়সীমাও বাড়িয়ে দিতে পারে।

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ আজ কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন মূলত উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কে কত কম খরচে বেশি ড্রোন বানাতে পারে, কে কত দ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আবার দাঁড় করাতে পারে, কার দূরপাল্লার অস্ত্র উৎপাদন বেশি এবং কে কত দিন ধরে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে নিতে পারে, এখন এসব প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিয়া কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেইনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করছে। জবাবে ইউক্রেইন হামলা চালাচ্ছে রাশিয়ার ভেতরে থাকা তেল শোধনাগার ও সামরিক স্থাপনায়। ফলে যুদ্ধের গতিপথ কেবল সামনের সারির সামরিক লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করছে না, বরং দুই দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতার ওপরও ঝুলছে।

পরিস্থিতি যেমনই হোক, কূটনৈতিক তৎপরতা অবশ্য থেমে নেই। রাশিয়া-ইউক্রেইন আলোচনার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথা তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও নানা শান্তি-প্রস্তাব নিয়ে কথা বলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে আলোচনার দরজা খোলা থাকা আর সত্যি সত্যি কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো এক জিনিস নয়।

রাশিয়া চায় ইউক্রেইনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান এমনভাবে নির্ধারিত হেকা, যাতে মস্কো নিজেকে কৌশলগতভাবে নিরাপদ ভাবতে পারে। আর ইউক্রেইন চায় তার ভূখণ্ডের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যতে পুনরায় রুশ আক্রমণ ঠেকাতে পারে এমন জোরাল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হলো, রাশিয়ার দখলে চলে যাওয়া ইউক্রেইনের ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে? একটি সম্ভাব্য সমাধান এমন হতে পারে, প্রথমে দুপক্ষ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে এবং এই মুহূর্তে যার নিয়ন্ত্রণে যে এলাকা রয়েছে, সেটিকে সাময়িক যুদ্ধবিরতি রেখা হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। তবে এর মানে এই নয় যে, আইনিভাবে ওই এলাকাগুলোকে রাশিয়ার অংশ বলে স্বীকৃত হবে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তোলা থাকবে ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য। এই সমাধান কোনো পক্ষকেই পূর্ণ বিজয়ের আনন্দ দেবে না। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের বাস্তবতায় শান্তির পথ অনেক সময় বিজয়ের মাধ্যমে নয়, বরং এমন সমঝোতার মাধ্যমে তৈরি হয় যেখানে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিকে মোটামুটি তিনটি ধারায় দেখা যায়। প্রথমত, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। রাশিয়া জনবল বাড়াবে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বহুগুণে বাড়াবে। ইউক্রেইনও পশ্চিমা সহায়তার পাশাপাশি নিজেদের তৈরি ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে এবং রাশিয়ার ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আরও জোরদার করবে।

দ্বিতীয়ত, আংশিক যুদ্ধবিরতি। জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা, কৃষ্ণসাগরে চলাচল, বন্দি বিনিময়, মানবিক করিডোর তৈরি বা সুনির্দিষ্ট কিছু সামরিক পদক্ষেপ সাময়িক স্থগিত করা নিয়ে ছোট ছোট সমঝোতা। আর তা থেকে ধীরে ধীরে পূর্নাঙ্গ যুদ্ধবিরতির দিকে এগোনো।

তৃতীয়ত, পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমঝোতা। যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ইউক্রেইনের নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া, দখলকৃত অঞ্চলের জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা করা, রাশিয়ার ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইউক্রেইন পুনর্গঠনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

গত কয়েক বছরে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্কের প্রচণ্ড অবনতি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, সাইবার তৎপরতা, গুপ্তচরবৃত্তি, হাইব্রিড সংঘাত ও অন্তর্ঘাতের অভিযোগ ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশকে বদলে দিয়েছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও রাশিয়া-ইউরোপ সম্পর্ক দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে, ওই সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইউক্রেইন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু শান্তিচুক্তির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে নেটোর ভূমিকা, ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং রাশিয়া-পশ্চিম সম্পর্কের ভবিষ্যৎও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ যত বাড়বে, তাদের যুদ্ধের ব্যয়ও তত বৃদ্ধি পেতে পারে। আবার রাশিয়া যদি মনে করে যে, পশ্চিমা সহায়তা বৃদ্ধির কারণে ইউক্রেইনকে সামরিকভাবে পরাস্ত করতে আরও বেশি সময় ও সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে, তাহলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতে পারে। পক্ষান্তরে, ইউক্রেইনের ক্ষেত্রেও পশ্চিমা সহায়তায় প্রতিরোধক্ষমতা বাড়লেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাদের মানবিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ক্রমশ বাড়বে।

তাই রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের ভবিষ্যৎকে শুধু সামরিক মানচিত্র দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতি, অস্ত্র উৎপাদন, জনবল, নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক উদ্যোগ, সবকিছুর সমন্বিত হিসাব জড়িত।

শেষ পর্যন্ত সংঘাতের ভাগ্য কেবল কে কতটা জমি দখল করল তার ওপর নির্ভর হবে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেইন দুপক্ষই বুঝতে পারবে যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদের মূল স্বার্থ রক্ষা করা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।

ওই মুহূর্তটি হয়তো এখনও আসেনি। তবে যুদ্ধ যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে স্থায়ী শান্তির জন্য শুধু অস্ত্রের ভারসাম্য যথেষ্ট নয়; চাই এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা এবং রাশিয়া-পশ্চিম সম্পর্কের মতো কঠিন প্রশ্নগুলোর একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান মিলবে।

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ তাই এক অদ্ভুত দোলাচালে দাঁড়িয়ে আছে। সংঘাত যত তীব্র হচ্ছে, কূটনীতির প্রয়োজনও তত বেশি দেখা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ওই প্রয়োজন কখন সামরিক ময়দানের হিসাব বদলে দিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com