Published : 15 Sep 2025, 06:16 PM
বর্তমানে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বড় প্রযুক্তি কোম্পানগুলোর প্রধানরাও এআই পছন্দ করছেন।
বিশ্ব বাজারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদন জগতে ক্রমাগত প্রভাব ফেলছে এ প্রযুক্তি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘পিডব্লিউসি’-এর মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ১৫ দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখতে পারে এআই।
মার্কিন চিপ নিমার্তা এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং থেকে শুরু করে, চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, মাইক্রোসফটের সাত্যিয়া নাদেলা ও আইফোন নির্মাতা কোম্পানি অ্যাপল প্রধান টিম কুক পর্যন্ত প্রযুক্তি সিইওরা কীভাবে তাদের প্রতিদিনের জীবনে এআই ব্যবহার করছেন তা উঠে এসেছে বিজনেস ইনসাইডারের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে–
মাইক্রোসফট প্রধান সাত্যিয়া নাদেলা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় শুরুতেই বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে মার্কিন সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট। ২০২৩ সালে নিজেদের এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘কোপাইলট’ চালু করেছে তারা। ২০২৪ সালে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের সঙ্গে এক হাজার তিনশো কোটি ডলারের পার্টনারশিপের পাশাপাশি এআই বিকাশের জন্য আলাদা দলও গঠন করেছে কোম্পানিটি।
২০১৪ সালে মাইক্রোসফটের সিইও হন সাত্যিয়া নাদেলা। তিনি বলেছিলেন, কীভাবে কাজের ধরন ও মানুষের চিন্তাশক্তির ব্যবহার বদলে দেবে এআইয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতি।
মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ব্লুমবার্গ প্রতিবেদনে লিখেছে, নাদেলার জন্য এখন তার অফিস ও ব্যক্তিগত উভয় জীবনেই অপরিহার্য এক অংশ হয়ে উঠেছে এআই।
মে মাসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে নাদেলা বলেছেন, পডকাস্ট উপভোগ করেন তিনি। তবে তা সরাসরি শোনেন না। বদলে পডকাস্টের ট্রান্সক্রিপ্ট বা লিখিত রূপ নিজের ফোনে থাকা কোপাইলট অ্যাপে আপলোড করেন, যেন যাত্রাপথে ভয়েস অ্যাসিস্টেন্টের সঙ্গে সেই পডকাস্টের কনটেন্ট নিয়ে আলোচনা করতে পারেন নাদেলা।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে মাইক্রোসফটের প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর কোপাইলট ব্যবহার করে নিজের ‘আউটলুক’ ও ‘টিমস’এর বিভিন্ন মেসেজের সারাংশ বুঝে নেন নাদেলা। মিটিংয়ের প্রস্তুতি ও গবেষণার কাজে সাহায্যের জন্য কোপাইলট স্টুডিও থেকে তৈরি অন্তত ১০টি কাস্টম এজেন্ট ব্যবহার করেন কোম্পানিটির প্রধান।
নাদেলা ব্লুমবার্গকে বলেছেন, “আমি এক ধরনের ইমেইল টাইপিস্ট।”
চ্যাটজিপিটির কারণে সিলিকন ভ্যালির অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন স্যাম অল্টম্যান
ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান
কোম্পানিটির প্রধান পণ্য চ্যাটজিপিটির কারণে সিলিকন ভ্যালির অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান।
২০২২ সালে চ্যাটবটটি চালু করে কোম্পানিটি, যা দ্রুতই ভাইরাল হয়। মানুষ ডায়েট থেকে শুরু করে রেসিপি পর্যন্ত নানা বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে এই বটটিকে। গত তিন বছরে আরও উন্নত জিপিটি প্রোগ্রাম চালু করেছে করেছে ওপেনএআই।
এ বছরের জানুয়ারিতে ‘স্টারগেইট’ নামের এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোতে ৫০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ওপেনএআইকেও সেই প্রকল্পে সাহায্যের জন্য ‘অনুরোধ’ করেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন কাজ সহজ করতে এআই ব্যবহার করেন অল্টম্যান, বিষয়টি একেবারেই অদ্ভুত কিছু নয়। এ বছরের জানুয়ারিতে অ্যাডাম গ্রান্টের ‘রিথিংকিং’ পডকাস্টে অল্টম্যান বলেছেন, “সত্যি বলতে, আমি খুব সাধারণ ও বিরক্তিকর বিভিন্ন কাজ করতে এআই ব্যবহার করি।”
অল্টম্যান বলেছেন, তার ইমেইল প্রক্রিয়া করতে বা ডকুমেন্টেশনের সারাংশ করার কাজে সাহায্য করে এআই। এ প্রযুক্তি তাকে বাবা হিসাবে দায়িত্ব পালনেও সহায়তা করেছে।
জুনে প্রকাশিত এক ওপেনএআই পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে অল্টম্যান বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে প্রথম সন্তানের জন্মের পর থেকে ‘ধারাবাহিকভাবে’ এআই ব্যবহার করছেন তিনি।
অল্টম্যান বলেছেন, “চ্যাটজিপিটি ছাড়াও আগে মানুষ শিশুদের দেখাশোনা বা যত্ন নিতে পারতেন। তবে, আমি জানি না, এআই ছাড়া আমি এটি কিভাবে করতাম।”
তিনি আরও বলেছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের বিকাশ সম্পর্কিত তথ্য জানার জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন অল্টম্যান।
বিশ্বের প্রযুক্তি দুনিয়ার আরেক প্রধান খেলোয়াড় হচ্ছেন মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং
এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াং
বিশ্বের এআই দুনিয়ার আরেক প্রধান খেলোয়াড় হচ্ছেন মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং। গুগল ফাইন্যান্সের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান কোম্পানি এনভিডিয়া, যার বাজার মূল্য তিন ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এ কোম্পানিটি মূলত হার্ডওয়্যার ডিজাইন ও উৎপাদনের ওপর কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে এআইনির্ভর চিপ ও গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট।
মে মাসে অনুষ্ঠিত ২৮তম ‘মিলকেন ইনস্টিটিউট গ্লোবাল কনফারেন্স’-এ হুয়াং দর্শকদের বলেছেন, নতুন ধারণা শিখতে এআই প্রোগ্রাম ব্যবহার করেন তিনি।
“আমি প্রতিদিন টিউটরের মতো ব্যবহার করি এআই। যেসব বিষয় আমার জন্য একেবারে নতুন, সেখানে আমি এআইয়ের কাছে জানতে চাই, ‘এটা আমাকে এমনভাবে বোঝাও যেন আমি ১২ বছরের শিশু’, তারপর ধীরে ধীরে সেই বিষয়টিকে ডক্টরেট পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাও।”
হুয়াংয়ের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও যোগাযোগের সক্ষমতা প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারে।
“এ কক্ষে খুব অল্প কয়েকজনই সম্ভবত সি++ দিয়ে প্রোগ্রাম করতে জানেন। তবে আপনাদের সবাই-ই এআই প্রোগ্রাম করতে পারেন। কারণ এআই আপনাদের পছন্দের যে কোনো ভাষায় কথা বলতে পারে।”
২০২৪ সালে ‘উইয়্যার্ড’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুয়াং বলেছেন, গবেষণার জন্য প্রায় প্রতিদিনই পারপ্লেক্সিটি ও চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন তিনি।
“যেমন কম্পিউটারভিত্তিক ওষুধ আবিষ্কার। আপনি হয়ত এ বিষয়ে সাম্প্রতিক অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন। তখন পুরো বিষয়টি একটি কাঠামোতে আনতে চাইবেন আপনি, যেন ওই কাঠামো থেকে আরও নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করা যায়। আমি এআইয়ের ক্ষেত্রে এ জিনিসটাই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।”
অ্যাপল প্রধান টিম কুক
অ্যাপল বর্তমানে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে পথচলতে শুরু করেছে কোম্পানিটির সিইও টিম কুকের নেতৃত্বে। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত কোম্পানির ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডেভেলপার্স কনফারেন্সে’ তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’ নামের তাদের নিজস্ব এক জেনারেটিভ এআই সিস্টেমের।
সে সময় তিনি আরও বেশ কিছু এআইনির্ভর ফিচার প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ছিল ‘ইমেইজ প্লেগ্রাউন্ড’ ও ছবির অপ্রয়োজনীয় ব্যাকগ্রাউন্ড অংশ সরিয়ে ফেলার সুবিধা।
২০১১ সালে অ্যাপলের সিইও পদে দায়িত্ব নেওয়া কুক ২০২৪ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কীভাবে নিজের দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন তিনি। কুক বলেছেন, অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স তাকে অনেক বড় ইমেইল সংক্ষেপে বুঝতে সাহায্য করে।
“আমি যদি এখান-সেখান থেকে অল্প কিছু সময়ও বাঁচাতে পারি তবে তা একদিন, এক সপ্তাহ, এক মাসে বড় সময় হিসেবে জমা হবে, যা আমার জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে। এআই সত্যিই এমনটি করেছে।”
এক বছর আগে, ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ শোতে কুক বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন নিয়ে তিনি ‘উৎসাহী’।
“আমার মনে হয় এআইয়ের কিছু অনন্য ব্যবহার রয়েছে এবং আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে, আমরা খুবই সতর্কতার সঙ্গে তা পর্যবেক্ষণ করছি।”