চীনা নজরে এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং?
এক বছর আগেই বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে জানানো হয়েছিল। তবে পুরো বিষয়টি জেনেও তিনি কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নিয়ে স্রেফ নীরব ভূমিকায় ছিলেন।
এ বছর শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক ও উত্তেজনা এমনিতেই চরম রূপ নিয়েছে। এর ওপর এবার নতুন করে যোগ হল ‘জেনসেন হুয়াংয়ের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির কেলেঙ্কারী’।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংকে চীন সরকারের একজন গোয়েন্দার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের অন্তত এক বছর আগেই বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল।
পুরো বিষয়টি জেনেও তিনি তখন কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নিয়ে স্রেফ নীরব ভূমিকা রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
মার্কিন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডেটা সেন্টার কোম্পানি ‘মেগাস্পিড’-এর জ্যেষ্ঠ নির্বাহী অ্যালিস হুয়াংয়ের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল।
অ্যালিস একজন চীনা নাগরিক। তবে এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে তার কোনো ধরনের পারিবারিক বা রক্তের সম্পর্ক নেই।
সেই নজরদারির এক পর্যায়ে মার্কিন গোয়েন্দারা দেখতে পান অ্যালিস নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রের এক নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। পরে তদন্তে সেই আমেরিকান নাগরিককে জেনসেন হুয়াং হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
আমেরিকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, অ্যালিস হুয়াং চীন সরকারের হয়ে কাজ করা একজন ‘ইন্টেলিজেন্স অ্যাসেট’ বা গোয়েন্দা এজেন্ট।
তিনি এনভিডিয়ার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেইজিংয়ের কাছে পাচার করে আসছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে সরাসরি গুপ্তচরবৃত্তির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলার আগেই মার্কিন কর্তৃপক্ষের মধ্যে তীব্র সন্দেহ দানা বাঁধে।
যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে এনভিডিয়ার তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইওয়ালা আধুনিক চিপ কৌশলে চীনে পাঠাতে সাহায্য করছিলেন অ্যালিস।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থিত মেগাস্পিডের সহযোগী এক কোম্পানি দুই বছরেরও কম সময়ে অন্তত ৪৮০ কোটি ডলারের এনভিডিয়া প্রযুক্তি ও চিপ সম্বলিত সরঞ্জাম কেনাকাটা করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে অপরিচিত ও ছোট আকারের এক কোম্পানির পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের বাণিজ্য পরিচালনাকে ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অঙ্গনে অ্যালিস হুয়াংয়ের প্রকাশ্য উপস্থিতি সীমিত ও ঝাপসা। তিনি নিজেকে সরাসরি মেগাস্পিডের সিইও হিসেবে দাবি করেন।
করপোরেট নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আট মাস মেগাস্পিড তাকে নিজেদের ‘ম্যানেজিং ডিরেক্টর’ পদে তালিকাভুক্ত রাখলেও পরবর্তী সময়ে কৌশলগত কারণে তাদের আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের সেই পদবী থেকে অ্যালিসের নাম বাতিল করা হয়।
অন্যদিকে, চীনা বিনিয়োগ ফান্ড, যেখানে অ্যালিস এর আগে কাজ করতেন সেখানে তারা অ্যালিসকে একজন ‘সাবেক টিভি সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসন্ধানী তদন্ত চালিয়েও অ্যালিসের সাংবাদিকতা বা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগ থাকার অতীত ব্যাকগ্রাউন্ডের কোনো সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
নিরাপত্তা শঙ্কা থাকলেও নিষ্ক্রিয় ছিলেন ট্রাম্প
অভিযোগ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরও মার্কিন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নিষ্ক্রিয়তা ও রহস্যময় অবস্থান এখন ওয়াশিংটন থেকে সিলিকন ভ্যালিতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
মেগাস্পিডের বিপুল অংকের চিপ কেনাকাটার ঠিক আগে ২০২৪ সালে নেটথান্ডারের প্রাতিষ্ঠানিক লিংকডইন অ্যাকাউন্টে একটি ছবি পোস্ট করা হয়।
ওই ছবিতে দেখা যায়, প্রযুক্তি শিল্পের অন্যান্য নির্বাহীদের সঙ্গে জেনসেন হুয়াংয়ের ঠিক পাশেই বসে আছেন অ্যালিস হুয়াং।
বিশ্বের সবচেয়ে দামি চিপ নির্মাতা কোম্পানির প্রধান নির্বাহীকে চীন সরকারের ট্রগোয়েন্দা নজরদারির লক্ষ্যবস্তু বানাবে তা নজিরবিহীন ঘটনা হলেও অস্বাভাবিক নয়।
তবে পুরো ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হচ্ছে, পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানার পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেননি।
কোনো মার্কিন নাগরিক বিদেশী গোয়েন্দাদের নজরদারিতে পড়লে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ধরনের সতর্কতা বা ‘ডিফেন্সিভ ব্রিফিং’ দেওয়া হয়, জেনসেন হুয়াংকে তাও দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে লিখেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
ট্রাম্প প্রশাসনের এমন নিষ্ক্রিয়তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এনভিডিয়ার চিপ বিক্রি বা বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে বা বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জটিল রূপ নিতে পারে এমন যে কোনো স্পর্শকাতর পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন ট্রাম্প।
তবে চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের মাধ্যমে নিজেই দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন তিনি।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়ত আশঙ্কা করেছিল, জেনসেন হুয়াংকে আগেভাগে বিষয়টি জানানো হলে অ্যালিস হুয়াং সতর্ক হয়ে যেতে পারেন।
অ্যালিস এখনো গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বেইজিংয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট কী ধরনের গোপন তথ্য পাচার করেছেন সে বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে স্পষ্ট তথ্য নেই।
