Published : 16 Aug 2026, 03:40 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ এবং তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের মুখে একের পর এক বড় ইশতেহার বা খোলা চিঠি প্রকাশ করছেন শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানির সিইওরা।
স্যাম অল্টম্যান ও মার্ক অ্যান্ড্রেসেনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গের সাম্প্রতিক লেখা এই আলোচনায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
বিবিসি লিখেছে, গেল সপ্তাহে জাকারবার্গ ‘দ্য ফিউচার ইজ ফর এভরিওয়ান’ শিরোনামে সাড়ে ছয় হাজার শব্দের বড় এক খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন।
কারো কারো কাছে এই চিঠি এআইয়ের সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার প্রতি এক আশার বার্তা। আবার সমালোচকদের চোখে এমনটা চতুর ও দীর্ঘমেয়াদি জনসংযোগ বা পিআর মহড়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
এআই কেন ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব? এমন প্রশ্নে প্রযুক্তি জগতের কোনো শীর্ষ কর্তার তা ব্যাখ্যা করার সর্বশেষ উদাহরণ জাকারবার্গের এই ইশতেহার।
তার এ দৃষ্টিভঙ্গি এআই খাতের অন্যান্য প্রভাবশালী নেতাদের বারংবার বলা কথারই পুনরাবৃত্তি। তাদের দাবি, তারা যা তৈরি করছেন তা ‘ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি’।
২০২৩ সালে এই ইশতেহার লেখার ধারা শুরু করেছিলেন প্রারম্ভিক যুগের জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার ‘নেটস্কেপ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মার্ক অ্যান্ড্রেসেন। ‘টেকনো-অপটিমিস্ট মেনিফেস্টো’ নামের পাঁচ হাজার শব্দের নিবন্ধে তিনি বলেছিলেন, মানবজীবনের যাবতীয় সমস্যা সমাধানের একমাত্র চাবিকাঠি উদ্ভাবন।
লেখাটি পড়ে অনেকের মনে হতে পারে, “তাহলে কি টেক মুঘলরা এখন থেকে ইশতেহার লেখাও শুরু করল?”
ওই লেখার শুরুতেই অ্যান্ড্রেসেন দাবি করেছিলেন, এআই নিয়ে একশ্রেণীর মানুষ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। একইসঙ্গে পাঠকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।
“আমরা বিশ্বাস করি প্রবৃদ্ধিই হচ্ছে আসল অগ্রগতি, যা জীবনের প্রাণশক্তি ও পরিসর বাড়ায়, জ্ঞান বাড়ায় এবং মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।”
জাকারবার্গের সাম্প্রতিক নিবন্ধে সরাসরি কারও নাম নেওয়া না হলেও এআইয়ের সম্ভাব্য নানা ঝুঁকি নিয়ে যারা আগে সতর্ক করেছিলেন তাদের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি ঠিক অ্যান্ড্রেসেনের কৌশলই অনুসরণ করেছেন।
মেটা প্রধান লিখেছেন, “এমনটা সত্যিই বিস্ময়কর যে, এআই বিকাশে জড়িয়ে থাকা অনেকের মূল আলোচনাই নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক আশঙ্কা ও নিরাশায় ভরা।”
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এআই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরির ওপর প্রভাব ফেলতে ও বৈশ্বিক আর্থিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, সেখানে জাকারবার্গের দাবি, ভবিষ্যতে কাজের কোনো অভাব হবে না।
“আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না, যারা বিশ্বাস করেন এআই মানুষের অধিকাংশ চাকরি কেড়ে নেবে বা মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে তারা কেন আবার এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।”
তবে নিজের নিবন্ধে জাকারবার্গ সুবিধাজনকভাবেই একটি বিষয় এড়িয়ে গেছেন। এআই প্রযুক্তিতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে গিয়ে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে মেটা নিজেই সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে নিজেদের ১০ শতাংশ কর্মী বা প্রায় আট হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে এআইয়ের সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক দিক তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা চলছে, জাকারবার্গের এই সাম্প্রতিক ইশতেহার তারই একটি অংশ।
এর আগে, ২০২৪ সালে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান ‘ইন্টেলিজেন্স এজ’ নামে একটি ইশতেহার প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তিনি এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন।
প্রযুক্তিটির মাধ্যমে মানবজাতির অগ্রগতি অভূতপূর্ব গতিতে বাড়বে দাবি করে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের বিচক্ষণতার সঙ্গে তবে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।”
একই বছর অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই ‘মেশিনস অফ লাভিং গ্রেস’ শিরোনামে এক ইশতেহারে স্বাস্থ্যসেবা থেকে রাজনীতি সব ক্ষেত্রে এআইয়ের বিস্ময়কর পরিবর্তনের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন, যেটিকে এআইয়ের উজ্জ্বল বিভিন্ন দিক তুলে ধরার এক প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি, যাতে তাকে কোনো ‘ধ্বংসের ভবিষ্যৎবাণী করা ব্যক্তি’ হিসেবে দেখা না হয়।
এমন দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখা মার্ক জাকারবার্গের জন্য অবশ্য নতুন কিছু নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি নিজের প্ল্যাটফর্মে ভুয়া খবর ছড়ানোর মতো জটিল বিষয় নিয়েও লিখেছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে কোম্পানির নাম বদলে ‘মেটাভার্স’-এ রূপান্তরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যাখ্যা দিতেও তিনি কলম ধরেছিলেন।
তবে অর্থনীতিবিষয়ক জনপ্রিয় ব্লগার নোয়া স্মিথ বলেছেন, এআই যুগের এ লড়াইয়ের ঝুঁকি ও গুরুত্ব আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি। আর প্রযুক্তি প্রধানদের বক্তব্যেই তা স্পষ্ট।
“আমার মনে হয় তারা সবাই অনুধাবন করছেন, বিষয়টি এমন এক যুগান্তকারী মুহূর্ত, যেখানে প্রযুক্তির দিকনির্দেশনা তৈরিতে যা কিছু সম্ভব তা করা তাদের দায়িত্ব।”
জাকারবার্গের এ নতুন ইশতেহারে তাদের এআই প্রযুক্তিকে ‘ওপেন সোর্স’ বা আরও উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ প্রযুক্তির পেছনে থাকা ডিজাইন বা কোড সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, যা যে কেউ দেখতে, ব্যবহার করতে ও পরিবর্তন করতে পারবে।
তবে এআই সরঞ্জামের সম্ভাব্য অপব্যবহার ও ক্ষতির ঝুঁকি বিবেচনা করলে এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত অনেক বড় তাৎপর্য বহন করে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেশ কিছু ওয়েবসাইটে হ্যাকিং চালিয়েছে শক্তিশালী এআই মডেল। সহজ কথায় বিষয়টি এআই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার শামিল।
এগুলো শক্তিশালী ‘ক্লোজড’ মডেল ছিল, উন্মুক্ত মডেল নয়। তবে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির প্রেক্ষাপটে স্মিথ বলছেন, “মানবজাতিকে বিলুপ্ত করার সক্ষমতা রাখে এমন কোনো প্রযুক্তি কি আমাদের উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত? বিষয়টিকে যারা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন না, তারা নেহাতই বোকা।”
ইন্টারনেটজুড়ে মানুষ এগুলো নিয়ে যতই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করুক না কেন, এসব ইশতেহারের গুরুত্ব এখানেই, বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই আলোচনা জোরদার হচ্ছে যখন ওপেন সোর্স এআই বাজার কুইয়েন, ডিপসিক ও জিএলএম-এর মতো বিভিন্ন চীনা মডেলের দখলে চলে যাচ্ছে।
করপোরেট ইশতেহারের এ ঘনঘটা আইডিয়া বা ভাবনার বাজারে নিজেদের ও কোম্পানিকে সেরা হিসেবে জাহির করার ব্যবসায়িক এক কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘টিউল্যান ইউনিভার্সিটি’র ব্যবসার অধ্যাপক রব লালকা বলেছেন, ‘নিজেদের কতটা জ্ঞানী তা জাহির করার একটি মাধ্যম ইশতেহার’।
তিনি বলেছেন, কর্পোরেট ব্লগ ব্যবহার করে নিজেদের এক ধরনের “ব্যবসায়ী-দার্শনিক হিসেবে উপস্থাপন করার ইতিহাস শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেশ পুরানো। তারা ভবিষ্যতের দিকে দেখার একটি ইতিবাচক চশমা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।”
অধ্যাপক লালকার ভাষ্য, জাকারবার্গের এ ইশতেহারের টাইমিংটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যখন এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে ঠিক তখনই এ ইশতেহার সামনে এল।
প্রযুক্তি সাংবাদিক বা গবেষকরা হয়ত এসব ইশতেহারের প্রতি শব্দ বিশ্লেষণ করে কোনো ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করবেন। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো খুব একটা আবেদন তৈরি করতে পারছে না।
লালকা বলেছেন, “জনসাধারণের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তার বিপরীতে এসব প্রযুক্তির সুফল যে অনেক বড় তারা সেটাই বোঝাতে চাইছেন। তবে আশাবাদী হওয়ার আসল কারণগুলো এখনো দেখা বাকি।”