১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১ কার্তিক ১৪৩৩

অনলাইন বিজ্ঞাপনকে হ্যাকিং অস্ত্র বানাচ্ছে ইসরায়েলি এজেন্সি

এসব অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ডজনখানেক কর্মীর ডিভাইসে গোপনে নজরদারি সফটওয়্যার পাঠানো হয়েছে।

অনলাইন বিজ্ঞাপনকে হ্যাকিং অস্ত্র বানাচ্ছে ইসরায়েলি এজেন্সি

কোনো গেইম বা টেলিকম সেবার ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপনের আড়ালে ব্যবস্থাটি ব্যবহারকারীর আইপি অ্যাড্রেস ও পরিচয় হাতিয়ে নেয়। ছবি: ম্যাগনিফিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 16 Oct 2026, 11:15 AM

Updated : 16 Oct 2026, 11:15 AM

অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার সুযোগে লক্ষ্যবস্তু করা ব্যক্তিদের ডিভাইসে লুকিয়ে ক্ষতিকর স্পাইওয়্যার ছড়ানোর এক নতুন কৌশলের তথ্য উন্মোচন করেছেন গবেষকরা।

ইসরায়েলভিত্তিক এক ডিজিটাল বিজ্ঞাপন এজেন্সির তৈরি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে এমন বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে বলে উঠে এসেছে কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো’র ডিজিটাল গবেষণা ইউনিট ‘সিটিজেন ল্যাব’-এর গবেষণায়।

সিটিজেন ল্যাব প্রতিবেদনে বলেছে, ‘ডিসকভার-টেক’ নামের বিজ্ঞাপন এজেন্সির চালানো এসব অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ডজনখানেক কর্মীর ডিভাইসে গোপনে নজরদারি সফটওয়্যার পাঠানো হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘কন্ট্রোলিয়াম’ নামের সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে ‘ডিসকভার-টেক’।

প্ল্যাটফর্মটির সাহায্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর গণ-নজরদারি চালিয়ে তাদের পরিচয় প্রকাশ ও পরে তৃতীয় পক্ষের স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ডিভাইসে হ্যাকিং চালানো হয়।

প্রচলিত হ্যাকিংয়ের মতো এতে কোনো ক্ষতিকর লিংক বা ফাইলে ক্লিক করার প্রয়োজন হয় না। ফলে ভুক্তভোগী কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেবল কয়েক সেকেন্ডে তার অজান্তে স্পাইওয়্যারটি ডিভাইসে ইনস্টলড হয়ে যায়।

সিটিজেন ল্যাব তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, “লাখ লাখ ব্যবহারকারীর প্রোফাইল তৈরি করতে ও নীরব ঘাতক ‘জিরো-ক্লিক’ নামের স্পাইওয়্যার ছড়াতে অনলাইন বিজ্ঞাপন খাতকে এখন বড় পরিসরে মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

গবেষকদের দাবি, কোনো গেইম বা টেলিকম সেবার ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপনের আড়ালে এই কন্ট্রোলিয়াম ব্যবস্থাটি ব্যবহারকারীর আইপি অ্যাড্রেস ও পরিচয় হাতিয়ে নেয়।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীকে হ্যাকিংয়ের লক্ষ্যবস্তু করা হলে একটি স্পাইওয়্যার সরবরাহকারী কোম্পানি ওই ডিভাইসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিকর কোড পাঠাতে পারে।

২০২৪ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেখিয়েছে কোম্পানিটি, যার মধ্যে ইয়েমেন, ব্রাজিল, মেক্সিকো ও চেক প্রজাতন্ত্রের ব্যবহারকারীরাও রয়েছেন।

আলাদা আরেক গবেষণা কোম্পানি ‘কনফিয়্যান্ট’-এর তথ্য অনুসারে, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ, নেটো, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মতো সংবেদনশীল নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের কাছেও ডিসকভার-টেকের এসব বিপজ্জনক বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছে।

বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞাপন সরবরাহকারী ও বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে ক্ষতিকর অনলাইন বিজ্ঞাপন শনাক্ত করতে না পারাকে ‘মহাবিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন গবেষকরা।

পাশাপাশি, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা এখন রাষ্ট্র, ব্যক্তি খাত, সুশীল সমাজসহ সবার নিরাপত্তার জন্যই মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

সিটিজেন ল্যাবের গবেষক উলফি ক্রিস্টল বলেছেন, “আজকের অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও সবার জন্যই বড় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।”

সিটিজেন ল্যাবের দাবি, বিজ্ঞাপনী প্ল্যাটফর্ম কন্ট্রোলিয়াম তৃতীয় পক্ষের স্পাইওয়্যার নির্মাতা কোম্পানিগুলোর জন্য সুবিধাভোগী হিসেবে কাজ করে।

এসব স্পাইওয়্যারের সাহায্যে বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাস কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।

ক্ষতিকর এ প্রযুক্তি আক্রান্ত ডিভাইসের পুরো নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে পারে, যার মাধ্যমে ডিভাইসে থাকা বার্তা, ছবি ও ইমেইল চুরির পাশাপাশি ফোন কল রেকর্ড এবং অজান্তে মাইক্রোফোন সক্রিয় করে নজরদারি চালানো সম্ভব।

অনলাইন বিজ্ঞাপন খাতের গোপন ও জটিল লেনদেন প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে নজরদারি চালানো হয় তার সুস্পষ্ট কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ এবার প্রথমবারের মতো সামনে এল বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।

সিটিজেন ল্যাবের আরেক সিনিয়র গবেষক বিল মারজাক বলেছেন, “অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত ও স্বয়ংক্রিয় হ্যাকিংয়ের গুঞ্জন এতদিন শোনা গেলেও এবারই প্রথম আমাদের হাতে এর সুনির্দিষ্ট ও প্রযুক্তিগত কারিগরি প্রমাণ এসেছে।”

গবেষকরা বলছেন, কোনো ব্যবহারকারী যখন বিজ্ঞাপনওয়ালা সাইটে যান তখন কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে তার প্রোফাইল নিয়ে শত শত বিজ্ঞাপনী কোম্পানির মধ্যে স্বয়ংক্রিয় নিলাম শুরু হয়।

ব্যবহারকারীর বয়স, অবস্থান, ডিভাইসের তথ্য ও অনলাইন ব্রাউজিং ইতিহাস ট্র্যাক করে তৈরি করা প্রোফাইলের ওপর নির্ভর করে ওই ব্যবহারকারীকে কোন বিজ্ঞাপনটি দেখানো হবে তা নির্ধারিত হয়।

স্বয়ংক্রিয় এ বড় বাজারে কার্যকর কোনো আন্তর্জাতিক নজরদারি না থাকায় এটা দুষ্কৃতকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

এর আগেও, মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা’র শত কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন রাজস্বের বড় অংশ প্রতারণামূলক স্ক্যাম, অবৈধ জুয়া ও নিষিদ্ধ কনটেন্ট থেকে আসে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল।

মার্কিন ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ বা আইসিই’সহ কয়েকটি সরকারি সংস্থা ট্র্যাকিং ডেটা ব্যবহার করে মানুষের যাতায়াতের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য বিশেষ সফটওয়্যার কিনছে বলেও তথ্য মিলেছে।

এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপের তাগিদ দিয়ে উলফি ক্রিস্টল বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা, নিয়ন্ত্রক ও আইনপ্রণেতাদের এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত। জড়িত কোম্পানিগুলোকে তদন্তের আওতায় আনা ও বিজ্ঞাপনী ব্যবস্থার পদ্ধতিগত ঝুঁকিগুলো দ্রুত দূর করা জরুরি।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ডিসকভার-টেক।